১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোনের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

· Prothom Alo

প্রকৃতির তাণ্ডব কি একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পারে? ইতিহাস কেবল রাজনীতিবিদ কিংবা যোদ্ধাদের দিয়ে তৈরি হয় না, মাঝেমধ্যে প্রকৃতির ভয়াল রূপও বদলে দেয় কোনো কোনো জাতির ভাগ্যলেখনী। ১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোন ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নতুন বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, এই প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোনই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গণমানুষের ক্ষোভকে একসূত্রে বেঁধেছিল। ঝড়ের তীব্রতা যেভাবে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে আঘাত হেনেছিল, তা সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল পরবর্তী সব জাতীয় ঘটনার ওপরে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির ইকোনমিকস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ মুশফিক মোবারক ও গবেষক সুলতান মাহমুদ যৌথভাবে গবেষণায় এ বিষয় তুলে ধরেছেন। তাঁরা ঐতিহাসিক স্যাটেলাইট ডেটা, আর্কাইভের তথ্য ও আধুনিক অর্থনীতির গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে দেখেছেন, কীভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতি তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর চরম অবহেলা একটি স্বাধিকার আন্দোলনকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতাযুদ্ধে রূপ দিয়েছিল।

Visit palladian.co.za for more information.

অধ্যাপক মুশফিক মোবারক জানান, বিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীতে অন্তত ১৪৫টি বিচ্ছিন্নতাবাদী বা স্বাধিকার আন্দোলন ঘটেছে। তবে এর মধ্যে মাত্র ২৭টি আন্দোলন নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে সফল হয়েছে। নাইজেরিয়ার বিয়াফ্রা কিংবা শ্রীলঙ্কার তামিলদের দীর্ঘ লড়াই সত্ত্বেও রাষ্ট্র দুটি অখণ্ড থেকে যায়। যেকোনো স্বাধিকার আন্দোলন সফল হতে হলে মূলত দুটি শর্ত পূরণ হতে হয়। গণমানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের দাবির পক্ষে সোচ্চার হওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা বা সুযোগ থাকতে হয়। আবার শোষক সরকারের বিরুদ্ধে নিজের জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৭০ সালের সাইক্লোন এবং পরবর্তী সময়ে শাসকগোষ্ঠীর আচরণ—এই দুটি শর্তকেই দ্রুত ত্বরান্বিত করেছিল। অধ্যাপক মুশফিক মোবারক জানান, ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তবে ভৌগোলিক দিক থেকে এক হাজার মাইল ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বিচ্ছিন্ন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সংস্কৃতি, ভাষা কিংবা অর্থনীতিতে কোনো মিল ছিল না। ক্ষোভের সূচনা হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে যুক্ত হয় চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য। পূর্ব পাকিস্তানে মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাস করলেও তারা সরকারি রাজস্বের মাত্র ২৯ শতাংশ বরাদ্দ পেত। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দূরবর্তী ইসলামাবাদ।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন নির্ধারিত ছিল। তবে নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে ১২ নভেম্বর উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে প্রলয়ঙ্করী ভোলা সাইক্লোন। কোনো আগাম পূর্বাভাস না থাকায় প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। উপকূলীয় অঞ্চলে লাশের স্তূপ ও কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দ্রুত দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে আসেননি। চীন সফর থেকে ফেরার পথে তিনি ঢাকায় ক্ষণিকের জন্য থামেন আর হেলিকপ্টার থেকে বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। নদী ও জলাশয়ে ভেসে থাকা মানুষের লাশ দেখেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন, পরিস্থিতি ততটা খারাপ মনে হচ্ছে না। এরপর ঢাকায় ফিরে এক পার্টিতে যোগ দেন তিনি। এই চরম উদাসীনতা ও ত্রাণ কার্যক্রমে ব্যর্থতা বাঙালি জাতিকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, এই সরকারের কাছে তাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই।

গবেষকেরা তৎকালীন বায়ুমণ্ডলের ডেটা সংগ্রহ করতে একটি বিরল মার্কিন সামরিক স্যাটেলাইটের সহায়তা নেন। ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ মহাকাশে পাঠায় আইটিওএস-১ নামের একটি স্যাটেলাইট, যা ছিল বিশ্বের প্রথম জিওসিনক্রোনাস কক্ষপথের স্যাটেলাইট। টেপ রেকর্ডার নষ্ট হওয়ার কারণে ১৯৭০ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি এটি অকেজো হয়ে যায়। তবে এর ঠিক কয়েক দিন আগেই স্যাটেলাইটটি ভোলা সাইক্লোনের স্পষ্ট কিছু ছবি তোলে। পদার্থবিজ্ঞান ও আবহাওয়া বিজ্ঞানের নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে মেঘের ঘনত্ব ও সৌর বিকিরণের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা তৎকালীন বাতাসের গতিবেগ ও ঝড়ের প্রকৃত তীব্রতা মেপে বের করেন।

গবেষণায় দেখা যায়, যেসব নির্বাচনী এলাকায় ঝড়ের তাণ্ডব ও ক্ষয়ক্ষতি বেশি ছিল, সেখানকার মানুষের রাজনৈতিক অবস্থানের দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। ঘূর্ণিঝড়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোটের হার ৭৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৭ শতাংশে পৌঁছায়। আর্কাইভের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাইক্লোনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে আনুপাতিক হারে অনেক বেশি তরুণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। হিসাব অনুযায়ী, সাইক্লোনের কারণে সৃষ্ট তীব্র ক্ষোভের ফলে প্রায় ৪৬ হাজার অতিরিক্ত তরুণ যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন।

সূত্র: ভক্সডেভ

Read full story at source