চাকরির বাজার বদলে যাচ্ছে, আপনার সিদ্ধান্ত কি বদলাবেন

· Prothom Alo

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কল্যাণে খুব দ্রুত বদলাচ্ছে পৃথিবী। এবার যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন, তাঁরা পাস করে বের হবেন অন্তত চার বছর পর। তত দিনে চাকরির বাজার নিঃসন্দেহেই আরও অনেক বদলে যাবে। ভবিষ্যতে চোখ রেখে কীভাবে বেছে নেবেন পড়ার বিষয়? এ প্রসঙ্গে লিখেছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) উপাচার্য এ বি এম শওকত আলী। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর পিএইচডি করেছেন।

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সামনে একটি বড় প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, কোন বিষয়ে ভর্তি হব, কোন পথে গড়ে তুলব ক্যারিয়ার। মনে হতে পারে, এই একটি সিদ্ধান্তই বুঝি ঠিক করে দেবে পুরো জীবনের গতিপথ। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। কারণ, প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আমাদের কাজ, শেখা ও চিন্তা করার পদ্ধতিকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে।

Visit moryak.biz for more information.

একটি বিষয় এখানে মনে রাখা জরুরি। আজ যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছেন, তাঁরা স্নাতক শেষ করবেন প্রায় চার বছর পর। এ সময়ের মধ্যেই এআই–নির্ভর প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসবে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ফিউচার অব জবস রিপোর্ট–২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে ১৭ কোটি নতুন চাকরি সৃষ্টি হবে। আবার প্রায় সাড়ে ৯ কোটি চাকরি বিলুপ্ত হবে। ফলে প্রায় সাড়ে সাত কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি বলেছেন, ‘মানুষের ইতিহাসে এই প্রথম এমন একটি সময় এসেছে, যখন কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না ২০ বা ৩০ বছর পর চাকরির বাজার কেমন হবে।’

একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, শতকরা হারে সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে যেসব পেশা, তার শীর্ষে রয়েছে বিগ ডেটা স্পেশালিস্ট (১১০ শতাংশ), এরপর ফিনটেক ইঞ্জিনিয়ার (৯০ শতাংশ) এবং এআই ও মেশিন লার্নিং স্পেশালিস্ট (৮২ শতাংশ)। এরপরের সারিতে আছে সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার (৫৭ শতাংশ), সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট (৫৩ শতাংশ) এবং ডেটা অ্যানালিস্ট ও সায়েন্টিস্ট (৪১ শতাংশ)। এই তালিকা থেকেই বোঝা যায়, শুধু একটি নির্দিষ্ট পেশা নয়; বরং প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা ও ডেটাভিত্তিক দক্ষতার চাহিদা আগামী দিনে সমানভাবে বাড়বে। এই পরিবর্তনের গতি এতটাই দ্রুত যে ভবিষ্যতের চাকরির বাজার সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন।

‘বিশাল বিপ্লব সামনে আসছে, আমাদের রেডি থাকতে হবে’

ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি বলেছেন, ‘মানুষের ইতিহাসে এই প্রথম এমন একটি সময় এসেছে, যখন কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না ২০ বা ৩০ বছর পর চাকরির বাজার কেমন হবে।’ তাই আজ যে বিষয়ে পড়তে চাচ্ছেন, চার বছর পর সেই বিষয়ের বাস্তবতা আজকের মতো না–ও থাকতে পারে, এই সম্ভাবনা মাথায় রাখা জরুরি।

এ কারণেই কম্পিউটার সায়েন্স, ডেটা সায়েন্স, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও তথ্যপ্রযুক্তি–সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর গুরুত্ব আগামী দিনে আরও বাড়বে। পাশাপাশি মেশিন লার্নিং, রোবোটিকস, সাইবার নিরাপত্তা ও ইন্টারনেট অব থিংসের (আইওটি) মতো ক্ষেত্রেও দক্ষ জনবলের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। গণিত, যুক্তি ও পরিসংখ্যানে যাঁদের আগ্রহ রয়েছে, তাঁদের জন্য এসব ক্ষেত্র হতে পারে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন, এআই কেবল কম্পিউটার সায়েন্সের বিষয় নয়। ব্যবসায় শিক্ষা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষি, আইন কিংবা সাংবাদিকতা, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। আইনে এআই–চালিত নথি বিশ্লেষণ, কৃষিতে ডেটাভিত্তিক ফলন পূর্বাভাস কিংবা চিকিৎসায় রোগনির্ণয়ে এআইয়ের ব্যবহার তারই প্রমাণ। তাই যে বিষয়েই কেউ পড়াশোনা করুক না কেন, প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং তা কাজে লাগানোর দক্ষতা অর্জন করা এখন প্রায় অপরিহার্য। ভবিষ্যতে প্রতিটি পেশায় প্রযুক্তি একটি সহায়ক দক্ষতা হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই নিজের মূল বিষয়ের পাশাপাশি ডেটা বিশ্লেষণ, প্রোগ্রামিং বা প্রযুক্তি–সম্পর্কিত মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে প্রশ্ন আসে, এআই–নির্ভর ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়া যাবে কীভাবে। প্রথমত, এআই–সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে এর সঙ্গে পরিচিত হতে হবে, কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে শিখতে হবে। দ্বিতীয়ত, এমন দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে, যা এআই সহজে অনুকরণ করতে পারে না। যেমন নেতৃত্ব, কার্যকর যোগাযোগ, সৃজনশীল চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা। তৃতীয়ত, শিক্ষাজীবন শেষ হলেই শেখা থেমে যাবে, এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আজীবন শেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

ভবিষ্যৎ–চিন্তক অ্যালভিন টফলার বহু আগেই বলেছিলেন, ‘একবিংশ শতাব্দীর প্রকৃত নিরক্ষর তারা নয়, যারা পড়তে ও লিখতে জানে না; বরং তারা, যারা নতুন করে শিখতে, পুরোনো ধারণা ভুলে যেতে এবং আবার শিখতে জানে না।’ প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনের যুগে চার বছর পরও নতুন কিছু শেখার প্রয়োজন হবে, আবার ১০ বছর পরও হবে। তাই শেখার ক্ষমতাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা।

অভিভাবকদের প্রতিও একটি অনুরোধ থাকবে। সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে তাকে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ঠেলে দেওয়ার পরিবর্তে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করুন। পরীক্ষার ফলাফল বা সামাজিক প্রত্যাশার চেয়ে সন্তানের প্রকৃত আগ্রহ, সক্ষমতা ও শেখার মানসিকতাকে গুরুত্ব দেওয়াই দীর্ঘ মেয়াদে ভালো ফল বয়ে আনে।

সবশেষে বলা যায়, বিষয় নির্বাচনের সময় দ্বিধাগ্রস্ত না হয়ে নিজের আগ্রহ, দক্ষতা ও ভবিষ্যতের বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। প্রযুক্তি বদলাবে, পেশার ধরনও বদলাবে। কিন্তু শেখার আগ্রহ, নতুন দক্ষতা অর্জনের মানসিকতা ও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা—এই তিন গুণ কখনো পুরোনো হবে না। আজ যে শিক্ষার্থী এই প্রস্তুতি শুরু করবে, এআই–নির্ভর আগামী পৃথিবীতে সে–ই এগিয়ে থাকবে।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) উপাচার্য এ বি এম শওকত আলীমেসির বাবার কাছ থেকে অভিভাবকদের যে বিষয়গুলো শেখার আছে

Read full story at source