শ্রমিকের জীবন নিয়ে কেন এই উপেক্ষা
· Prothom Alo

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণহানির ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করল, জাহাজভাঙা শিল্পে নাগরিকের নিরাপত্তার বিষয়টি সরকার ও মালিকদের কাছে কতটা গুরুত্বহীন। পরিবেশগত দিক থেকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় জাহাজভাঙা শিল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য এই শিল্পের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। তবে তাই বলে জাহাজভাঙা শিল্পে রাষ্ট্রের আইন ও শ্রমিকের নিরাপত্তা বরাবর কেন উপেক্ষিত থেকে যাবে।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, শুক্রবার সকালে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামের কারখানায় স্ক্র্যাপ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার আগেই কারখানাটির বিরুদ্ধে শ্রমিকের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে মামলা করেছিল কলকারখানা ও পরিদর্শন অধিদপ্তর। এরপরও কয়েক দফা নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মালিকপক্ষ তাতে কর্ণপাত করেনি। প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকেরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিদের যদি সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যেত, তাহলেও এত মানুষের প্রাণহানি হতো না। আমরা মনে করি, এটিকে কোনোভাবেই দুর্ঘটনা বলার সুযোগ নেই; এটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের বড় উদাহরণ।
Visit moryak.biz for more information.
জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে এই গাফিলতি ও আইনের উপেক্ষা বহু বছর ধরেই চলে আসছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৮টি দুর্ঘটনায় ৩ জন নিহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, এই শিল্প শ্রমিকের জীবনের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আধুনিক অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নানা শর্ত পূরণের মাধ্যমে শিপইয়ার্ডগুলো ‘গ্রিন ইয়ার্ডে’ রূপান্তরিত হচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে অবকাঠামো ও সনদে পরিবর্তন এলেও দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বন্ধ হয়নি। এর সবচেয়ে বড় কারণ, এখনো জাহাজ কাটা চলছে সেই পুরোনো পদ্ধতিতে; অর্থাৎ ঝুঁকি শনাক্ত, গ্যাস মনিটরিং, শ্রমিক প্রশিক্ষণ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারে ঘাটতি রয়েই গেছে। এর সঙ্গে জাহাজ কাটার আগে বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্য সংস্থাগুলো যথাযথভাবে তদারক করে ছাড়পত্র দেয় কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ফেরদৌস স্টিলের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কারখানা কর্তৃপক্ষ ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কেউই নিরাপত্তা ও ঝুঁকি নিরূপণের কাজটি যথাযথভাবে করেনি। কারখানা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, সেফটি বিভাগের লোকজন কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখাশোনার সময় তাঁরা মারা যান। প্রশ্ন হচ্ছে, সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়া কীভাবে জাহাজের ভেতরে শ্রমিকদের পাঠানো হলো? বিস্ফোরক অধিদপ্তর বলছে, কার্গো গ্যাস ট্যাংক ও ইঞ্জিনকক্ষের গ্যাস চেম্বারগুলো গ্যাসমুক্ত আছে কি না, সেটা দেখার দায়িত্ব তাঁদের। প্রশ্ন হচ্ছে, বড় জাহাজে আরও যেসব ট্যাংক ও গ্যাস চেম্বার থাকে, সেগুলো গ্যাসমুক্ত আছে কি না, সেটা দেখবে কারা?
কারখানা কর্তৃপক্ষ নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দোষ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্ঘটনার কারণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল, সেটা তদন্তে কমিটি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই শিল্পের নিরাপত্তাসহ সার্বিক পরিবেশ মূল্যায়নে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি করা হয়েছে। আমরা আশা করি, জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
আমরা মনে করি, জাহাজভাঙা শিল্পে বারবার দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরও মালিকপক্ষ ও তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর গাফিলতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এমন দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ভবিষ্যতে এমন কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড ঠেকানোর জন্যই সবার আগে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।