‘আমাকে শান্তিতে মরতে দাও’, কী ঘটেছিল তৃষার জীবনের শেষ ৯০ মিনিটে

· Prothom Alo

মাত্র পাঁচ মাসের সংসারজীবন। কিন্তু সেই অল্প সময়েই সম্পর্ক এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে তৃষা শর্মা তাঁর ভাবিকে হোয়াটসঅ্যাপে লিখেছিলেন, ‘ওকে বলো, স্ত্রীর যা অবশিষ্ট আছে, কাল এসে নিয়ে যাক। এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’

Visit syntagm.co.za for more information.

মধ্যপ্রদেশের ভোপালে ১২ মে রাতের সেই বার্তাটি এখন ভারতের বহুল আলোচিত তৃষা শর্মার মৃত্যুর মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। ১৪ আগস্ট কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই) আদালতে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, স্বামী সমর্থ সিং ও শাশুড়ি গিরিবালা সিংয়ের ধারাবাহিক মানসিক নির্যাতন তৃষাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।

অভিযোগপত্রে শুধু মৃত্যুর রাতের ঘটনাই নয়, বিয়ের পর টানা কয়েক মাসে কীভাবে সম্পর্ক ভেঙে পড়েছিল, তারও বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, ফোনকল, সিসিটিভি ফুটেজ, চিকিৎসকদের নোট, পারিবারিক জবানবন্দি এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে এক মর্মান্তিক চিত্র তৈরি হয়েছে।

তৃষা শর্মা একসময় ‘মিস পুনে’ খেতাব জিতেছিলেন। অভিনয়জগতেও কাজ করেছিলেন। পরে করপোরেট চাকরিতে যোগ দেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অনলাইন ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে সমর্থ সিংয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। একই বছরের ৯ ডিসেম্বর তাঁদের বিয়ে হয়।

সিবিআই বলছে, বিয়ের পর থেকেই সমর্থ তৃষাকে অতীতের সম্পর্ক নিয়ে অপমান করতেন, অশালীন ভাষায় গালাগাল দিতেন এবং চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। অভিযোগ, তৃষা এসব নিয়ে শাশুড়ির কাছে অভিযোগ করলে তিনি ছেলের পক্ষ নিতেন।
সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়ে ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে। এ সময় তৃষার বাবা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বাবার পাশে থাকতে তিনি বাপের বাড়িতে ছিলেন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সমর্থ ও গিরিবালা তাঁকে দ্রুত ভোপালে ফিরে আসতে চাপ দেন।

এর মধ্যেই তৃষা জানতে পারেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এই গর্ভধারণ ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। স্বামীর আচরণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় তিনি গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে দাম্পত্যে নতুন করে তীব্র বিরোধ শুরু হয়।
সিবিআইয়ের দাবি, সমর্থ বারবার তৃষাকে অপমান করেন। অন্যদিকে গিরিবালা গর্ভপাতের সিদ্ধান্তের জন্য তৃষাকে একাধিকবার ‘খুনি’ বলেছিলেন। অভিযোগপত্রে আর্থিক চাপের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, তৃষার প্রায় ২০ লাখ রুপির শেয়ার বিনিয়োগ ছিল। সমর্থ ও তাঁর মা নাকি সেই অর্থ যৌথ ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। তৃষা তা অস্বীকার করে জানান, এই অর্থ তাঁর বাবার।
এদিকে মানসিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছিল তৃষার। ৩০ এপ্রিল মাকে পাঠানো এক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় তৃষা লেখেন, ‘আমার জীবন নরক হয়ে গেছে।’

বিয়ের আসরে তৃষা ও সমর্থ। ইনস্টাগ্রাম থেকে

মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছেও যান তৃষা শর্মা। চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তৃষা তীব্র উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন। তাঁকে উদ্বেগ কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়।

৬ মে তৃষা শর্মা আগের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। একই দিন গর্ভপাতের প্রথম ওষুধ খান। পরদিন ভোরে মাকে বারবার বার্তা পাঠিয়ে অনুরোধ করেন, তাঁকে যেন ওই বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।

৭ মে আরেক চিকিৎসকের কাছে গেলে তৃষা জানান, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন গর্ভপাতের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, তৃষা তখন ভীষণ মানসিক চাপে ছিলেন।

৮ মে দ্বিতীয় ওষুধ খাওয়ার পর তৃষা শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রচণ্ড ব্যথা ও রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। অভিযোগ, সমর্থ এটিকে ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে দেন এবং শাশুড়িও তাঁকে উপেক্ষা করেন।

৯ মে মাকে পাঠানো বার্তায় তৃষা অভিযোগ করেন, সমর্থ এমনকি প্রশ্ন তুলেছেন, যে সন্তানটির গর্ভপাত হয়েছে, সেটি আদৌ তাঁর সন্তান ছিল কি না। তিনি লেখেন, ‘এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।’

তদন্তকারীরা আরও জানিয়েছেন, তৃষার সাবেক নিয়োগকর্তা বলেছেন, বাড়িতে তৃষার ওপর সব সময় নজরদারি চলত। ফোনালাপও পর্যবেক্ষণ করা হতো। তাই কখনো কখনো কাছের পার্কে গিয়ে তিনি কথা বলতেন।

বিয়ের আসরে তৃষা ও সমর্থ। ইনস্টাগ্রাম থেকে

মৃত্যুর দিন, ১২ মে সকালেই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তৃষা। তিনি মায়ের কাছে তিন হাজার রুপি চান, যাতে রাজস্থানের নাসিরাবাদের ট্রেনের টিকিট কাটতে পারেন। বাবা সেই টাকা পাঠিয়ে দেন এবং তিনি টিকিটও কেটে ফেলেন।

এরপর সমর্থ দাম্পত্য পরামর্শে (কাপল কাউন্সেলিং) যেতে রাজি হন। দুজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কাকলি রায়ের সঙ্গে দেখা করেন। অভিযোগপত্রে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সমর্থকে ধৈর্য ধরে স্ত্রীর কথা শোনার পরামর্শ দেন এবং দুজনকেই মাদক ব্যবহার বন্ধ করতে বলেন।

সেদিন বিকেলে তৃষা একটি বিউটি পার্লারে যান। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখেন, সমর্থ ও গিরিবালা বাইরে হাঁটছেন। তিনি তাঁদের সঙ্গে যোগ দিতে চাইলে তাঁরা তাঁকে উপেক্ষা করেন বলে অভিযোগ।

এরপর মাকে ফোন করে তৃষা জানান, এই সম্পর্ক আর বাঁচানো সম্ভব নয়। তিনি চিরতরে ভোপাল ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাত ৯টা ২০ মিনিটের দিকে ভাবি রাশি আবরোলের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তৃষা কান্নায় ভেঙে পড়েন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি জানান, পিঠে ব্যথা থাকায় স্বামীকে ঘরে ঘুমাতে বলেছিলেন। কিন্তু সমর্থ নাকি উল্টো আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে আসে সেই শেষ বার্তা, ‘এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’

সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ৯টা ৪০ মিনিটে তৃষা একা ছাদে ওঠেন। এক মিনিট পর বাবাকে ফোন করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সমর্থ খুব আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন, তিনি ভয় পাচ্ছেন এবং বাবা-মাকে দ্রুত আসতে বলেন।

রাত ১০টা ৫ মিনিটে তৃষা মায়ের সঙ্গেও কথা বলেন। এরপর মা বারবার ফোন করলেও আর যোগাযোগ হয়নি। পরে শাশুড়িকে ফোন করে মেয়ে কাঁদছে বলে খোঁজ নিতে অনুরোধ করেন।

দুর্ঘটনায় করুণ মৃত্যু হয়েছিল, ৬২ বছরে করেছিলেন আড়াই হাজার সিনেমা

সিসিটিভিতে দেখা যায়, রাত ১০টা ২৩ মিনিটে গিরিবালা ও পরে সমর্থ ছাদের দিকে যান। কিছুক্ষণ পর তৃষাকে নিচে নামিয়ে ভোপালের এইমসে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ মামলায় প্রথম থেকেই নানা বিতর্ক ছিল। পরিবারের অভিযোগের পর আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত করা হয়। দিল্লি এইমসের বিশেষজ্ঞ বোর্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৃষার মৃত্যু ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার ফলেই হয়েছে। শরীরে হামলার কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ সিবিআইয়ের অভিযোগ হত্যা নয়; বরং দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন ও নিষ্ঠুর আচরণ তৃষাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছে। ফরেনসিক মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, তৃষা দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক নির্যাতন, হতাশা ও একাকিত্বের মধ্যে ছিলেন। পর্যাপ্ত মানসিক সমর্থনের অভাব তাঁকে চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে সমর্থ সিং ও গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে সিবিআই। তবে তদন্ত এখানেই শেষ নয়। তৃষার আইফোনের ফরেনসিক তথ্য এখনো বিশ্লেষণাধীন। বাড়ির সিসিটিভি রেকর্ডারের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সেটিও পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি পণ-সংক্রান্ত অভিযোগের দিকটিও আলাদাভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে সিবিআই।

এনডিটিভি অবলম্বনে

Read full story at source