কনসার্ট-গানের অনুষ্ঠানে বাধা ও হামলার ঘটনা কি চলতেই থাকবে

· Prothom Alo

দেড়-দুই সপ্তাহ আগের ঘটনা। ফেসবুকে ভাইরাল এক ভিডিও। প্রধানমন্ত্রীকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান শোনাচ্ছে একটা শিশু। গান শোনার পর প্রধানমন্ত্রী তাকে উৎসাহ দিলেন, গানের চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। অনেক বড় শিল্পী হতে হবে।

Visit sport-tr.bet for more information.

পরে আমরা জানতে পারলাম, হারমোনিয়ামটা ছিল প্রধানমন্ত্রীরই দেওয়া উপহার। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেল, রংপুরের গঙ্গাচড়ার খুদে সংগীতশিল্পী অনুশ্রী রায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে একটি হারমোনিয়াম উপহার চেয়েছিলেন, কারণ তার হারমোনিয়াম কেনার সামর্থ্য নেই। পরে প্রধানমন্ত্রী তাকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানিয়ে এ হারমোনিয়াম উপহার দেন।

শুধু এ ঘটনা নয়; ছবি আঁকা, গান শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো তথা সংগীতচর্চাকে উৎসাহিত করে প্রধানমন্ত্রীর আরও বক্তব্য আমরা পেয়েছি ইতিমধ্যে। সংস্কৃতিচর্চার প্রতি সরকারপ্রধানের এমন অনুরাগ বা মনোযোগ নিয়ে নাগরিক সমাজের অনেকে আশান্বিত হয়েছিলেন, অনেকে তাঁর প্রশংসাও করেছিলেন। কিন্তু এসব আশা ধাক্কা খায় যখন হামলা, ভাঙচুর, সংঘর্ষ বা হুমকি-ধমকিকে কোনো গানের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় বা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইনসের ভেতরে ঢুকে জেলা পুলিশের আয়োজিত গানের অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। পরদিন কিশোরগঞ্জে ‘ইমাম-উলামা পরিষদ’ নামে ধর্মীয় সংগঠনের হুমকির মুখে একটি কনসার্ট বন্ধ হয়ে গেছে।

এক খুদে শিল্পীকে হারমোনিয়াম উপহার দিয়ে প্রশংসিত হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সচিবালয়, ঢাকা; ৬ আগস্ট ২০২৬

বিএনপি সরকারের ছয় মাসে দেশে কতটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে চলছে নানা পর্যালোচনা। সেখানে নানা বিষয়ের সঙ্গে গুরুত্ব পেয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কতটা প্রত্যাশিত স্বস্তি আসল?

এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জের এ দুই ঘটনা। আইনশৃঙ্খলার বাইরে ঘটনাগুলোকে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও ক্ষমতাচর্চার জায়গা থেকে দেখার জোরালো যুক্তি আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি সেভাবেই বেশি আলোচনায় এসেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মাজার, ওরস, কাওয়ালি, গানের অনুষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও বাধার দেওয়ার অনেক ঘটনা সেই সঙ্গে ‘তৌহিদি জনতার’ ক্ষমতাচর্চা এবং এ নিয়ে নানা ভয়, উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক আমরা দেখেছি। যে কারণে জামায়াত বা ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতায় চলে আসার হাইপের বিপরীতে নির্বাচনে বিএনপির বিজয়কে মাজার-ওরস-গানের অনুষ্ঠানে হামলার জবাব হিসেবে দেখেছিল লিবারেল মধ্যবিত্ত সমাজ।

মাজার–ওরসে হামলা চলছে, সরকার কি নির্বিকারই থাকবে

তবে নির্বাচনে বিএনপির বিজয় নিয়ে এমন মনোভাবে বড় ধাক্কাটা লাগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগরে এক পীরকে হত্যা এবং তার আস্তানায় ভাঙচুরের ঘটনায়। যেখানে জামায়াত, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও যুক্ত ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়। এর মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মব ভায়োলেন্সের ধারাবাহিকতাই দেখা গেল।

ফিলিপনগরের পর আলোচনা তৈরি হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি স্কুলে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামে একটি সিনেমার প্রদর্শনীকে ঘিরে। অশ্লীলতার প্রদর্শন বলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের হুমকির পর স্থানীয় প্রশাসন সিনেমার প্রদর্শনীটির আয়োজন বন্ধ করে দেয়।

একইভাবে ইসলামি মূল্যবোধবিরোধী কার্যক্রম হিসেবে অবহিত করা হয় কিশোরগঞ্জে কনসার্টটিকে। ১৯ আগস্ট সে কনসার্টে ‘অ্যাশেজ’, ‘নোবেলম্যান’ ব্যান্ডসহ একাধিক ব্যান্ড পারফর্ম করার কথা ছিল। এর দুই দিন আগে জেলা প্রশাসকের কাছে ‘শরিয়তবিরোধী গান-বাজনা ও কনসার্ট বন্ধ প্রসঙ্গে’ একটি আবেদন জানায় ইমাম-উলামা পরিষদ, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা।

সংগঠনটির সভাপতি মাও. আহমাদুল্লাহ স্বাক্ষরিত আবেদনপত্রটিতে লেখা হয়, ‘...কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়ামে শরিয়তবিরোধী গান-বাজনার অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে। প্রকাশ্য ধরনের অনুষ্ঠান আল্লাহ-তাআলার আযাব আসার কারণ। বিগত সরকারের আমলেও কিশোরগঞ্জের জমিনে তওহিদী জনতা ও ওলামায়ে কেরামের ভূমিকায় এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় এ রকম অনুষ্ঠান হতে পারেনি। এখন যদি এ রকম প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয় তাহলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতএব শরিয়তবিরোধী উক্ত অনুষ্ঠান বন্ধ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।’

কিশোরগঞ্জে কনসার্ট বন্ধের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে ইমাম–উলামা পরিষদের আবেদন। এ কনসার্টে ‘অ্যাশেজ’, ‘নোবেলম্যান’ ব্যান্ডসহ একাধিক ব্যান্ডের পারফর্ম করার কথা ছিল

একটি গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় এমন বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমাদের সমাজব্যবস্থার সঙ্গেও তা অনেকাংশে সাংঘর্ষিক। আর ‘পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে’—এমন বক্তব্যে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির প্রচ্ছন্ন হুমকির বিষয়টিই প্রতীয়মান।

ফেসবুকে নামের আগে মুফতি উল্লেখ করা কিশোরগঞ্জের একজন মওলানা (নিজের বায়োতে উল্লেখ করেছেন তিনি একজন মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল) লিখেছেন—‘কিশোরগঞ্জে যদি ASHES আসে, তাহলে তাদের সত্যিই ASHES—অর্থাৎ ছাই বানিয়ে দেওয়া হবে।’ এর মধ্য দিয়ে কি প্রাণনাশের হুমকিই স্পষ্ট হয় না?

এমন পরিস্থিতি জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কনসার্টটি স্থগিত হয়ে যায়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের বক্তব্য, ‘হোটেল নিবন্ধন আইন অনুযায়ী তারা কোনো আবেদন করেনি, হোটেলের লাইসেন্সও নেয়নি। যে প্রতিষ্ঠান বৈধ না বা অনিবন্ধিত, তাদের কোনো কাজে সম্মতি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ এমন বক্তব্যে নিঃসন্দেহে এটাও প্রতীয়মান হয়, জেলা প্রশাসন আসলে ইমাম-উলামা পরিষদের কাছে নতি স্বীকারই করেছে।

পুলিশ লাইনসের ভেতরের হামলা থেকে শুরু করে স্বাধীন চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বা সংগীতের কনসার্ট—সর্বত্রই এখন একধরনের ‘মবভীতি’ কাজ করছে। যখন রাষ্ট্র ও প্রশাসন মব বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর দাবির সামনে আত্মসমর্পণ করে, তখন সমাজে এই বার্তাই পৌঁছায় যে—আইন নয়, পেশিশক্তি ও হুমকিই এখন শেষ কথা। এই ক্ষমতাচর্চাকে কি বিএনপি সরকার প্রশ্রয় দিয়ে যাবে?

উগ্রবাদিতার কাছে প্রশাসনের এমন হতাশাজনক অবস্থানের ফলাফল আমরা দেখি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, যেখানে পুলিশের আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই হামলার শিকার হয়।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, পুলিশ লাইনসের পশ্চিম পাশে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান প্রতিষ্ঠিত দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসার অবস্থান। অনুষ্ঠান চলাকালে উচ্চ স্বরে গান-বাজনার অভিযোগ তুলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে বাধা দেন। এতে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের কথা-কাটাকাটি হয়।

পরে মাদ্রাসার শতাধিক শিক্ষার্থী পুলিশ লাইনসে ঢুকে অনুষ্ঠানস্থলের চেয়ার ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনতে লাঠিপেটা শুরু করলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জবাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে পুলিশের সাত সদস্যসহ উভয় পক্ষের ৩০ জন আহত হন। এ ঘটনার পর রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা শহরের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ করেন।

আমরা দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী যখন চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসেন, তার ৮-১০ দিন পর হেফাজতেরই মহাসচিবের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দ্বারা পুলিশের অনুষ্ঠান হামলার শিকার হয়। আর পুলিশের গানের অনুষ্ঠানই যখন আক্রান্ত হয়, তখন নাগরিক সমাজের মধ্যে গভীর শঙ্কা তৈরি হওয়ারই কথা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর প্রতিফলনও দেখি।

সংঘর্ষের পর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ করেন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা।মঙ্গলবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে হাসপাতাল সড়কে

যদিও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের এই হামলাকে ন্যায্যতা দিতে অনেকে ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন’ হাজির করেছেন। শিক্ষার্থীদের পরদিন পরীক্ষা থাকায় তাঁরা উচ্চ স্বরে গানবাজনা বন্ধ করতে বলেছিলেন। তার পাল্টা যুক্তি হিসেবে নভেম্বর-ডিসেম্বরে যখন স্কুল-কলেজগুলোতে পরীক্ষা চলে তখন রাত পর্যন্ত উচ্চ স্বরে ওয়াজ-মাহফিল নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। নাগরিক সমাজের এমন তর্কবিতর্কে কি সরকারের দায় কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার বিষয়টি আড়ালে পড়ে যায় না?

দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি ঘটনার ভেতরের ছকটি অভিন্ন। প্রথমত, কোনো গোষ্ঠী নিজেদের মতো করে ‘অশ্লীলতা’ বা ‘আপত্তি’র তকমা লাগিয়ে সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা ও হুমকি দেবে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংবিধানে দেওয়া নাগরিকদের সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষা করার বদলে আয়োজকদের অনুষ্ঠান স্থগিত বা বাতিল করতে বাধ্য করবে। তৃতীয়ত, এই নতিস্বীকারের মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গোষ্ঠীকে আরও প্ররোচিত করা হবে।

সমাজে ধর্মীয় বিতর্কের রূপান্তর ও মীমাংসা–অমীমাংসার সীমানা

পুলিশ লাইনসের ভেতরের হামলা থেকে শুরু করে স্বাধীন চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বা সংগীতের কনসার্ট—সর্বত্র একধরনের ‘মবভীতি’ কাজ করছে এখনো। যখন রাষ্ট্র ও প্রশাসন মব বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর দাবির সামনে আত্মসমর্পণ করে, তখন সমাজে এই বার্তাই পৌঁছায় যে—আইন নয়, পেশিশক্তি ও হুমকিই এখন শেষ কথা।

এই ক্ষমতাচর্চাকে কি বিএনপি সরকার প্রশ্রয় দিয়ে যাবে? তাহলে সামনের দিনগুলোয় সরকারের জন্য কঠিন পরিস্থিতিই অপেক্ষা করছে বলতে হবে, দেশের মানুষের জন্যও।

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই-মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source