রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়বে কি

· Prothom Alo

রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। সরকারের সব নির্বাহী ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতির নামে নেওয়া হলেও রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ক্ষমতা খুবই সীমিত। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য যেকোনো কাজ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছুটা বাড়ত।

Visit afnews.co.za for more information.

রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো এবং কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোসহ বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব ছিল জুলাই সনদে। তবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসেও সেই সনদ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাও বাড়েনি।

অবশ্য ক্ষমতাসীন বিএনপি বলেছে, যেভাবে জুলাই জাতীয় সনদ সই হয়েছে, তারা সেভাবে বাস্তবায়ন করবে; সে অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করবে। শেষ পর্যন্ত এটি হলে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন—এই চার প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনভাবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা পাবেন রাষ্ট্রপতি।

সাংবিধানিক সংস্কারের অন্যতম উদ্দেশ্য—ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার উত্থান রোধ এবং রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ, পর্যাপ্ত ক্ষমতায়ন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ওই বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ’ ও ‘রাষ্ট্র সংস্কার’। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার আনার লক্ষ্যে প্রস্তাব তৈরি করতে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। পরে কমিশনগুলোর প্রস্তাবগুলো নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করতে গঠন করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ। যেখানে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব স্থান পায়। এর মধ্যে সংবিধান–সম্পর্কিত প্রস্তাব আছে ৪৮টি। সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব স্থান পেয়েছে। অবশ্য কিছু প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত আছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে নির্বাহী বিভাগের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর এবং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গড়ে তোলা আবশ্যক। এই লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং কার্যকরী ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি।

বিদ্যমান সংবিধান পর্যালোচনা করে সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, কার্যকর ভারসাম্যের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর হুমকি। ক্ষমতার ব্যাপক কেন্দ্রীকরণ প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরশাসকে পরিণত করেছে। সাংবিধানিক সংস্কারের অন্যতম উদ্দেশ্য—ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার উত্থান রোধ এবং রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ, পর্যাপ্ত ক্ষমতায়ন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে নির্বাহী বিভাগের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর এবং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গড়ে তোলা আবশ্যক। এই লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং কার্যকরী ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি।

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত, শপথ শুক্রবার সন্ধ্যায়

এসব উদ্দেশ্য পূরণে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার কথা বলেছিল কমিশন। এ জন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ পদ্ধতি বদলানো, কিছু নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়া, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, একই ব্যক্তি যাতে দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে না পারেন সে ব্যবস্থা করা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করার মতো প্রস্তাব ছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এসব ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন আসে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তাতে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান; প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার (এনএসআই) মহাপরিচালকসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবে যা আছে

সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার হলেও তিনি ইচ্ছেমতো কাউকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন না। সংবিধানে বলা আছে, যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবে, রাষ্ট্রপতি তাঁকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তাতে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান; প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার (এনএসআই) মহাপরিচালকসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, বেতন–ভাতাসহ যেসব সুবিধা পান

তবে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হয়—জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, তথ্য কমিশনের প্রধান ও সদস্য, প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি স্বাধীন থাকবেন। এসব ক্ষেত্রে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিতে পারবেন। এটি জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার বিষয়ে বিএনপির আপত্তি আছে।

বিএনপি বলে আসছে, তারা ভিন্নমতসহ যেভাবে জুলাই সনদ সই করেছে, সেভাবে বাস্তবায়ন করবে। সংবিধান সংশোধন করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কাজ শুরু করেছে। যদিও বিরোধী দল এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছে।

অন্যদিকে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে। তবে কীভাবে এটি করা হবে, তার বিস্তারিত সেখানে উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া দলটি তাদের ইশতেহারে উপরাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টির কথাও বলেছে।

বিএনপি বলে আসছে, তারা ভিন্নমতসহ যেভাবে জুলাই সনদ সই করেছে, সেভাবে বাস্তবায়ন করবে। সংবিধান সংশোধন করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কাজ শুরু করেছে। যদিও বিরোধী দল এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিএনপির ভিন্নমত অনুসারে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন করা হলে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল ও আইন কমিশনে স্বাধীনভাবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা পাবেন রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়েও জুলাই সনদে প্রস্তাব আছে। এখন ভোট হয় প্রকাশ্যে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারেন না। জুলাই সনদে সংসদের নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করার প্রস্তাব আছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ভবিষ্যতে সংবিধানের যে সংশোধনী আসবে, ৭০ ধারাতেও পরিবর্তন আসবে।

সেখানে বলা হয়েছে, অর্থ বিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যরা সংসদে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। অবশ্য এ ক্ষেত্রে বিএনপির ভিন্নমত আছে। তারা বলেছে, অর্থ বিল, আস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় নিরাপত্তা (যুদ্ধ পরিস্থিতি) ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।

গতকাল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদ না থাকলে এবং স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলে রাষ্ট্রপতির পদটি আরও বেশি সম্মানিত হতো। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকেও আমরা এগোতে পারতাম; কিন্তু সেটা হচ্ছে না।’

একই দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভবিষ্যতে সংবিধানের যে সংশোধনী আসবে, ৭০ ধারাতেও পরিবর্তন আসবে। জুলাই জাতীয় সনদে আমরা যেভাবে একমত হয়েছি, সেভাবে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধিত হয়ে যাবে, তার পরবর্তী সময়ে যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে, তখন সেই ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারেই হবে।’

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ৭০ অনুচ্ছেদ না থাকলে এবং স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলে রাষ্ট্রপতির পদটি আরও বেশি সম্মানিত হতো।

Read full story at source