‘অল্প বয়সে মাইয়েডা বিয়ে দিয়ে চরম ভুল হইয়েছে’
· Prothom Alo

নড়াইল সদর উপজেলার কুয়েতপ্রবাসী এক বাবা। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকে বিয়ে দিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। তিনি যে ভুল করেছেন, সেই ভুল যাতে আর কেউ না করেন, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন।
সম্প্রতি নিজ বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে ওই বাবা প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাইয়েডা ইস্কুলে যাতো না। এর জন্যি বিয়ে দিয়ে দিছিলাম। বিয়ের পর দুইবার শ্বশুরবাড়ির যাওয়ার পর আর যায়নি। পরে ছাড়াই (বিবাহবিচ্ছেদ) রাহে দিছি। এহন আর পড়াশোনা করতিছে না, বাড়িই আছে। বয়স না হলি আর বিয়ে দেব না। অল্প বয়সে মাইয়েডা বিয়ে দিয়ে চরম ভুল হইয়েছে।’
Visit sportfeeds.autos for more information.
ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস) তথ্য অনুযায়ী, নড়াইলে বাল্যবিবাহের হার ৭১ শতাংশ। এটি সারা দেশের মধ্যে দ্বিতীয় ও খুলনা বিভাগের মধ্যে প্রথম অবস্থান। আর বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি চাঁপাইনবাবগঞ্জে।
নড়াইলে বাল্যবিবাহের হার ৭১ শতাংশ। এটি সারা দেশের মধ্যে দ্বিতীয় ও খুলনা বিভাগের মধ্যে প্রথম অবস্থান। আর বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি চাঁপাইনবাবগঞ্জে।
তবে বাল্যবিবাহের সাম্প্রতিক জরিপের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি নড়াইলের কোনো সরকারি দপ্তর কিংবা এনজিওর কাছে।
বাল্যবিবাহ ঠেকাতে প্রায়ই মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে থাকে স্থানীয় প্রশাসন। নড়াইল জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর জানায়, প্রশাসন ও এনজিওর লোকজন গত এক বছরে (২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত) বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছেন ৩৩টি।
গত এক সপ্তাহে অন্তত ২০টি এলাকায় গিয়ে এই প্রতিবেদক খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, বাল্যবিবাহ বন্ধ করে আসার পর ৩৩ জনের মধ্যে ১১টি মেয়ের গোপনে বিয়ে হয়ে গেছে। এর মধ্যে দুজনের বিবাহবিচ্ছেদও হয়েছে।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েটিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পারিবারিকভাবে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মাসখানেক পরেই বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। মেয়ের বিয়েতে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন কুয়েতপ্রবাসী ওই বাবা। তিনি বলেন, ‘অল্প বয়সে মাইয়েডা বিয়ে দিয়ে শিক্ষা হয়ছে আমার। সংসার করার মতো বয়স ওর হয়নি। এখন আবার লোকজন আসতেছে মেয়ের বিয়ের জন্যি। কিন্তু মেয়ের ভার-বুদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত আর বিয়ে দেব না। আর কেউ যেন এই ভুল (বাল্যবিবাহ) না করে।’
বেসরকারি সংস্থা সুশীলন-এর লোহাগড়া ও নড়াইল সদর উপজেলা সমন্বয়কারী প্রিতম সরদার বলেন, সপ্তম থেকে দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া কিশোরীরাই বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে বেশি রয়েছে। অল্প বয়সে বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব নিতে গিয়ে অনেকেই তা সামাল দিতে পারে না। এতে সংসারে কলহ লেগেই থাকে। বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের হারও তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ বা বন্ধে অভিভাবকদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও বন্ধে নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেন জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বে) মৌসুমী রানী মজুমদার। তিনি বলেন, বাল্যবিবাহ বন্ধ করার পর নানা সীমাবদ্ধতার কারণে পরে আর তদারক করা হয় না। কোনো প্রত্যন্ত এলাকায় বিয়ে বন্ধের পর ওই পরিবার অন্যত্র নিয়ে বিয়ে দেয়। সে ক্ষেত্রে আসলে প্রশাসন বা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের পক্ষে সবকিছু দেখা সম্ভব হয় না। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সমাজের সবাই মিলে কাজ করতে হবে।
তারিকুজ্জামান লিটু, অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি, নড়াইল জেলা ও দায়রা জজ আদালতবাল্যবিবাহ এক হয় সনদ জালিয়াতি করে। আরেক হয় ধর্মীয়ভাবে বিয়ে দিয়ে রেখে, পরে বয়স পূর্ণ হলে নিবন্ধন করা হয়। নিবন্ধন হওয়ার আগেই যদি বাল্যবিবাহের শিকার ওই কিশোরী নির্যাতনের শিকার হয় কিংবা বিবাহবিচ্ছেদে গড়ায়, সে ক্ষেত্রে তাদের আইনি সুবিধা পেতে বেগ পেতে হয়।অল্প বয়সে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন লোহাগড়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের নারী জুবায়দা খানম (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ‘আমার মাইয়্যারে ১২ বছর বয়সে বিয়ে দিয়া দিছিলাম। সেহানে ১০ দিন থাইকে পরে মাইয়্যে আর গেল না। আমরাও ভুল বুঝতি পাইরে আর পাঠালাম না। এখন লেখাপড়া করাব, তারপর বিয়ে দেব।’
বাল্যবিবাহ দেওয়া পরিবারগুলো বলছে, মূলত দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে ভয়, মেয়ের পড়াশোনায় অমনোযোগিতা এবং অল্প বয়সে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোয় বাল্যবিবাহ দেওয়া হয়।
নড়াইল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি তারিকুজ্জামান লিটু বলেন, বাল্যবিবাহ এক হয় সনদ জালিয়াতি করে। আরেক হয় ধর্মীয়ভাবে বিয়ে দিয়ে রেখে, পরে বয়স পূর্ণ হলে নিবন্ধন করা হয়। নিবন্ধন হওয়ার আগেই যদি বাল্যবিবাহের শিকার ওই কিশোরী নির্যাতনের শিকার হয় কিংবা বিবাহবিচ্ছেদে গড়ায়, সে ক্ষেত্রে তাদের আইনি সুবিধা পেতে বেগ পেতে হয়।