উন্নত মম শির
· Prothom Alo

১৮ বৈশাখ/১ মে ১৯৯৯ নজরুল জন্মশতবার্ষিকী সম্মেলনমালার উদ্বোধনী ভাষণে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এ বক্তৃতা দেন। পরে ২১ মে প্রথম আলোর শুক্রবারের সাময়িকীতে এটি প্রকাশিত হয়। এত দিন বক্তৃতাটি শুধু ছাপা প্রথম আলোর পাতাজুড়েই ছিল, আজ অন্য আলো পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
নজরুল আমাদের আদরের ধন, আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাভাবিক কারণেই দেশে মহাসমারোহে নজরুল জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপিত হচ্ছে। নজরুলের সাহিত্যকর্ম, তাঁর জীবন এবং জীবনের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা গবেষণা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। আমি শুধু একটি বিষয়ে বিশেষ করে কিছু কথা বলব।
তেইশ বছর বয়সে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এই একটি কবিতা প্রকাশমাত্র বাংলা সাহিত্যের আসরে কবির আসন পাকা হয়ে গেল। কোন গুণে কবিতাটির এই অসামান্য সমাদর?
‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি যখন প্রকাশিত হয় তখন নিখিল ভারত কংগ্রেসের বয়স ছত্রিশ। আবেদন-নিবেদন করে তার দিনগত পাপক্ষয় চলছে। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বয়স পনেরো। মুসলিম লীগ একাধারে কামাল পাশাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে এবং তুরস্কের সুলতান ও খলিফার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছে। হাসরত মোহানির পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব কংগ্রেস অধিবেশন বা খেলাফত সম্মেলনে কোথাও গৃহীত হয়নি। এই রাজনৈতিক পটভূমিতে যে কথাটি বলার প্রয়োজন ছিল অথচ বলা হয়নি, সেই কথাটা অকুতোভয়ে উন্নতশিরে ও উচ্চকণ্ঠে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বলা হলো। অঞ্জলিবদ্ধ মানুষকে বজ্রমুষ্ঠি তুলে তার স্বীয় মর্যাদা ঘোষণা করার ডাক দিলেন নকিব নজরুল।
‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের এক বছর পরে ‘ধূমকেতুর পথ’-এর কবিতাটির একটি অনবদ্য পঙ্ক্তির পুনরুক্তি করে কবি বললেন:
সর্বপ্রথম, ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।
স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা, ও-কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে। তাতে কোনো বিদেশির মোড়লি করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ দেশে মোড়লি করে দেশকে শ্মশান-ভূমিতে পরিণত করছেন, তাঁদেরে পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা-পুঁটলি বেঁধে সাগর-পারে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন-নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না। তাঁদের অতটুকু সুবিদ্ধি হয়নি এখনো। আমাদেরো এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকুকে দূর করতে হবে।
পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল-কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খলা মানা নিষেধের বিরুদ্ধে।
আর এই বিদ্রোহ করতে হলে—সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে। বুক ফুলিয়ে বলতে হবে—আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশে।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম‘বিদ্রোহী’র মর্মবাণী—দেশের মানুষকে স্পর্শ করে। মানুষ সাড়া দেয়। কবিতাটি অসাধারণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। কৃতজ্ঞতাভরা কবিকে দেশের লোক স্বাগত জানায়। একত্রিশ বয়সের তরুণ নজরুলকে জাতীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। পরিবার-পরিমণ্ডলের বাইরে পঞ্চাশ বছর পূর্তির পূর্বে জন্মজয়ন্তী পালনের রেওয়াজ বা নজির নেই। কবির বিয়াল্লিশ বছর পূর্তির সময় তাঁর একটি নজিরবিহীন জয়ন্তী পালিত হয়।
নজরুল শতবার্ষিকী উদ্যাপনের উপলক্ষে শিল্পী হাশেম খান যে লোগো বা অভিজ্ঞানচিত্রটি অঙ্কন করেছেন, তার মধ্যে বিদ্রোহী কবিতার প্রাণ মূর্ত হয়ে উঠেছে। প্রজ্বলিত এক অগ্নিশিকার পটভূমিকায় তরুণ নজরুলের বালসূর্যসম জ্যোতিশ্চক্রে কবির বাণীর অভিজ্ঞানস্বরূপ তিনটি শব্দ জ্বলজ্বল করছে—‘উন্নত’, ‘মম’, ‘শির’। এই তিনটি শব্দ যেন আমাদের প্রত্যেকের জীবনে আদর্শ হয়ে থাকে, আমি এই কামনা করি। এমন একটা দারুণ সুন্দর অভিজ্ঞানচিত্র আমাদেরকে উপহার দেয়ার জন্য আমি শিল্পী হাশেম খানকে ধন্যবাদ জানাই।
‘নজরুলের জীবন ও কর্ম’—শীর্ষক একটি চারুকলা প্রদর্শনী আজ উদ্বোধন করতে গিয়ে দেশের ৫০ জন বিশিষ্ট শিল্পীর আঁকা ১০০টি চিত্রকর্মের সঙ্গে আমার একটি চকিত পরিচয় ঘটল। ছবিগুলোর সৌকর্য ও সৌন্দর্য পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে হলে তাড়াহুড়ো না করে রয়েসয়ে দেখতে হবে। আমি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী চিত্রশিল্পীদের অভিনন্দন জানাই।
সাহিত্যরস উপভোগ করতে লেখকের সব কথায় সায় দিতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। নজরুলের সব কথা অভ্রান্ত বলে শিরোধার্য করতে হবে আমি তেমন প্রয়োজন দেখি না। তাঁর ‘ধূমকেতুর পথ’ থেকে আবার কিছু উদ্ধৃতি দিই:
কাজী নজরুল ইসলামআমি যতটুকু বুঝতে পারি, তার বেশি বুঝবার ভান করে যেন কারুর শ্রদ্ধা বা প্রশংসা পাবার লোভ না করি। তা সে মহাত্মা গান্ধীরই মতো হোক আর মহাকবি রবীন্দ্রনাথেরই মতো হোক কিংবা ঋষি অরবিন্দেরই মতো হোক, আমি সত্যিকার প্রাণ থেকে যেটুকু সাড়া পাই রবীন্দ্র, অরবিন্দ বা গান্ধীর বাণীর আহ্বান ঠিক ততটুকু মানব। তাঁদের বাণীর আহ্বান যদি আমার প্রাণে প্রতিধ্বনি না তোলে, তবে তাঁদের মানব না এবং এই ‘মানি না’ কথাটা সকলের কাছে মাথা উঁচু করে স্বীকার করতে হবে। এতে হয়তো লোকের অনেক নিন্দা-বদনাম-অপবাদ শুনতে হবে, কিন্তু আমি আমার কাছে ঠিক থাকব। তাদেরে বা তাদের মতো ঠিক না বুঝেও যদি লোকের কাছে বলে বেড়াই যে, আমি গান্ধী-ভক্ত, রবীন্দ্র-ভক্ত বা অরবিন্দ-ভক্ত, তাতে অনেকের শ্রদ্ধা প্রশংসা লাভ করব, কিন্তু আসলে তো সেটা ফাঁকি দিয়ে নেওয়া। এতে অন্যকে প্রবঞ্চনা করে খুব বাহবা নিতে পারি, কিন্তু আমার অন্তরের দেবতা অর্থাৎ আমার আমি তাতে দিন দিন ক্লিষ্ট-পীড়িতই হয়ে উঠবে।
পটভূমি, প্রেক্ষিত বা প্রসঙ্গের প্রতি খেয়াল না করে কোনো দুর্বৃত্ত যদি চিত্কার করে ওঠে, ‘আমি মানি নাকো কোনো আইন, আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন...’ তখন আমি শঙ্কিত হই। এ দুনিয়ার মহাসড়কে চলতে গেলে সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে এবং নিকট ও দূরের যে দিকনির্দেশনা থাকে এবং তা মেনে চলার জন্য যে আইন তৈরি করা হয় তা মানতে হবে—কেবল মৃত্যুকামী আত্মঘাতীরা তা অমান্য করতে পারে। আমি মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে ‘কারার ঐ লৌহ–কবাট’ গানটি শুনেছি। আবার হত্যাকারীর কণ্ঠেও সেই গান গীত হতে দেখেছি। ধর্মকথা আওড়াতে শয়তানের কোনো বাধা নেই, তার ছলেরও অভাব হয় না।
কাজী নজরুল ইসলামের ৬৮তম জন্ম দিবসে কলকাতায় কবির বাড়িতে নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় হারমোনিয়াম সহযোগে সংগীত পরিবেশন করছেন, পাশে মনযোগ সহকারে শুনছেন কল্যাণী কাজী (কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ), অভিনয়জগতের কিংবদন্তি শিল্পী অনুপ কুমার, রবি ঘোষসহ স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম।তথ্যগত হিসেবে নজরুলের জন্ম ঊনবিংশ শতাব্দীতে। কিন্তু তাঁর ঋদ্ধি-বৃদ্ধি বিংশ শতাব্দীতে। ১৫ ডিসেম্বর ১৯২৯ কলকাতা আলবার্ট হলে যখন নজরুলকে জাতীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়, তখন তাই তিনি বলেন, ‘বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরি অভিযান-সেনাদলের তূর্য-বাদকের একজন আমি—এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি জানি, এই পথ-যাত্রার পাকে পাকে, বাঁকে বাঁকে কুটিল-ফণা ভূজঙ্গ, প্রখর-দংশন শার্দূল পশুরাজের ভ্রুকুটি! এবং তাদের নখর-দংশনের ক্ষত আজো আমার অঙ্গে অঙ্গে। তবু ওই আমার পথ, ওই আমার গতি, ওই আমার ধ্রুব।’
এই বিংশ শতাব্দীতে মানুষ তার জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বদৌলতে এক কল্পনাতীত সাফল্য অর্জন করেছে। উন্নত দেশে মানুষ অভাবিত স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করছে। ক্ষুন্নিবৃত্তি ও রোগমুক্তি আজ মানুষের নাগালের মধ্যে। অবম্য মানবাধিকার সম্পর্কে যত কাজ না হোক তার চেয়ে আমরা কথা শুনছি বেশি। এই মানবাধিকারের প্রথম পাঠ আমরা পেয়েছি নজরুলের কাছ থেকে। নজরুল অবহেলিত কৃষক-মুটে-মজুর-জেলেদের কথা শোনালেন, চোর-ডাকাত ও পতিতা-বারাঙ্গনার প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন, নারীর স্বাধীনতার কথা বললেন। পৃথিবীর বৃহদংশে মানুষ আজও দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবনযাপন করছে। অমানুষের হাতে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ। অসহিষ্ণুতায় মানবসমাজ আজ ক্ষতবিক্ষত। একবিংশ শতাব্দীতে বা পরবর্তী শতাব্দীতে মানুষের এই দুর্দশার অবসান ঘটবে কি না জানি না, তবে যত দিন উত্পীড়িতের ক্রন্দনরোল ধ্বনিত হবে, যত দিন মানুষের অসম্মান ঘটবে মানুষের হাতে, তত দিন নজরুলের বাণী প্রতিরোধ ও প্রেরণার উত্স হয়ে থাকবে।
জাতীয় পর্যায়ে নজরুল জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে কবির বৈচিত্র্যময় প্রতিভার বিভিন্ন দিকে আলোকপাত করার জন্য উদ্যাপন কমিটি নজরুল জন্মশতবার্ষিকী সম্মেলনমালার আয়োজন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সংগীত সম্মেলন, সাধক সম্মেলন, পাঠ ও আবৃত্তি সম্মেলন, কবি সম্মেলন, আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও চারুকলা প্রদর্শনী।
এক মহান ব্যক্তির স্মরণে বক্তৃতামালার আয়োজনের কথা শুনেছি। এমন ব্যতিক্রমী ধরনের সম্মেলনমালার ইতিপূর্বে কোনো আয়োজন করা হয়েছিল বলে আমার জানা নেই। দেশ-বিদেশের শিল্পী, সাধক, গবেষকদের উপস্থিতিতে এবং সম্মেলনমালায় তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণে এই সম্মেলন সমৃদ্ধ হবে। তাঁদেরকে আমি সাদর অভ্যর্থনা জানাই। নজরুল জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের জন্য গঠিত জাতীয় কমিটি, জাতীয় জাদুঘর, নজরুল ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অধিকারীদের এ সম্মেলনমালার আয়োজনের জন্য আমি অভিনন্দন জানাই।
এই সম্মেলনের সাফল্য কামনা এবং সকলকে অভিনন্দন জানিয়ে এবং আমাকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে এই সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করছি।