আঁধার গলির জীবন পেরিয়ে আলোর ঠিকানায় ভাসমান যৌনকর্মীরা

· Prothom Alo

রাজধানীর মুগদার বেশ পুরোনো একটি জীর্ণশীর্ণ ভবন। নিচতলায় পা রাখতেই চোখে পড়ে ছোট ছোট স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার কয়েকটি গলিঘর। প্রথম রুমটির দরজায় দাঁড়াতেই দেখা যায় একদল ছোট ছোট শিশু, বয়স বড়জোর দুই বছর। কেউ আপন মনে খেলছে, কেউবা গোল হয়ে ঘিরে বসেছে এক নারীকে। ছোট্ট চোখগুলোর নিবিষ্ট মনোযোগ তখন বইয়ের পাতার বাংলা অক্ষরগুলোতে।

অচেনা এক আগন্তুককে দরজায় দাঁড়াতে দেখেই তাদের কী উচ্ছ্বাস! ছুটে এসে হাস্যোজ্জ্বল মুখে একযোগে চিৎকার করে উঠল, ‘আসসালামু আলাইকুম!’ অথচ এই শিশুদের সঙ্গে এর আগে কখনোই দেখা হয়নি, নেই কোনো পূর্বপরিচিতি। পা বাড়িয়ে আরেকটু এগোতেই আরও দুটি রুম। কয়েকজন নারী শিশুদের দুপুরের ভাত খাইয়ে দিচ্ছেন। সারিবদ্ধভাবে বসে আছে ২০ থেকে ২৫টি শিশু। সবার সামনে ভাত মাখানো। নতুন এক অপরিচিত মানুষকে হঠাৎ সামনে দেখে অনেকের চোখে ইতস্তত ভাব। তবে অল্প সময়ের মধ্যে সেই জড়তা কাটতেই কয়েকজন শিশু দৌড়ে এসে আবারও একেবারে চেনা মানুষের মতোই মিষ্টি হেসে সালাম জানাল।

Visit casino-promo.biz for more information.

নিচতলার আরেক প্রান্তে চলছে এক অন্য রকম উদ্‌যাপন। বেশ কয়েকজন নারী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন, চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর আত্মবিশ্বাসের ছাপ। সবার হাতে ধরা একটি করে সার্টিফিকেট। রুমটির বেশ বড় অংশজুড়েই সারি সারি সেলাই মেশিন সাজানো। আরেক পাশে স্তূপ করে রাখা বস্তা, দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভেতরে চাল-ডাল, দৈনন্দিন সংসারের টুকিটাকি। সেই নারীরা একে একে দেয়ালে টাঙানো ব্যানারের কাছে আসছেন, হাসিমুখে নিজেদের জীবনের গল্প বলছেন, ছবি তুলছেন।

তবে এই নারীদের হাতে যে সনদ, সেটিকে শুধু প্রশিক্ষণ শেষে একটি সার্টিফিকেট মাত্র ভাবলে ভুল হবে। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনের প্রতিটি ধাপেই জড়িয়ে আছে টিকে থাকার এক কঠিন সংগ্রাম, যা দিনের পর দিন তাঁদের কেবল ঠেলে দিয়েছে সমাজের কিনারায়। সেই লড়াইয়ের খবর আমাদের এই ‘সাজানো-গোছানো সমাজ’ কখনো রাখেনি।

পরিস্থিতির কবলে পড়ে কিংবা বাধ্যবাধকতার শিকার হয়ে একসময় এই নারীদের জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল যৌনকর্মের সঙ্গে। নিয়তির টানে যে জীবন তাঁদের মেনে নিতে হয়েছিল, সেই চেনা গণ্ডি পেরিয়ে তাঁরা এখন নতুন এক পরিচয়ের খোঁজে।

সেলাই আর হাতের কাজের এ প্রশিক্ষণে নতুন স্বপ্ন দেখতে শিখছেন সমাজের নিগৃহীত নারীরা।

এই জীর্ণ ভবনের ঘরগুলোকে শুধু ‘প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ বললে অনেকটাই কম বলা হয়। আয়োজনটি গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন–এর, যেটির বাস্তবায়ন সহযোগী হিসেবে আছে কল্যাণময়ী নারী সংঘ। শুধু সেলাই আর হাতের কাজের প্রশিক্ষণই নয়, বিকল্প কর্মসংস্থান ও অর্থ উপার্জনের পথ তৈরি করে দিয়ে তাঁদের সন্তানদের নিরাপদ দেখভালের দায়িত্বও হাতে তুলে নিয়েছে সংগঠনগুলো। বুঝতে বাকি থাকে না, শুরুতে দেখা সেই শিশুরা তাঁদেরই সন্তান। বর্তমানে সেখানে ৩৯টি শিশু রয়েছে।

এই পুরো আয়োজনের পেছনে যাঁদের হাত, তাঁদের একজন ‘গিভ বাংলাদেশ’-এর নির্বাহী পরিচালক আহমেদ ফাহমি। কাজের সূত্রেই এই নারীদের জীবনের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে তাঁর। শুরুতে কাজটির পরিধি ছিল খুব ছোট। নিজস্ব অর্থায়নে ‘প্রজেক্ট লড়াই’ নামক একটি প্রকল্পের আওতায় মাত্র আটজন নারীকে নিয়ে প্রথম সেলাই প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল। প্রকল্পটি ‘পূর্ব-পশ্চিম’ নামক যৌনকর্মীদের পুনর্বাসন কর্মসূচির একটি অংশ। ধীরে ধীরে সেই পরিধি বেড়ে এখন চলছে ২৭তম ব্যাচ। প্রতি ব্যাচে গড়ে ২২ জন করে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত ২৪৯ জন নারী এই প্রশিক্ষণ শেষ করেছেন।

এই মেয়েদের মারবে কেন

আয়োজনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি নাম ঘুরেফিরে বারবার আসছিল সবার মুখে। ‘রিনা আপা’। শুধু ফাহমি বা অন্য আয়োজকেরাই নন, প্রশিক্ষণ নিতে আসা নারীদের চোখেমুখেও রিনা আপার নাম উচ্চারণের সময় এক অদ্ভুত নির্ভরতা আর ভক্তি দেখা যায়। এই পেশায় জড়িয়ে পড়া নারীদের খুঁজে বের করা, তাঁদের সেই জীবন থেকে ফিরিয়ে আনতে রাজি করানোর কাজটি এতটা সহজ নয়। এই সুকঠিন কাজে প্রধান ভরসা সংগঠনটির সভাপতি রিনা আক্তার।

বয়স যখন মাত্র আট বছর, তখন রিনা আক্তারের পরিবারকে ঢাকা শহরের ভালো কোনো বাসায় গৃহকর্মীর কাজ দেওয়ার লোভ দেখায় দালালেরা। চরম অভাবের সংসারে পরিবারটি আর না করতে পারেনি। তাঁকে তুলে দেওয়া হয় দালালদের হাতে। কিন্তু তারপরেই অপহরণ করে সোজা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল পতিতালয়ে।

‘আমার তো তখন কিছুই বোঝার বয়স না। তারা আমাকে এক ব্রথেল থেকে আরেক ব্রথেলে বিক্রি করতে থাকে। প্রথমে ফরিদপুর, এরপর ময়মনসিংহ...তারপর ওখান থেকে একদিন পালিয়ে এসে সোজা ঢাকার সদরঘাটে চলে আসি। ভাসমান কাজেই ছিলাম।’ খুব শান্ত কণ্ঠেই অবলীলায় নিজের সংগ্রামের দিনগুলোর সম্পর্কে বলছিলেন রিনা আক্তার। এরপর একসময় সেই পেশা ছেড়ে তিনি পুরোপুরি নিজেকে নিয়োজিত করে তোলেন তাঁদের পুনর্বাসনের কাজে। নানা এনজিওর সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি নিজেই গড়ে তোলেন সংগঠন।

এ শুধু কাঁথা সেলাই নয়, যেন স্বপ্ন বুনন।

একটা সময় আসে করোনা মহামারি। চারদিকে মৃত্যুর ভয়, লকডাউনে চারপাশ স্তব্ধ। সেসময় দেশের ভাসমান যৌনকর্মী নারীদের জীবনে নেমে আসে দুর্ভিক্ষ। খদ্দের নেই, পেটে ভাতও নেই। সমাজ-রাষ্ট্র যখন তাঁদের ভুলে গিয়েছিল, রিনা আক্তার ভোলেননি। নিজের জমানো সম্বল আর চেনাজানা মানুষের সাহায্য নিয়ে প্রতিদিন শত শত অনাহারী যৌনকর্মীর মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন তিনি। ২০২০ সালে বিবিসির বিশ্বের শীর্ষ ১০০ অনুপ্রেরণাদায়ী ও প্রভাবশালী নারীর তালিকায় জায়গা করে নেন রিনা আক্তার।

তবে সেই দিনগুলোতে কাজ করতে গিয়ে তাঁর ভাবনাতেও আসে বড় পরিবর্তন। ত্রাণ দিয়ে সাময়িক সাহায্য নয়, এই নারীদের জীবনকে স্থায়ীভাবে বদলানোর জন্য কিছু একটা করা দরকার। সেই ভাবনা থেকেই ২০২১ সালে চালু হয় সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্র। মাত্র আটজন নারী ও নিজেদের পরিচালনা পর্ষদের ব্যক্তিগত অনুদান দিয়ে শুরু হয় এই উদ্যোগ।

বাংলাদেশে যৌনকর্মীদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম মূলত দুই ধরনের। একদল বাস করেন নির্দিষ্ট পল্লি বা ব্রথেলে, অন্যদল ভাসমান, যাঁরা রাস্তা-পার্কে কাজ করেন। আবার আবাসিক হোটেলকেন্দ্রিকও আছে। গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ও কল্যাণময়ী নারী সংঘের পুনর্বাসন কার্যক্রমগুলো মূলত ‘ফ্লোটিং’ বা ভাসমান যৌনকর্মীদের নিয়েই। কারণ, দালাল বা পাচারকারীদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধরে আনা অল্পবয়সী মেয়েদের বিক্রি করে দেওয়া হয় এই পল্লিগুলোর ‘রানির’ কাছে, ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয় ভুয়া ঋণের বিশাল এক বোঝা।

সেই কাল্পনিক ঋণ শোধ না হওয়া পর্যন্ত বছরের পর বছর তাঁদের বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। আবার যখন ওই কাল্পনিক ঋণের টাকা শোধ হয়ে যায়, তখন হয়তো উপার্জনের একটা সামান্য অংশ মেয়েদের দেওয়া হয়। তবে পল্লির সীমানা পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার কোনো অনুমতি তাঁদের থাকে না।

খুব অল্প বয়সে পাচারের শিকার হয়ে এই পেশায় যুক্ত হওয়ায় তাঁদের অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। এ কারণে বড় ও প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্টস কারখানাগুলোও অনেক সময় তাঁদের কাজে নিতে আগ্রহী হয় না। সেক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষে স্থানীয় ছোট বা মাঝারি কারখানাগুলোতে তাঁদের কাজের ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে প্যান্টের চেইন বা বোতাম লাগানো, জিনস সেলাইয়ের মতো কাজ থাকে।

‘আপনি যদি একজন মেয়েকে ওই ব্রথেল থেকে বের করে স্বাভাবিক জীবনে আনতে চান, তবে আপনাকে রানির কাছ থেকে তাঁকে রীতিমতো কিনে নিতে হবে। ওই জায়গার সিস্টেম বা ইনস্টিটিউশনটা এতটাই শক্তিশালী যে আমাদের মতো সাধারণ সংস্থার পক্ষে সেখানে গিয়ে কাউকে বের করে আনা সম্ভব হয় না,’ বলেন ফাহমি।

একটি সুনির্দিষ্ট বাছাইপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রশিক্ষণের জন্য নারীদের নির্বাচন করে থাকেন রিনা আক্তার নিজেই।

তবে অনেকেরই ধারণা, সুযোগ পেলেই সব যৌনকর্মী ‘স্বাভাবিক জীবনে’ ফিরে আসবেন। কথাটি পুরোপুরি অসত্য নয়। তবে ব্যতিক্রমও আছে। ফাহমি জানান, এখন পর্যন্ত তাঁদের ২৭১ জন গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী স্থায়ীভাবে তাদের আগের পেশা ছেড়েছেন। বাকি প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী পুরোনো জগতে ফিরে গেছেন, তবে অনেকে সেখান থেকে উত্তোরণের চেষ্টাও করছেন।

গিভ বাংলাদেশের এই তরুণ সংগঠক বলেন, ‘একজন নারী যখন অল্প বয়সে এই পেশায় আসেন, তখন তাঁর মাসে ২০ হাজার থেকে ৩৫-৪০ হাজার টাকা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় থাকে। কিন্তু এনজিও থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্থানীয় কোনো গার্মেন্টসে চাকরি পেলে তাঁদের মাসিক বেতন হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা, বড়জোর ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। মাসের শেষে এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি মেনে নেওয়া অনেক নারীর পক্ষেই সম্ভব হয় না। ফলে অভাব-অনটনের ঝুঁকি থাকায় অনেকেই আবার পুরোনো পেশায় থেকে যান।’

সেলাই প্রশিক্ষণ শেষে সার্টিফিকেট বিতরণ

খুব অল্প বয়সে পাচারের শিকার হয়ে এই পেশায় যুক্ত হওয়ায় তাঁদের অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। এ কারণে বড় ও প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্টস কারখানাগুলোও অনেক সময় তাঁদের কাজে নিতে আগ্রহী হয় না। সেক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষে স্থানীয় ছোট বা মাঝারি কারখানাগুলোতে তাঁদের কাজের ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে প্যান্টের চেইন বা বোতাম লাগানো, জিনস সেলাইয়ের মতো কাজ থাকে। এর বাইরে অনেকেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। কেউ কেউ আবার এনজিওর ফ্রন্টলাইন কর্মী হিসেবেও যুক্ত হয়েছেন।

বর্তমানে তাঁদের একেকটি ব্যাচে ২২ জন করে ভাসমান যৌনকর্মী প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। আর তাঁদের মধ্যে ১২ জনের আর্থিক ব্যয়ভার বহন করছে ‘‘খানুম’স’’ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে ‘পুষ্পা’ নামের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি সংগঠন। আর বাকি ১০ জনের দায়িত্ব নিয়েছে আলোকানন্দ ফাউন্ডেশন।

গিভ বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত পোর্টফোলিও ম্যানেজার ফাল্গুনী আহমেদ জানান, সেলাই প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ‘বাঘ-বিধবা’ নামে তাঁদের আরেকটি প্রজেক্ট রয়েছে। সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো বিধবাদের নিয়ে কাজ করে থাকেন তাঁরা। এককালীন কিছু টাকা বা ত্রাণ দিয়ে দায় না সেরে, তাঁকে একটি দোকান করে দেওয়া, সেলাই মেশিন বা বিক্রির জন্য কাপড় কিনে দেওয়ার মতো কাজগুলো করা হয়। পুনর্বাসনের এই একই ‘দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই’ মডেলটি তাঁরা ভাসমান যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করছেন।

শুধু মুগদাই নয়, সদরঘাট থেকে শুরু করে হোটেলপাড়ার যেসব মেয়ে এখন উচ্ছেদ বা পুলিশি রেইডের কারণে ভাসমান অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন, ভবিষ্যতে তাঁদের কাছেও পৌঁছানোর পরিকল্পনা আছে রিনা আক্তার, গিভ বাংলাদেশের মতো উদ্যমী সংগঠন, একঝাঁক তরুণ এবং বহু শুভানুধ্যায়ীর।

এ ছাড়া এই প্রজেক্টের আওতায় বিশেষ ‘মেডিক্যাল ক্যাম্প’-এর আয়োজন করা হয়। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অজ্ঞতা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য অস্বাস্থ্যকর পিল বা ইনজেকশন ব্যবহারের কারণে তাঁদের শরীরে বাসা বাঁধে নানা জটিল রোগ। এদিকে ভাসমান যৌনকর্মী হওয়ার কারণে তাঁদের এইচআইভি সংক্রমণের তীব্র ঝুঁকি থাকে। শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী সংগঠন থেকেই তাঁদের বিনা মূল্যে ওষুধ কিনে দেওয়া হয়। প্রত্যেকের এইচআইভি স্ক্রিনিং করানো হয়। অধিকাংশেরই রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। দু-একজনের পজিটিভ ধরা পড়েছে, তাঁদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, নারীদের সারভাইক্যাল ক্যানসার ও স্তন ক্যানসারের মতো মারাত্মক ব্যাধিগুলো শনাক্ত করতে প্রশিক্ষণার্থীদের মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্ক্রিনিং করানো হচ্ছে।

জীবনের একটা সময় সমাজের সবচেয়ে অন্ধকার গলিতে কাটিয়ে দেওয়ার পর আলোয় ফেরার পথ যে মোটেও মসৃণ নয়, তা ভালো করেই জানেন রিনা আক্তার। এই নারীদের পুনর্বাসনের কাজ করতে গিয়ে পদে পদে বাধা আর বিপত্তির মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। তিনি বলেন, ‘আমি যখন এই মেয়েদের তুলে এনে কাজ শুরু করলাম, তখন এলাকার মানুষ আর স্থানীয় রাজনীতির লোকজনের কাছ থেকে অনেক বাধার মুখে পড়েছি। এমনকি অনেকে বাইরে বলাবলি করত, এটা নাকি আমার নতুন “ব্যবসা”, আমি নাকি এদের দিয়ে ব্যবসা করাচ্ছি, আমি নাকি দালাল!’

এত কিছুর পরেও পিছপা হননি এ কাজের সঙ্গে যুক্ত সংগঠকেরা। সমাজের একদল মানুষ মনে করে, পতিতাবৃত্তি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে দেওয়া উচিত। আবার আরেক দল চায়, এটাকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। কিন্তু বাস্তবতা খুব ভালো করেই চেনেন রিনা আক্তার, তাঁর পৃষ্ঠপোষক ও সহযোগী সংগঠকেরা। রিনা আক্তার জানেন, এই সিস্টেম কখনো পুরোপুরি বন্ধ হবে না। কেউ প্রেমের ফাঁদে পড়ে, কেউ পাচারের শিকার হয়ে, আবার কেউ পেটের দায়ে এই অন্ধকার জগতে আসতেই থাকবে। সে কারণে তিনি এ কাজটা করে যেতে চান। এখন তো মেয়েরা বাইরের ছোটখাটো কারখানায় কাজ করছে। কিন্তু তাঁর ভবিষ্যৎ ইচ্ছা, একদিন নিজেদের একটা বড় ফ্যাক্টরি হবে।

শুধু মুগদাই নয়, সদরঘাট থেকে শুরু করে হোটেলপাড়ার যেসব মেয়ে এখন উচ্ছেদ বা পুলিশি রেইডের কারণে ভাসমান অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন, ভবিষ্যতে তাঁদের কাছেও পৌঁছানোর পরিকল্পনা আছে রিনা আক্তার, গিভ বাংলাদেশের মতো উদ্যমী সংগঠন, একঝাঁক তরুণ এবং বহু শুভানুধ্যায়ীর।

প্রান্তিক এই মায়েদের সন্তানদের নিয়েও কাজ করছে গিভ বাংলাদেশ। সামাজিক কুসংস্কারের মুখে তাদের জীবন যেন অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির সম্মুখীন না হয়, তাই পুনর্বাসনের ব্যবস্থাস্বরূপ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘আস্থা শেল্টার হোম’।

এর মধ্য দিয়েই তৈরি হয়—সামাজিক বঞ্চনার চক্র ভেঙে ভাসমান যৌনকর্মী নারী ও তাঁদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ, আত্মনির্ভর, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের পথ। আমরা জানি সেই পথ বড়ই বন্ধুর। তবু এগিয়ে যেতে হবে, এটিই যেন প্রতিটি ক্ষণ উচ্চারিত হলো মুগদার অন্ধকার গলিঘরের প্রতিটি নারী ও শিশুর চোখেমুখে। অন্ধকার পেরিয়ে আলোর ঠিকানায় যাত্রা আজ তাঁদের।

  • আয়েশা হুমায়রা ওয়ারেসা প্রথম আলোর সংবাদকর্মী

Read full story at source