যুদ্ধ যেভাবে ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের কোণঠাসা করেছে
· Prothom Alo

ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানজুড়ে বিভিন্ন নিশানায় হামলা চালায়। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং অন্যান্য ইরানি নেতা নিহত হন।
এর মাধ্যমে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের একটি লক্ষ্য পূরণ হয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানে যৌথ হামলা চালানো। তবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে ওয়াশিংটন এখন এমন এক অবস্থায় পড়েছে, যেখান থেকে নিজেদের কোনোভাবেই বের হতে পারছে না।
Visit rouesnews.click for more information.
যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত যুদ্ধের লক্ষ্যগুলোও অর্জিত হয়নি বলেই মনে করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে দাবি করেছিলেন যে ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতা ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সেই দাবি এখন মিথ্যা বলে মনে হচ্ছে।
নেতানিয়াহু হয়তো আশা করেছিলেন, তেহরানে সরকারের পতন তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার একটি বড় হাতিয়ার হবে।
অন্যদিকে ছয় মাসের যুদ্ধের প্রভাব ইরানের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে তেমন কোনো কাজেই আসেনি। আর এই অর্থনীতিই এখন ইরান সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র
২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে জো বাইডেনের সরকারের প্রতি ট্রাম্পের মূল সমালোচনা ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কেবল জ্বালানি তেলের দামই ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য ইরানের সঙ্গে খুব শিগগিরই চুক্তি হতে যাচ্ছে বলে ট্রাম্প বারবার ফাঁকা বুলি আওড়াচ্ছেন। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির যে বেহাল দশা, তা কাটাতে এই দাবিগুলো তেমন কোনো কাজেই আসছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৬ আগস্ট, ২০২৬অনেকগুলো জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন রেকর্ড পরিমাণ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তাঁর দেশীয় কর্মকাণ্ডের ব্যর্থতার পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতিরও সমানে কড়া সমালোচনা হচ্ছে।
মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিষয়ের অধ্যাপক শিবলী তেলহামি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে বেড়ে যাওয়া আর্থিক ব্যয় এখন অনেকের কাছেই প্রধান একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’
ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার রূপরেখা জানাতে ওয়াশিংটনে মার্কিন অর্থ বিভাগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। ২৪ আগস্ট, ২০২৬ট্রাম্পের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদন। সেখানে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর প্ররোচণায় তিনি ইরানের বিরুদ্ধে এই অজনপ্রিয় যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক বাজার গবেষণা ও জনমত জরিপ সংস্থা ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, প্রতি তিনজনে একজনেরও কম আমেরিকান এই যুদ্ধকে সমর্থন করেন।
তেলহামি বলেন, ‘ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি শুরুতে তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যেও এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ইসরায়েলই জোর করে যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের কাছে ইসরায়েল ইস্যুটির গুরুত্ব এখন অনেক বেড়ে গেছে। কারণ, এটি এখন আর শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়, বরং মানুষের পকেটে টান পড়া এবং মূল মূল্যবোধের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে যায় এমন একটি চুক্তিতে রাজি হতে ইরান সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। এই লক্ষ্যে গত সপ্তাহে তিনি তেহরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন, যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে মিত্র বাহিনীর এক ব্যাপক লড়াইয়ের সঙ্গে মিল রেখে এ নাম রাখা হয়েছে)।
ইরানের বন্দর আব্বাস সৈকতের কাছে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলরত নৌযান। ২৮ আগস্ট, ২০২৬তবে, ইরানের অর্থনীতির ওপর যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব এবং তাদের সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও, তেহরানের সরকার এখনো টিকে আছে। আমেরিকান লেখক ও কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার এমনটাই বলছেন।
মিলার আল–জাজিরাকে বলেন, ‘উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনো ওই দেশে রয়ে গেছে এবং তারা চাইলে এটি আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। ইরান তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যার ফলে তারা হরমুজ প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।’
মিলার আরও বলেন, ‘একইভাবে, হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো তাদের সহযোগী শক্তিগুলো অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেলেও, তারা এখনো টিকে আছে এবং তাদের সক্ষমতা বজায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যে ধরনের গণরোষ বা অভ্যন্তরীণ বিভাজন আশা করেছিল, তেমন কিছুই ঘটেনি। ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতার দিক থেকে বিচার করলে, এটি তেহরানের জন্য একটি বিশাল সাফল্য।’
ইরানে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর এই সামরিক অভিযানের ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
মিলার বলেন, ‘ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্রশাসন সম্ভবত আর কখনো এ ধরনের সামরিক অভিযানের কথা ভাববে না।’
ইসরায়েল
লন্ডনের কিংস কলেজের সিনিয়র টিচিং ফেলো এবং ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যান বলেন, গাজা ও লেবাননের পর এখন ইরানেও নেতানিয়াহুকে ব্যর্থ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেক ইসরায়েলিই নেতানিয়াহুর ইরান যুদ্ধকে একটি মারাত্মক নিরাপত্তাজনিত ভুল বলে মনে করছে।
ব্রেগম্যান বলেন, ‘নেতানিয়াহু জনমত জরিপে পিছিয়ে পড়ছেন এবং এর যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরি থেকে আটকানোর দিকে নজর না দিয়ে, তিনি তেহরানের সরকার পতনের দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন এবং ট্রাম্পকেও তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে রাজি করিয়েছিলেন। এর সবই ব্যর্থ হয়েছে এবং ইরান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বোমা তৈরির অনেক বেশি কাছাকাছি চলে এসেছে।’
গত জুনে ইসরায়েলের অংশগ্রহণ ছাড়াই ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার মার্কিন সিদ্ধান্তটি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করার একাধিক সুযোগ এনে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তির পর জেরুজালেমে সংবাদ সম্মেলন করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ১৫ জুন, ২০২৬ইসরায়েল সরকারের সাবেক উপদেষ্টা দানিয়েল লেভি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমার মনে হয় নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন যে, এটি নির্বাচনে একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দেবে।’
লেভি বলেন, ‘যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়নি। তাই এটি তাঁকে নির্বাচনের জন্য কাঙ্ক্ষিত সুবিধা এনে দিতে পারেনি। উল্টো, এটি সেইসব কাজের তালিকায় যুক্ত হয়েছে যেখানে তিনি বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও কাজের কাজ কিছুই করতে পারেননি। অথচ এই যুদ্ধকে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কিছু একটা আশা করা হয়েছিল।’
ইসরায়েলিদের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, ইরান এখনো ইসরায়েলের জন্য একটি প্রধান হুমকি। আর এই যুদ্ধ সেই হুমকি বিন্দুমাত্রও কমাতে পারেনি।
লেভি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় নেতানিয়াহু অর্থনৈতিক “ডি-ডে”র পক্ষে রয়েছেন। এ কারণে এমনটা ভাবছেন না যে, এর ফলে চূড়ান্ত কোনো ফল আসবে বা ইরান আলোচনায় নতিস্বীকার করবে; বরং তিনি আশা করছেন, এতে ট্রাম্পের হতাশা আরও বাড়বে এবং যুদ্ধ নতুন করে তীব্র করার বিষয়টি আলোচনায় আসবে। আর এবার বিষয়টি অন্যরকম হবে।’
ইরান
ইরানে সরকার টিকে থাকলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ দেশটির অর্থনীতিতে বেশ প্রভাব ফেলছে বলে মনে হচ্ছে।
খোদ ইরানের নিজস্ব হিসাব মতেই, গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই যুদ্ধের কারণে তাদের অর্থনীতিতে ১৪৫ বিলিয়ন (১৪ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারেরও বেশি ক্ষতি হয়েছে। আর গত মাসেই বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছুঁয়েছে ৬৬ শতাংশে। শুধু মার্কিন অবরোধের কারণেই দেশটির প্রতিদিন গড়ে ৪৩৫ মিলিয়ন (৪৩ কোটি ৫০ লাখ) ডলার ক্ষতি হতে পারে। তবে এতসব বাধা সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি এখনো বেশ ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দেখাচ্ছে।
ইরান বিষয়ক লেখক ও শিক্ষাবিদ শারভিন মালেকজাদেহ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমি ভেঙে পড়া অর্থনীতি এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাবকে ছোট করে দেখতে চাই না। তবে আমার ধারণা, এই কষ্টগুলো এখনো সামলে নেওয়ার পর্যায়ে আছে।’
শারভিন আরও বলেন, ইরানের পুরো রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো ‘পুরো বিশ্বের সামনে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও সম্মান টিকিয়ে রাখার চিরন্তন সংগ্রাম’। আর এই মানসিকতাই তাদের যেকোনো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামলে নিতে সাহায্য করছে।
তবে অর্থনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে ইরান সরকারের ভেতরে এখনো মতবিরোধ রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভবিষ্যতে আলোচনার বিষয়ে কট্টরপন্থী ও মধ্যপন্থীদের মধ্যকার দ্বন্দ্বও এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
যুদ্ধের কারণে দেশের ভেতরের রাজনীতিতে যত বড় চ্যালেঞ্জই তৈরি হোক না কেন, যুদ্ধে জড়ানো কোনো পক্ষই এখন হার মানতে রাজি নয়।
ইরানের বন্দর আব্বাসের একটি স্থানীয় বাজারে দোকানে প্রদর্শিত হচ্ছে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি। ২৫ আগস্ট, ২০২৬ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে এই সংঘাত এখন আর কেবল প্রতিরোধ অটুট রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে অল্প সময়ে চূড়ান্ত বিজয় আনতে ট্রাম্পের ব্যর্থতা এবং এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খেসারত—এসবের প্রভাব আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের ফলাফলের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইসরায়েলের কাছে ইরান এখনো তাদের অস্তিত্বের জন্য ঠিক ততটাই গভীর হুমকি বলে মনে হচ্ছে, যতটা এটি গত ২৭ ফেব্রুয়ারিতেও (যুদ্ধ শুরুর আগের দিন) ছিল।