কিটসের শরতের সঙ্গে বাংলার শরতের দেখা
· Prothom Alo

শরৎ এলেই বাংলার আকাশের দিকে তাকাতে ইচ্ছা করে। বর্ষার এত দিনের মেঘ, বৃষ্টি আর বিষণ্নতার পর আকাশ যেন হঠাৎ তার মুখখানি মেলে ধরে। নীল আকাশের গায়ে ভেসে থাকে সাদা মেঘ। মাঠের ধারে কাশফুল ফোটে। ভোরের ঘাসে শিউলি ঝরে থাকে। বাতাসেও আসে বদলের আভাস।
বাংলার শরৎকে তাই শুধু ক্যালেন্ডারের একটি ঋতু বলে মনে হয় না; শরৎ আমাদের স্মৃতিরও একটি ঋতু। শৈশবের সকাল, নদীর ধারে কাশবন, শিউলির ঘ্রাণ, পূজার আগমনী—কত কিছু এসে জড়িয়ে আছে এই ঋতুর সঙ্গে। শরৎ যেন প্রকৃতির হাতে লেখা এক চিঠি, যা পড়তে গেলে চোখের পাশাপাশি মনও খুলে দিতে হয়।
Visit casino-promo.biz for more information.
কিন্তু পৃথিবীর অন্য প্রান্তে শরৎ কেমন? ইংল্যান্ডের কবি জন কিটসের শরতের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে অন্য এক পৃথিবী। সেখানে বাংলার মতো কাশফুল নেই, বর্ষার পর ধুয়ে যাওয়া নীল আকাশও নেই। আছে কুয়াশা, পাকা ফল, শস্য, মধু, ফসল কাটা মাঠ, বিকেলের আলো এবং ধীরে ধীরে শীতের দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রকৃতি।
অথচ এ দুই শরতের মধ্যে কোথায় যেন গভীর একটি মিল আছে। দুটিই পূর্ণতার ঋতু। দুটিই পরিবর্তনের ঋতু। আর দুটিই খুব মৃদুভাবে মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য চিরদিন একই রকম থাকে না।
এ জায়গাতেই এসে জন কিটসের শরতের সঙ্গে বাংলার শরতের দেখা হয়ে যায়।
যে কবি শরৎকে দেখেছিলেন সব ইন্দ্রিয় দিয়ে
জন কিটসের জীবন ছিল খুব ছোট। ১৭৯৫ সালের ৩১ অক্টোবর লন্ডনে জন্ম তাঁর। মাত্র ২৫ বছর বয়সে ১৮২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রোমে তাঁর মৃত্যু। এত অল্প জীবনে তিনি ইংরেজি রোমান্টিক কবিতার অন্যতম স্মরণীয় কবি হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতার সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৪, কিন্তু ‘ওড টু আ নাইটিঙ্গেল’, ‘ওড অন আ গ্রেশিয়ান আর্ন’, ‘ওড অন মেলানকলি’, ‘দ্য ইভ অব সেন্ট অ্যাগনেস’ ও ‘টু অটাম’-এর মতো কবিতা তাঁকে ইংরেজি সাহিত্যে স্থায়ী করে দিয়েছে।
কিটসের কবিতার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি প্রকৃতিকে শুধু চোখে দেখেন না; প্রকৃতির ঘ্রাণ, স্বাদ, শব্দ, স্পর্শ—সবকিছু যেন তাঁর কবিতায় এসে জড়ো হয়। ফুল শুধু ফুল নয়, তার গন্ধ আছে; ফল শুধু ফল নয়, তার রস আছে; পাখি শুধু পাখি নয়, তার গান আছে।
‘টু অটাম’ এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার এক অসাধারণ পূর্ণতা দেখা যায়। ১৮১৯ সালের সেপ্টেম্বর। কিটস তখন উইনচেস্টারে। ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি গ্রামের দিকে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। দুই দিন পর বন্ধু জন হ্যামিলটন রেনল্ডসকে লেখা চিঠিতে তিনি শরতের আবহাওয়ার সৌন্দর্যের কথা লিখেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন, আগের দিনের হাঁটার অভিজ্ঞতা থেকেই ‘টু অটাম’ কবিতাটি রচনা করেছিলেন।
কবিতাটি মাত্র তিনটি স্তবকে। কিন্তু তিনটি স্তবকের ভেতর দিয়ে কিটস যেন শরতের একটি সম্পূর্ণ জীবনচক্র এঁকে দিয়েছেন।
প্রকৃতিতে পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এসেছে শরৎকিটসের শরৎ-ফলভারে নত পৃথিবী
‘টু অটাম’-এর প্রথম পঙ্ক্তিই বিখ্যাত—‘সিজন অব মিস্টস অ্যান্ড মেলো ফ্রুটফুলনেস’ কুয়াশা আর পরিপক্ব ফলপ্রাচুর্যের ঋতু।
বাংলার শরৎকে আমরা প্রথমে আকাশ দিয়ে চিনতে চাই। কিটস তাঁর শরৎকে চিনিয়েছেন ফল দিয়ে। গাছের আপেল পেকে উঠছে। লতাগুল্ম ফলের ভারে নুয়ে পড়ছে। বাদামের খোলস ভরে উঠছে। মৌমাছির চাক মধুতে পূর্ণ। সূর্যের সঙ্গে শরতের যেন গোপন বন্ধুত্ব। দুটিতে মিলে পৃথিবীকে ফলপ্রাচুর্যে ভরিয়ে তুলছে।
কিটস এখানে শরৎকে নিছক গ্রীষ্মের পরের ঋতু হিসেবে দেখছেন না। শরৎ তাঁর কাছে পরিপক্বতার মুহূর্ত।
বাংলার শরতের সঙ্গে এখানেই প্রথম দেখা হয়ে যায় তাঁর শরতের। আমাদের শরৎ গ্রীষ্ম ও বর্ষার পরে প্রকৃতির এক পরিণত, নির্মল রূপ নিয়ে আসে। তবে আমাদের চোখ আটকে থাকে নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুল আর শিউলিতে; কিটসের চোখ যায় ফলের ভেতর, শস্যের ভেতর, মধুর ভেতর। অর্থাৎ দৃশ্য আলাদা হলেও অনুভবের জায়গাটি খুব দূরের নয়। শরৎ যখন একজন মানুষ
দ্বিতীয় স্তবকে কিটসের শরৎ আরও আশ্চর্য হয়ে ওঠে। এবার শরৎ আর দূরের কোনো ঋতু নয়; যেন একজন মানুষ।
কখনো তাকে দেখা যায় শস্যাগারের মেঝেতে বসে থাকতে। কখনো অর্ধেক কাটা জমির পাশে ঘুমিয়ে পড়েছে। কখনো শস্য ঝাড়ার বাতাসে তার চুল উড়ছে। কখনো সে কাস্তের পাশে দাঁড়িয়ে।
প্রথম স্তবকে ছিল ফলপ্রাচুর্য। দ্বিতীয় স্তবকে এসেছে ফসল ঘরে তোলার সময়। অর্থাৎ শরৎ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়; মানুষের শ্রমেরও ঋতু। মাটি সারা বছর যা তৈরি করেছে, মানুষ এবার তা ঘরে তুলছে।
এ জায়গাই ‘টু অটাম’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সৌন্দর্য। কিটস প্রকৃতি ও মানুষকে আলাদা করেননি। ফলের পাকা ভাব, শস্যের পরিণতি, কৃষকের শ্রম, শরতের ক্লান্তি সব এক হয়ে গেছে।
তাই কিটসের শরৎ কেবল সুন্দর নয়; সে কর্মঠও। আবার কাজের শেষে তার মধ্যে আছে একধরনের অলস প্রশান্তি।
যেন পৃথিবী বলছে এবার একটু থামা যাক।
বসন্তের গান কোথায়?
কবিতার তৃতীয় স্তবকে এসে কিটস হঠাৎ প্রশ্ন করেন, ‘হয়ার আর দ্য সংস অব স্প্রিং? আই, ওয়্যার আর দে?’
বসন্তের গান কোথায়? এটি শুনলে মনে হতে পারে, কবি বুঝি শরতের জন্য বিষণ্ন। বসন্ত নেই, গ্রীষ্মও শেষ। সামনে শীত।
কিন্তু কিটস সঙ্গে সঙ্গেই সেই বিষণ্নতার পথ বদলে দেন, ‘থিংক নট অব দেম, দাউ হ্যাস্ট থাই মিউজিক টু।’ বসন্তের কথা ভেবো না। তোমারও তো নিজের সংগীত আছে।
এ জায়গাই কবিতার প্রাণ।
কিটস শরৎকে বসন্তের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামাননি। তিনি বলেননি, বসন্তের মতো শরৎও সুন্দর। বরং তাঁর বক্তব্য আরও গভীর—শরৎকে বসন্তের মাপকাঠিতে বিচার করার প্রয়োজন নেই। শরতের নিজের সৌন্দর্য আছে, নিজের সংগীত আছে।
তারপর সেই সংগীত শোনা যায়। সন্ধ্যা নামছে। দিনের আলো ম্লান হচ্ছে। ঝিঁঝি পোকার ডাক, মেষশাবকের ডাক, রবিনের গান, আকাশে জড়ো হওয়া আবাবিল—সব মিলিয়ে শরৎ নিজের একটি সন্ধ্যাগান তৈরি করছে।
এখানে কিটস শুধু শরৎকে দেখছেন না; শুনছেন। এ কারণেই ‘টু অটাম’ শুধু শরতের দৃশ্যপট নয়; এটি শরতের শ্রুতিময় প্রতিকৃতিও।
বর্ষার আকাশে শরৎ মেঘের আগমনপশ্চিমের শরৎ কি সত্যিই বিষণ্ন
এখানে এসে একটি প্রচলিত ধারণা নিয়ে একটু থামা দরকার। আমরা প্রায়ই বলি, পশ্চিমের সাহিত্যে শরৎ মানেই বিষণ্নতা, ঝরা পাতা, মৃত্যু ও বিদায়; আর ভারতবর্ষে শরৎ মানেই আনন্দ, উৎসব ও নির্মল আকাশ। কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়।
কিটসের ‘টু অটাম’ই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ১৮১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর লেখা এ কবিতায় শরৎ মূলত পূর্ণতা, ফসল, পরিপক্বতা ও সৌন্দর্যের ঋতু। এমনকি রেনল্ডসকে লেখা চিঠিতে কিটস বসন্তের ‘চিলি গ্রিন’-এর চেয়ে সদ্য কাটা খড়ের মাঠকে বেশি উষ্ণ ও সুন্দর বলে অনুভব করেছিলেন।
তাহলে পশ্চিমা কল্পনায় শরতের বিষণ্নতা এল কোথা থেকে?
এর পেছনে প্রকৃতির একটি বাস্তব কারণ আছে। ইংল্যান্ডের মতো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে শরৎ মানে দিনের আলো ক্রমে কমে আসা, তাপমাত্রা নেমে যাওয়া, পাতা ঝরা এবং শীতের আগমন। কৃষিভিত্তিক সমাজে এটি একই সঙ্গে ফসল ঘরে তোলার সময় এবং প্রকৃতির ক্রমে নিস্তব্ধ হয়ে আসার সময়। ফলে শরতের মধ্যে আনন্দ ও ক্ষয়—দুটি অনুভূতিই পাশাপাশি থাকে। কিটস এ দুই অনুভূতিকে একসঙ্গে ধারণ করেছেন।
টি এস এলিয়টের কবিতায়ও ঋতু নিয়ে এই দ্বৈততা আছে, যদিও তাঁকে শরতের বিষণ্নতার উদাহরণ হিসেবে সরাসরি ব্যবহার করা ঠিক হবে না। ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর শুরুতেই তিনি বরং বসন্তকে অস্বাভাবিকভাবে নির্মম করে তুলেছেন, ‘এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ’, কারণ মৃত, অবসন্ন পৃথিবীতে বসন্ত নতুন জীবন, স্মৃতি ও আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে; আর সেই জেগে ওঠাই যন্ত্রণাদায়ক।
অর্থাৎ এলিয়টের কাছে ঋতু নিজে সুখী বা বিষণ্ন নয়; মানুষের ভেতরের অবস্থা ঋতুর অর্থ বদলে দেয়। কিটস ক্ষয়ের মধ্যেও সৌন্দর্যের পূর্ণতা দেখেন; এলিয়ট ক্ষয়ের মধ্যে দেখতে পান আধুনিক মানুষের আধ্যাত্মিক সংকট। একই পশ্চিমা ঋতু, অথচ দুই কবির চোখে দুই পৃথিবী।
বাংলায় শরৎ এত আনন্দের কেন
বাংলার শরতের সঙ্গে ভূগোলের সম্পর্কটি খুব গভীর। দীর্ঘ বর্ষার পরে আকাশ পরিষ্কার হয়, বাতাসে আর্দ্রতা কমে আসে, মাঠঘাটে জমে থাকা পানি সরে যেতে শুরু করে। প্রকৃতি যেন হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুল, শিউলি—সব মিলিয়ে শরৎ বাংলায় একধরনের স্বস্তির অনুভূতি তৈরি করে।
কিন্তু শুধু প্রকৃতি দিয়ে বাংলার শরতের আনন্দকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাঙালির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতি।
সবচেয়ে বড় করে এসেছে দুর্গাপূজা। শরৎকালীন দুর্গাপূজা বর্তমানে বাঙালি হিন্দুসমাজের সবচেয়ে বড় উৎসবগুলোর একটি। বাংলা পঞ্জিকার আশ্বিন বা কখনো কার্তিকের শুক্লপক্ষে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ কারণেই এর নাম ‘শারদীয় দুর্গাপূজা’। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, কৃত্তিবাসী রামায়ণের কাহিনিতে রাবণবধের আগে শরৎকালে রামের দেবী দুর্গার পূজার প্রসঙ্গ রয়েছে; সে কারণেই এটি ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত হয়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূক্ষ্মতা আছে। দুর্গাপূজা আদিতে শুধু শরতের পূজা ছিল না; বসন্তকালেও দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল, যা ‘বাসন্তী পূজা’ নামে পরিচিত। অর্থাৎ শরৎ ও দুর্গাপূজার সম্পর্কটি চিরকালীন বা একমাত্রিক নয়; বরং বাংলায় শরৎকালীন পূজা ক্রমে এত বেশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব পেয়েছে যে শরৎ ও দুর্গাপূজা একে অপরের সমার্থক হয়ে উঠেছে।
শরতের পরিষ্কার আকাশের নিচে দেবীর আগমন, কাশফুলের সাদা ঢেউ, ঢাকের শব্দ, নতুন পোশাক, ছুটি, বাড়ি ফেরা, আত্মীয়স্বজনের মিলন—সব মিলিয়ে ঋতুটি বাঙালির সামাজিক স্মৃতিতে উৎসবের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে গেছে। তাই একজন বাঙালির কাছে শরৎ শুধু প্রকৃতির পরিবর্তন নয়; এটি সামাজিক জীবনেরও এক নবায়ন।
জীবনানন্দের বাংলায় শরৎ এই জায়গায় জীবনানন্দ দাশকে আনা জরুরি। কারণ, রবীন্দ্রনাথের বাংলায় শরৎ যেখানে অনেক সময় উজ্জ্বল, স্নিগ্ধ ও উৎসবমুখর, জীবনানন্দের বাংলায় সেই শরৎ আরও গভীর, কখনো নিঃসঙ্গ, কখনো স্মৃতিময়।
‘রূপসী বাংলা’র ‘এখানে আকাশ নীল’ কবিতায় জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন—
‘এখানে আকাশ নীল-নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল
ফুটে থাকে হিম শাদা-রং তার আশ্বিনের আলোর মতন;’
জীবনানন্দের শরতের সৌন্দর্য এখানে কেবল নীল আকাশের নয়; ‘আশ্বিনের আলো’র সঙ্গে মিশে আছে একধরনের নীরবতা।
জীবনানন্দকে তাই শুধু ‘আনন্দের শরৎ’-এর কবি বলা যাবে না; তাঁর প্রকৃতিতে সৌন্দর্যের পাশাপাশি অনিবার্যভাবে থাকে ক্ষয়, স্মৃতি, একাকিত্ব ও মৃত্যুচেতনা। ‘বনলতা সেন’-এও দিনের শেষে সন্ধ্যা নামে ‘শিশিরের শব্দের মতন’; পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে মানুষ মুখোমুখি হয় অন্ধকারের। এই অন্ধকার অবশ্য শরৎ–নির্দিষ্ট নয়; কিন্তু ঋতু ও দিনের অবসানকে তিনি প্রায়ই জীবনের অবসানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন।
এখানেই জীবনানন্দের সঙ্গে কিটসের এক অদ্ভুত আত্মীয়তা তৈরি হয়। কিটসের শরতে যেমন সৌন্দর্যের মধ্যেই ক্ষয়ের উপস্থিতি, জীবনানন্দের বাংলাতেও তেমনি রূপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে বিদায়ের আভাস।
তবে পার্থক্যও আছে। কিটসের শরৎ যেন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার পর শান্তভাবে বিদায়ের দিকে যায়। জীবনানন্দের শরৎ অনেক সময় সেই বিদায়কে আরও ব্যক্তিগত করে তোলে। প্রকৃতি সেখানে শুধু প্রকৃতি নয়; মানুষের স্মৃতি ও মৃত্যুচেতনার আয়না।
সৌন্দর্যের ভেতরে বিদায়ের সুর
কিটসের শরতের সবচেয়ে গভীর দিকটি সম্ভবত এখানেই। দিন শেষ হচ্ছে। ঋতুও তার শেষের দিকে। সামনে শীত।
কবিতার শেষ দিকে আসে ‘সফট-ডাইং ডে’—মৃদু মৃত্যুর দিকে যাওয়া দিন। কিন্তু এই মৃত্যু আতঙ্কের নয়। এখানে কোনো চিৎকার নেই। আছে ধীর অবসান।
আলো কমছে, অথচ শব্দ বাড়ছে। দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে, অথচ প্রকৃতি গান থামাচ্ছে না। এই বৈপরীত্যই কবিতাটিকে এত গভীর করে।
‘টু অটাম’কে শুধু মৃত্যুর কবিতা বলা ঠিক হবে না; বরং বলা যায়, কবিতাটি পরিপূর্ণতার সঙ্গে ক্ষয়কে, সৌন্দর্যের সঙ্গে সময়ের অগ্রগতিকে এবং বিদায়ের সঙ্গে গ্রহণকে একসঙ্গে ধারণ করে। কবিতার তিন স্তবকও সেই পথ অনুসরণ করে। ফল ও পরিপক্বতা, ফসল সংগ্রহ, তারপর সন্ধ্যা ও ক্ষয়ের দিকে যাত্রা।
কিটসের নিজের জীবনকে বিবেচনায় নিলে বিষয়টি আরও করুণ হয়ে ওঠে। ১৮১৮ সালে তিনি তাঁর ছোট ভাই টমকে যক্ষ্মায় হারিয়েছিলেন। পরের বছর ‘টু অটাম’ রচনার সময় নিজের শরীরেও যক্ষ্মার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। ১৮২০ সালে তাঁর অসুস্থতা ভয়াবহ আকার নেয়। তাই তাঁর জীবনের প্রেক্ষাপট কবিতাটিকে অন্য এক আবেগ দেয়। কিন্তু কবিতাটিকে সরাসরি নিজের মৃত্যুর পূর্বাভাস হিসেবে পড়লে তার সৌন্দর্যকে ছোট করে দেখা হয়। কারণ, কিটস এখানে মৃত্যুকে ঘোষণা করছেন না; বরং পরিবর্তন ও ক্ষয়ের মধ্যেও বর্তমান মুহূর্তের পূর্ণতাকে গ্রহণ করছেন।
শরতের গান
আমরা শরৎকে অনেক সময় বসন্তের মতো করে দেখতে চাই। চাই তার সৌন্দর্য দীর্ঘ হোক। নীল আকাশ থাকুক, কাশফুল থাকুক, শিউলি ফুটুক—সব যেন থেকে যায়।
কিন্তু ঋতু তো থেমে থাকার জন্য আসে না। শরৎ আসে, তার সৌন্দর্য দেখায়, তারপর চলে যায়। এই চলে যাওয়াটিই হয়তো তার সৌন্দর্যের অংশ।
জন কিটস আমাদের সে কথাই মনে করিয়ে দেন। তাঁর শরৎ বসন্তকে হারাতে চায় না। বসন্তের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও করে না। সে শুধু বলে, আমাকে আমার মতো করে দেখো। আমারও আলো আছে, আমারও গন্ধ আছে, আমারও শব্দ আছে, আমারও গান আছে।
বাংলার শরৎও যেন একই কথা বলে। আমাকে শুধু কাশফুল দিয়ে চিনো না। শুধু নীল আকাশ দিয়ে চিনো না। শুধু শিউলির গন্ধ দিয়েও নয়।
আমার ভেতরে বর্ষার বিদায় আছে। হেমন্তের আগমন আছে। আলোর বদল আছে। বাতাসের বদল আছে। আর আছে চলে যাওয়ার আগে পৃথিবীকে একবার ভালো করে দেখে নেওয়ার অবকাশ।
কিটসের শরৎ আর বাংলার শরৎ তাই শেষ পর্যন্ত পরস্পরের বিপরীত নয়। দুই ভিন্ন ভূগোলের দুই ঋতু, দুই রকম আলো, দুই রকম শব্দ। তবু একই উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়।
ফুল ফোটার যেমন একটি গান আছে, তেমনি ঝরে পড়ারও একটি গান আছে। কিটস সেই গান শুনেছিলেন ইংল্যান্ডের মাঠে। আমরা শুনি বাংলার কাশবনে, শিউলিতলায়, নদীর ধারে, নীল আকাশের নিচে।
শুধু কান পেতে শুনতে হয়। কারণ, বসন্তের গান চলে গেছে বলে মন খারাপ করার কী আছে? শরতেরও তো নিজের গান আছে।