বড় দরপতনে আড়াই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে সূচক
· Prothom Alo

দেশের শেয়ারবাজারে আবারও বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে আজ রোববার লেনদেন হওয়া বেশির ভাগ শেয়ারের দাম কমেছে। তাতে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১০৪ পয়েন্ট বা প্রায় ২ শতাংশ কমে গেছে। তাতে ডিএসইর প্রধান সূচকটি গত প্রায় আড়াই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে।
ঢাকার বাজারের প্রধান সূচকটি আজ দিন শেষে কমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৫৫৮ পয়েন্টে। এটি গত প্রায় আড়াই মাসের মধ্যে ডিএসইএক্স সূচকের সর্বনিম্ন অবস্থান। এর আগে সর্বশেষ গত ২২ জুন ডিএসইএক্স সূচকটি ৫ হাজার ৫৫৪ পয়েন্টের সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল। গত ৪ জুন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠনের পর আজই বাজারে সর্বোচ্চ দরপতন হয়েছে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
বাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে বড় এই দরপতনের পেছনের বেশ কিছু কারণ জানা যায়। তাঁরা বলছেন, এমনিতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটে বিপর্যস্ত অবস্থা শিল্পকারখানাসহ উৎপাদন খাতে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক কোম্পানির ব্যবসা কমে গেছে। তার একটি প্রভাব বাজারে উৎপাদন খাতের কোম্পানির শেয়ারের ওপর পড়েছে। এর সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে একসঙ্গে অনেক কোম্পানির শেয়ার নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ।
—মিনহাজ মান্নান, পরিচালক, ডিএসইবাজার–সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। আশা করছি, এই ধারণা অচিরেই কেটে যাবে।একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত এক মাসে ডিএসইর পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কোম্পানির শেয়ার লেনদেন–সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসেও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় ব্রোকারেজ হাউস ও বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষস্থানীয় নির্বাহী জানান, গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের বিষয়ে ২০টির বেশি চিঠি এসেছে ডিএসইর কাছ থেকে। এসব চিঠিতে শেয়ার লেনদেনসংক্রান্ত নানা তথ্য চাওয়া হয়েছে। যখনই তথ্য চেয়ে চিঠি আসে, তখনই ওই সব শেয়ারের বড় বিনিয়োগকারীরা সেই তথ্য জেনে যান। তখন তাঁরা হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে দেন। যার প্রভাব পড়ে বাজারে। বাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একধরনের ‘নেগেটিভ সেন্টিমেন্ট বা নেতিবাচক ধারণা’ কাজ করছে। এ কারণে অনেকে শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে সাইড লাইনে চলে যাচ্ছেন।
বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিদিনের উত্থান–পতন নিয়ে এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বাজারে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ নেই। বাজার বাজারের নিয়মেই চলবে। দৈনন্দিন হস্তক্ষেপের বদলে বাজারে কোনো ধরনের অনিয়ম বা কারসাজি হচ্ছে কি না, সেটি তদারক করতে সার্ভেইল্যান্সে বেশি মনোযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার। আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করছি।’
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাজারে আজ শেয়ার বিক্রির চাপ সবচেয়ে বেশি ছিল ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। এদিন বাজারে যত শেয়ার বিক্রি হয়েছে, তার প্রায় ৯১ শতাংশই বিক্রি করেছেন ব্যক্তিশ্রেণির সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এসব বিনিয়োগকারী শেয়ার কেনার চেয়ে এদিন বিক্রি করেছেন বেশি। বিক্রির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। আজ ঢাকার বাজারে শেয়ার বিক্রির ৮ শতাংশই ছিল তাঁদের। যদিও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বিক্রির চেয়ে কিনেছেন বেশি।
ব্রোকারেজ হাউস লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজ সূচকের পতনে বড় ভূমিকা রাখে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের দরপতন। যে ১০ কোম্পানির দরপতনে ডিএসইএক্স সূচকটি সবচেয়ে বেশি কমেছে, সেগুলো হলো স্কয়ার ফার্মা, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, বেক্সিমকো ফার্মা, ব্র্যাক ব্যাংক, আল–আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ডমিনেজ স্টিল, বীকন ফার্মা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক বা ইউসিবি, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ ও অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ। উল্লিখিত ১০ কোম্পানির শেয়ারের দরপতনে ডিএসইএক্স সূচকটি কমেছে ২১ পয়েন্টের বেশি। তার বিপরীতে সূচকের উত্থানে আজ যেসব কোম্পানির ভূমিকা ছিল, সেগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনভয় টেক্সটাইলস, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স, এমবি ফার্মাসিউটিক্যালস ও রেকিট বেনকাইজার। এই ১০ কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইএক্স সূচকটি সম্মিলিতভাবে সাড়ে ৫ পয়েন্টের মতো বেড়েছে।
ঢাকার বাজারে রোববার মোট ৩৮৯ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়। এর মধ্যে ৩৪৮টির বা ৮৯ শতাংশেরই দাম কমেছে। দাম বেড়েছে ২০টির আর অপরিবর্তিত ছিল ২১টির দাম। শেয়ারের দাম কমার কারণে লেনদেনেও বড় পতন হয়েছে। আগের দিনের চেয়ে লেনদেন কমেছে ১৭৬ কোটি টাকা বা ২৪ শতাংশ। আজ দিন শেষে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৪৫ কোটি টাকা। এর আগে গত বৃহস্পতিবার লেনদেন হয়েছিল ৭২১ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্যাস–বিদ্যুৎ নিয়ে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গত এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংকট বিনিয়োগকারীরা অনেকটাই মানিয়ে নিয়েছেন। এমন অবস্থায় হঠাৎ বড় ধরনের দরপতনের যৌক্তিক কারণ দেখছি না। তবে বাজার–সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। আশা করছি, এই ধারণা অচিরেই কেটে যাবে। সামনে অনেক কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণা করা হবে। সেসব ঘোষণা সামনে রেখে বাজার আবারও ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছি।’