মদিনাকে কেন ‘তাইয়িবা’ বলা হয়

· Prothom Alo

ইতিহাসে মদিনার একাধিক মহিমান্বিত নাম পাওয়া যায়, যার মধ্যে অন্যতম সুপরিচিত ও প্রিয় নাম হলো ‘তাইয়িবা’। আরবি ভাষায় তাইয়িবা শব্দের অর্থ হলো পরম পবিত্র, কল্যাণময়, নিষ্কলুষ ও সুরভিত।

নবীজির হিজরতের পূর্বে এই নগরীটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি নামে পরিচিত ছিল—তা হলো ‘ইয়াসরিব’। একটি জনপদের প্রাচীন নাম পরিবর্তন করে নবীজি (সা.) একে ‘তাইয়িবা’ বা ‘তাবাহ’ নামে অভিষিক্ত করেন।

Visit palladian.co.za for more information.

৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা থেকে হিজরত করে এই শহরে পদার্পণ করেন তিনি। কোনো স্থান বা ব্যক্তির সুন্দর ও শুভার্থক নাম রাখার ব্যাপারে নবীজি সবসময় বিশেষ যত্নশীল ছিলেন। সেই আলোকেই তিনি প্রাচীন অন্ধকারাচ্ছন্ন নাম মুছে দিয়ে এই পুণ্যভূমির নাম রাখেন ‘তাইয়িবা’।

মদিনা ও তার আশপাশের পাহাড়ি উপত্যকায় (বিশেষ করে ওয়াদি আকিক অঞ্চলে) আবিষ্কৃত অষ্টম শতাব্দীর প্রাচীন পাথুরে শিলালিপিতে এই শহরকে স্পষ্টভাবে ‘তাইয়িবা’ নামের উল্লেখ করা হয়েছে।

‘ইয়াসরিব’ শব্দের নেতিবাচক অর্থ

ইসলামপূর্ব যুগে এই জনপদটিকে ‘ইয়াসরিব’ বলা হতো। ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘ইয়াসরিব’ শব্দটি এসেছে আরবি মূলধাতু ‘সারব’ বা ‘তাসরিব’ থেকে, যার অর্থ হলো ভর্ৎসনা করা, দোষারোপ করা, তিরস্কার করা, কিংবা অনিষ্ট ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।

কোরআনে নবী ইউসুফের মুখে এই ধাতুর ব্যবহার পাওয়া যায়, যেখানে তিনি তাঁর ভাইদের ক্ষমা করে দিয়ে বলেছিলেন, “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো তিরস্কার (অভিযোগ) নেই।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৯২)

হিজরতের পূর্বে ইয়াসরিব ছিল রোগবালাই, বিশেষ করে মারাত্মক জ্বর ও মহামারীর জন্য খ্যাত এবং এখানকার আউস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয় শতবর্ষব্যাপী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিল। যেন অর্থের মতোই নামটি শহরের রুক্ষ ও অস্থির পরিবেশের সঙ্গেই মিলে যেত।

মক্কা-মদিনা কেন মুসলমানদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ

নবীজি (সা.) কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মন্দ অর্থের নাম পছন্দ করতেন না; তাই তিনি শহরকে ‘ইয়াসরিব’ বলে ডাকতে নিরুৎসাহিত করেন এবং নতুন ও কল্যাণময় নাম প্রদান করে বলেন, “যে ব্যক্তি মদিনাকে একবার ইয়াসরিব বলবে, সে যেন আল্লাহর কাছে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করে; কারণ এটি হলো তাইয়িবা, এটি হলো তাইয়িবা।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৮৫৩৭)

‘তাইয়িবা’ ও ‘ত্বাবাহ’

প্রিয় নবী (সা.) যখন এই নগরীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেন, তখন তিনি এর নতুন নাম রাখলেন ‘তাইয়িবা’ ও ‘ত্বাবাহ’। দুটি শব্দই আরবি ‘তিব’ ধাতু থেকে উৎসারিত, যার অর্থ পবিত্রতা, উত্তমতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সুবাস বা সুগন্ধি।

সাহাবি জাবির ইবনে সামুরাহ (রা.) বলেন, “লোকেরা পূর্বে এই শহরকে ‘ইয়াসরিব’ বলে ডাকত, অতঃপর নবীজি এর নাম রাখলেন ‘ত্বাবাহ’।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৮৫)

মদিনাকে তাইয়িবা নামকরণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে নবীজি নিজেই বলেছেন, “নিশ্চয়ই এই নগরী হলো ‘তাইয়িবা’ (পবিত্র ও নিষ্কলুষ); এটি মানুষের যাবতীয় পাপ ও ভেজাল দূর করে দেয়, ঠিক যেমন আগুন রূপার খাঁদ পুড়িয়ে দূর করে দেয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৮৪)

অর্থাৎ যে ভূমি মানুষকে পাপের কলুষতা থেকে মুক্ত করে অন্তরে পবিত্রতা ও খোদাভীতি এনে দেয়, তার উপযুক্ত নামই হলো ‘তাইয়িবা’।

সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৮৪নিশ্চয়ই এই নগরী হলো ‘তাইয়িবা’; এটি মানুষের যাবতীয় পাপ ও ভেজাল দূর করে দেয়, ঠিক যেমন আগুন রূপার খাঁদ পুড়িয়ে দূর করে দেয়।

ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য

মদিনাকে ‘তাইয়িবা’ ডাকার এই নববী ঐতিহ্য যে ইসলামের একেবারে সূচনালগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠিত, তার ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও আধুনিক গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে।

মদিনা ও তার আশপাশের পাহাড়ি উপত্যকায় (বিশেষ করে ওয়াদি আকিক অঞ্চলে) আবিষ্কৃত অষ্টম শতাব্দীর (হিজরি দ্বিতীয় শতক) প্রাচীন পাথুরে শিলালিপিতে এই শহরকে স্পষ্টভাবে ‘তাইয়িবা’ নামের উল্লেখ করা হয়েছে। (ড. সা‘দ বিন আব্দুল আজিজ আর-রাশিদ, কিতাবাত ইসলামিয়্যাহ গায়রু মানশূরাহ মিন রুওয়াতিল মাদিনাহ আল-মুনাওয়ারা , পৃষ্ঠা: ৮৮–৯২, কিং সৌদ ইউনিভার্সিটি প্রেস, রিয়াদ, ১৯৯৪ খ্রি.)

মদিনা মুনাওয়ারার ফজিলত ও আমল

এই শিলালিপিটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, নবীজি (সা.) কর্তৃক প্রদত্ত নামটি শুধু মুখে মুখে নয়, বরং প্রাথমিক ইসলামি যুগের আনুষ্ঠানিক ব্যবহার ও লিখিত ইতিহাসেও সুদৃঢ়ভাবে স্থান পেয়েছিল।

মদিনার অন্যান্য তাৎপর্যপূর্ণ নাম

ইসলামি ঐতিহ্যে কোনো স্থানের নামের বেশি থাকা সেই স্থানের অনন্য মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে। তাইয়িবা ছাড়াও ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে মদিনার বেশ কয়েকটি অনন্য নাম বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেছে:

মদিনার এই পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মসজিদে নববি। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হিজরতের অব্যবহিত পরেই নবীজি ও সাহাবিদের নিজ হাতে নির্মিত এই মসজিদটি ছিল নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের সংসদ, শিক্ষাঙ্গন ও আধ্যাত্মিক চর্চাকেন্দ্র।
  • আল-মদিনা: এর সাধারণ অর্থ ‘সুসংহত নগরী’। নবীজির আগমনের পর এটি একটি অরাজক মরু অঞ্চল থেকে মদিনা সনদভিত্তিক একটি সভ্য ও সুশৃঙ্খল নগররাষ্ট্রে পরিণত হয়।

  • মাদিনাতুন নবী: অর্থাৎ ‘নবীর শহর’। বিশ্বনবীর আশ্রয়স্থল এবং তাঁর স্থায়ী আবাসভূমি হওয়ার কারণে মুসলিমরা পরম শ্রদ্ধায় একে এই নামে স্মরণ করে।

  • আল-মদিনা আল-মুনাওয়ারাহ: অর্থাৎ ‘জ্যোতির্ময় নগরী’। ওহির আলো, নবুয়তের হেদায়েত এবং নবীজির রওজা মোবারকের উপস্থিতির কারণে এই শহর সমগ্র বিশ্বের জন্য হেদায়েতের আলোকবর্তিকা।

  • দারুল হিজরাহ: হিজরতের পুণ্যভূমি। মক্কার নির্যাতিত মুসলমানদের আশ্রয় দিয়ে মদিনার আনসাররা যে অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের নজির গড়েছিলেন, সেই ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে একে এই নামে ডাকা হয়।

মদিনার এই পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মসজিদে নববি। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হিজরতের অব্যবহিত পরেই নবীজি ও সাহাবিদের নিজ হাতে নির্মিত এই মসজিদটি ছিল নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের সংসদ, শিক্ষাঙ্গন ও আধ্যাত্মিক চর্চাকেন্দ্র।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে হজ ও ওমরাহ পালনকারী লাখো বিশ্বাসী মানুষ মদিনায় ছুটে আসেন নবীজির পবিত্র রওজায় সালাম পেশ করতে এবং নবীর মসজিদে সেজদানত হয়ে হৃদয়ের তৃষ্ণা মেটাতে।

মক্কা থেকে মদিনা: কালজয়ী হিজরতের বীরত্বগাথা

Read full story at source