মাছরাঙা যেভাবে পানির নিচে শিকার করে

· Prothom Alo

পুকুরপাড়ে শিকারের আশায় চুপচাপ বসে থাকে মাছরাঙা। ঠিক কীভাবে এরা ১০ ফুট ওপর থেকে পানির নিচে লুকিয়ে থাকা এক আঙুল সমান মাছটাকে খুঁজে বের করে?

Visit extonnews.click for more information.

তুমি হয়তো গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখেছ, খালের ধারে বৈদ্যুতিক তারে বা গাছের ডালে চুপচাপ বসে আছে একটা রঙিন পাখি। নীল-কমলা শরীর, লম্বা ঠোঁট। চোখ দুটো সব সময় নিচের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজছে। এটাই মাছরাঙা। দেখতে যতটা শান্ত মনে হয়, ভেতরে–ভেতরে চলছে ঠিক ততটাই জটিল এক হিসাব-নিকাশ। সেই হিসাব ভুল হলে তার পেটই ভরবে না।

সমস্যাটা শুরু হয় পানির সঙ্গেই। সুইমিং পুলে দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে দেখবে তোমার পায়ের অবস্থান আসলে যেখানে দেখাচ্ছে, ঠিক সেখানে নেই। আলো যখন বাতাস থেকে পানিতে ঢোকে, গতিপথ বেঁকে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে প্রতিসরণ। এই বাঁকা আলোর কারণে পানির নিচের যেকোনো বস্তু আসলে যেখানে আছে তার থেকে একটু সরে থাকা জায়গায় দেখা যায়। মানুষের চোখ এই ফাঁদে বারবার পড়ে; মাছ ধরতে গিয়ে অনেকেই হাত ভুল জায়গায় ঢুকিয়ে ফেলে। মাছরাঙার জন্য অবশ্য এই ভুলের কোনো সুযোগ নেই। একবার আন্দাজ ভুল হলেই সারা দিনের খাবার হাতছাড়া।

তাহলে সে এই আলোর ফাঁদ পার হয় কীভাবে? উত্তরটা লুকিয়ে আছে এর চোখের গড়নে। মাছরাঙার রেটিনায় দুই ধরনের কোষ কাজ করে পাশাপাশি, একটা বাতাসে দেখার জন্য, আরেকটা পানির নিচের দৃশ্যের জন্য। মস্তিষ্ক দুই ধরনের তথ্য মিলিয়ে নিয়ে আলোর বাঁকা পথের হিসাব কষে ফেলে নিমেষে। প্রতিটি মাছরাঙার মাথার ভেতর যেন বসানো আছে ছোট্ট একটা ক্যালকুলেটর, যেটা সেকেন্ডের কম সময়ে জ্যামিতির অঙ্ক শেষ করে ফেলে।

বউ কথা কও: একটি পাখি, তিনটি দেশ, তিনটি গল্পজলাশয়ের ধারে জোড়া মাছরাঙা। বানিয়াখালী, ডুমুরিয়া, খুলনা, ২৭ নভেম্বর। ছবি: সাদ্দাম হোসেন

চোখের কাজ শেষ হলে শুরু হয় শরীরের কাজ। শিকার দেখে ফেলার পর মাছরাঙা সরাসরি নিচে ঝাঁপ দেয় না। প্রথমে মাথা কাত করে দুই চোখ দিয়ে একসঙ্গে তাকায় লক্ষ্যবস্তুর দিকে। এই দুই চোখের কোণ মিলিয়েই সে দূরত্ব আর গভীরতা মেপে ফেলে, ঠিক যেভাবে তুমি বল ছোড়ার আগে দুই চোখ দিয়ে দূরত্ব আন্দাজ করো। তারপর ডাইভ। ডানা গুটিয়ে, ঠোঁট সোজা সামনে, পা পেছনে টেনে শরীরটাকে বানিয়ে ফেলে একটা তীরের আকৃতি। পানিতে পড়ার মুহূর্তে ছিটা প্রায় ওঠেই না, শব্দও হয় না বললেই চলে।

এই নিঃশব্দ প্রবেশের রহস্য ঠোঁটের গড়নে। সরু, লম্বা আর সামান্য ত্রিকোণাকার—অনেকটা বর্শার ফলার মতো এই ঠোঁটের কারণে পানির উপরিতলের বাধা অনেকখানি কমে যায়, ফলে পাখিটা প্রায় বিনা বাধায় ঢুকে পড়ে ভেতরে। জাপানের বুলেট ট্রেনের সামনের অংশ নাকি ডিজাইন করা হয়েছিল মাছরাঙার ঠোঁট দেখেই, যাতে টানেলে ঢোকার সময় বিকট শব্দ না হয়। একটা ছোট্ট পাখির শরীরের গড়ন বিশ্বের দ্রুততম ট্রেনের নকশা বদলে দিয়েছে, ভাবলে অবাক লাগে।

পানির নিচে ঢোকার পর চোখ কিন্তু বন্ধ হয়ে যায় না। মাছরাঙার চোখে আছে একটা স্বচ্ছ তৃতীয় পাতা, নিক্টিটেটিং মেমব্রেন নামে পরিচিত। ডাইভের মুহূর্তে এই পাতলা পর্দা চোখের ওপর নেমে আসে, আঘাত আর ঘোলা পানি থেকে বাঁচায় চোখকে, অথচ পাখিটা তখনো কিছুটা দেখতে পায়। ফলে পানির নিচে ঢুকে গিয়েও শেষ মুহূর্তে দিক ঠিক করে নেওয়ার সুযোগ থাকে হাতে। দেখা, হিসাব করা, ঝাঁপ দেওয়া, ধরা, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে সেকেন্ডেরও কম। চোখের পলক ফেলার আগেই মাছরাঙা তার শিকার নিয়ে আবার ভেসে ওঠে পানির ওপরে।

দুটাকার পাখি

মাছ মুখে নিয়ে ওঠার পরও কাজ শেষ হয় না অবশ্য। জ্যান্ত মাছ পিছলে বেরিয়ে যেতে পারে, তাই মাছরাঙা প্রথমে ডাল বা তারে ফিরে গিয়ে মাছটাকে বারবার আছড়ায়। এতে মাছের শরীর অবশ হয়ে আসে, কাঁটাও কিছুটা নরম হয়। তারপর ধীরে ধীরে মাথার দিক থেকে গিলে ফেলে, যাতে আঁশ আর কাঁটা গলায় না বেঁধে।

সব সময় অবশ্য এই হিসাব মেলে না। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একটা মাছরাঙার প্রতি ১০টি ডাইভের মধ্যে সফল হয় গড়ে ৬ থেকে ৭টি। বাকিগুলো ফসকে যায়। কখনো মাছ শেষ মুহূর্তে সরে যায়, কখনো ঢেউয়ের কারণে হিসাবে গোলমাল বাধে। অভিজ্ঞ পাখিরা ধীরে ধীরে এই সাফল্যের হার বাড়িয়ে নেয়, অনেকটা নিয়মিত অনুশীলনে একজন ক্রিকেটারের শট খেলা নিখুঁত হয়ে ওঠার মতো।

আমাদের দেশের খাল-বিল আর পুকুরপাড়ে এই দৃশ্য একসময় ছিল খুবই সাধারণ। শহরের কাছাকাছি এলাকায় এখন মাছরাঙা দেখা একটু কমে এসেছে, পানি দূষণ আর জলাশয় ভরাটের কারণে। গ্রামের দিকে অবশ্য এখনো ভোরবেলা পুকুরপাড়ে বসলে সেই একই দৃশ্য চোখে পড়ে। নিঃশব্দ অপেক্ষা, হঠাৎ একটা ঝাঁপ, আর পানি ফুঁড়ে ওঠা এক ঝলক নীল, ঠোঁটে রুপালি মাছ।

পরেরবার কোনো মাছরাঙাকে ডালে বসে থাকতে দেখলে একটু থেমে দেখো একে। ওই স্থিরদৃষ্টির পেছনে চলছে আলোর বাঁকা পথ মাপার একটা হিসাব, যেটা শেষ হবে চোখের পলকে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্সসাবমেরিন চালিয়ে সমুদ্রের নিচে টিয়া পাখি

Read full story at source