ছিলেন রাখাল, পরে বাদাম বিক্রেতা, এখন বছরে বরই বিক্রি করেন এক কোটি টাকার
· Prothom Alo
একসময় অন্যের বাড়িতে রাখালের কাজ করতেন মোসলেম উদ্দিন। যে টাকা পেতেন, তা দিয়ে সংসার চলত না। পরে এই কাজ ছেড়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে আচার ও বাদাম বিক্রি শুরু করেন। তাতেও আয় তেমন হতো না। পরে জমি ইজারা নিয়ে লেবু ও মাল্টার চাষ করেন। এখন টাঙ্গাইলের সখীপুরে প্রায় ৫০ একর জমিতে গড়ে তুলেছেন টক বরইয়ের বাগান।
আগাম জাতের টক বরই জীবন পাল্টে দিয়েছে মোসলেমের। এ মৌসুমে নিজের বাগান থেকে কোটি টাকার বরই বিক্রির আশা করছেন তিনি। এতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা লাভ হবে তাঁর।
Visit casino-promo.biz for more information.
দারিদ্র্যের কারণে ছোটবেলায় পড়াশোনা করতে পারেননি মোসলেম। মানুষের বাড়িতে থেকে গরু-বাছুর চরিয়েছেন। ১৯৯৭ সালে বিয়ে করার পর সংসারের সচ্ছলতা আনতে ফেরি করে আচার ও বাদাম বিক্রির শুরু করেন। কখনো বাড়ি বাড়ি, কখনো কোনো বিদ্যালয়ের সামনে, আবার কখনো বাজারে আচার-বাদাম বিক্রি করে যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনোরকমে তাঁর সংসার চলত।
২০১০ সালের দিকে ১২ বছরের জন্য ছয় একর জমি ইজারা নিয়ে প্রথমবারের মতো লেবুর চাষ শুরু করেন মোসলেম। এতে দ্রুতই তাঁর সাফল্য আসে।
চলছে বরইবাগানের পরিচর্যা। গত বৃহস্পতিবার সখীপুরের ইন্দারজানী গ্রামেলেবু থেকে টক বরই
লেবুর বাগান করে সাফল্য পাওয়ার পর নতুন করে কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন মোসলেম। তাঁর মনে হলো, যে বরই দিয়ে মানুষের পছন্দের আচার তৈরি হয়, সেই বরই তিনি চাষ করবেন। বিশেষ করে টক বরইয়ের আচার নারীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়—বিষয়টি তাঁর ভাবনায় বেশি ছিল।
প্রথমে সখীপুরের গজারিয়া ইউনিয়নের কীর্ত্তনখোলা গ্রামে ১০ একর জমিতে আগাম জাতের টক বরই চাষ শুরু করেন মোসলেম। পরে উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের ইন্দারজানী গ্রামের সাতটি স্থানে আরও প্রায় ৪০ একর জমি ইজারা নিয়ে বরই চাষ করেন। সব মিলিয়ে এখন প্রায় ৫০ একর জমিজুড়ে এখন তাঁর বরইয়ের বাগান। গত আগস্টের শুরু থেকে তাঁর বাগানের আগাম জাতের টক বরই বিক্রি হচ্ছে।
বাগান থেকে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ বস্তা বরই পাঠানো হচ্ছে ঢাকার কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারের পাইকারি আড়তে। প্রতিটি বস্তায় প্রায় ৬০ কেজি বরই থাকে। প্রতি কেজি আগাম টক বরই বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। সেই হিসাবে প্রতিদিন ৭২ হাজার থেকে ৯৬ হাজার টাকার বরই বিক্রি হচ্ছে।
৫ সেপ্টেম্বর মোসলেমের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে বড়ই। গাছের নিচে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। কেউ গাছ থেকে বরই পাড়ছেন, কেউ ঝুড়িতে তুলছেন, আবার কেউ বস্তায় ভরছেন।
বরই পেড়ে বিক্রির জন্য বস্তায় ভরা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার সখীপুরের ইন্দারজানী গ্রামেমোসলেম বলেন, যখন মৌসুম পুরোদমে চলে (নভেম্বর-ডিসেম্বর), তখন প্রতিদিন এক থেকে দেড় লাখ টাকার বরই বিক্রি হয়। ভরা মৌসুমে দাম কিছুটা কম হলেও তখন উৎপাদন ও সরবরাহ বেড়ে যায়। এ মৌসুমে অন্তত এক কোটি টাকার বরই বিক্রির আশা করছেন তিনি। এরই মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছেন।
মোসলেম বলেন, গত মৌসুমে পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না। বরইগাছে ফুল আসার সময় অতিরিক্ত বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় ফলন কমে যায়। গত বছর প্রায় ৫০ লাখ টাকার বরই বিক্রি করলেও জমির ইজারা, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে তাঁর লাভ ছিল মাত্র ছয়-সাত লাখ টাকা। তবে তাঁর আশা, এবার এক কোটি টাকার বরই বিক্রি হলে তাঁর অন্তত ৩০ লাখ টাকা লাভ থাকবে।
বরইয়ের বাগান শুধু মোসলেমের ভাগ্যই বদলায়নি, কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে। তাঁর বাগানে সারা বছর স্থায়ীভাবে কাজ করেন প্রায় ১৫ জন শ্রমিক। বরই পাড়ার মৌসুমে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ জন শ্রমিক কাজ করেন।
১৫ জনের স্থায়ী কর্মসংস্থান
বরইয়ের বাগান শুধু মোসলেমের ভাগ্যই বদলায়নি, কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে। তাঁর বাগানে সারা বছর স্থায়ীভাবে কাজ করেন প্রায় ১৫ জন শ্রমিক। বরই পাড়ার মৌসুমে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ জন শ্রমিক কাজ করেন।
বাগানের বরইয়ের বড় ক্রেতা হলো বিভিন্ন খাদ্যপণ্য ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান। প্যাকেটজাত আচার তৈরির জন্য এসব প্রতিষ্ঠান বড় পরিমাণে টক বরই কিনে থাকে। ফলে উৎপাদিত বরই বিক্রি নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতে হয় না বলে জানান তিনি।
ছনের ঘর থেকে তিনতলা ভবন
সখীপুরের গজারিয়া ইউনিয়নের ধুমখালী এলাকায় নিজের কেনা প্রায় এক একর জমিতে এখন মোসলেমের তিনতলা বাড়ি। যে মানুষটি একসময় সর্বোচ্চ টিনের ঘর করার স্বপ্ন দেখতেন, তিনি এখন অট্টালিকায় থাকেন।
মোসলেম বলেন, দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া করতে পারেননি। ছোটবেলায় মানুষের বাড়িতে রাখাল থেকেছেন। ১৯৯৭ সালে বিয়ের পর বাড়ি বাড়ি বাড়ি ঘুরে ফেরি করে আচার-বাদাম বিক্রি করেন। তখন বাড়িতে দোচালা ছনের ঘর ছিল। স্বপ্ন দেখতেন, একদিন দোচালা টিনের ঘর হবে। এখন তিনি তিনতলা বাড়ির মালিক। কৃষির আয় দিয়েই তিনি এ বাড়ি করেছেন।
মোসলেমের এক মেয়ে। তাঁকে বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলের মধ্যে একজন ঢাকার তেজগাঁও কলেজ থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স (সম্মান) শেষ করে মালয়েশিয়ার লিঙ্কন ইউনিভার্সিটি কলেজে পড়াশোনা করছেন। ছোট ছেলে এবার সখীপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন।
নিয়ন্তা বর্মন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, সখীপুর আগাম জাতের টক বরই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে মোসলেম সফলতা অর্জন করেছেন। সখীপুরের মাটি বিভিন্ন ধরনের ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং তাঁদের চাষাবাদে সহযোগিতা করতে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।বরই চাষে অন্যদেরও আগ্রহ
মোসলেমের বরইয়ের বাগান দেখে সখীপুরের অনেক কৃষক এখন এই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কেউ কেউ ইতিমধ্যে নতুন করে বরইয়ের বাগানও করেছেন। তিনি বলেন, বেকার তরুণ-তরুণীরা বরই চাষ করে সফল হতে পারেন। এ দেশের মাটি বরই চাষের জন্য খুবই উর্বর। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে এ পেশায় অবশ্যই সফল হওয়া সম্ভব।
মোসলেমের মতে, লাভজনক ফলের বাগান করতে হলে জাত নির্বাচন, পরিচর্যা ও বাজারজাত—এই তিন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হয়। আগাম জাতের বরইয়ের ক্ষেত্রে বাজারে ফল আসার সময়ও গুরুত্বপূর্ণ।
সখীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মন প্রথম আলোকে বলেন, আগাম জাতের টক বরই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে মোসলেম সফলতা অর্জন করেছেন। সখীপুরের মাটি বিভিন্ন ধরনের ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং তাঁদের চাষাবাদে সহযোগিতা করতে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।
প্রায় ৫০ একর জমির বাগানে ঝুলে থাকা টক বরইগুলো তাই শুধু ফল নয়; মোসলেমের কাছে এগুলো তাঁর বদলে যাওয়া জীবনের প্রতিচ্ছবি।