একজনই ছয় দায়িত্বে, পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন

· Prothom Alo

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক একই সঙ্গে তিনটি প্রশাসনিক পদসহ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। তাঁর নাম ফেরদৌস রহমান। তিনি একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, প্রক্টর ও বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালক। এ ছাড়া তিনি সিন্ডিকেট ও কর্মকর্তা নিয়োগ বাছাই বোর্ডের সদস্য এবং কর্মচারী নিয়োগের আবেদন বাছাই কমিটিরও আহ্বায়ক।

Visit h-doctor.club for more information.

এক ব্যক্তির একসঙ্গে ছয়টি দায়িত্বে থাকার বিষয়টিকে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকেরা। বিষয়টি নিয়ে ১০ জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা আরও বলেছেন, গত ৭ ফেব্রুয়ারি সহযোগী অধ্যাপক পদ থেকে ফেরদৌস রহমানকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদোন্নতি নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে।

ফেরদৌস রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক। তিনি ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বহিরাঙ্গন কার্যক্রম (অফিস অব এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স) দপ্তরের পরিচালক এবং ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব নেন। আগামীকাল মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) প্রক্টর পদে তাঁর দুই বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফেরদৌস রহমানকে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই বছরের ৫ জানুয়ারি তাঁকে পরিচালক শ্রেণিতে সিন্ডিকেট সদস্য করা হয়। কর্মকর্তা নিয়োগ বাছাই বোর্ডের সদস্য হন গত ৭ ফেব্রুয়ারি।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর আইনের ২১ নম্বর ধারায় সিন্ডিকেট সদস্য সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই ধারার ১-এর (ট) উপধারায় বলা হয়েছে, সিন্ডিকেট থেকে পালাক্রমে মনোনীত দুজন পরিচালক সিন্ডিকেট সদস্য হবেন। একই আইনে ‘পরিচালক’ বলতে ইনস্টিটিউটের পরিচালককে বোঝানো হয়েছে। এ কারণে বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালককে ‘পরিচালক শ্রেণির’ সিন্ডিকেট সদস্য মনোনয়ন দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মূলত তাঁকে সিন্ডিকেটের সদস্য করার উদ্দেশ্যেই বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালক করা হয়েছিল।

পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন

বিশ্ববিদ্যালয়ের পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ী, পিএইচডি ডিগ্রিধারী কোনো শিক্ষককে অধ্যাপক হতে হলে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অন্তত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। ফেরদৌস রহমান ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সহযোগী অধ্যাপক হন। বিধি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারির আগে তাঁর অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সুযোগ ছিল না। কিন্তু চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল সিন্ডিকেটের ৯৪তম বিশেষ সভায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) করা শিক্ষকদের পদোন্নতি নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। এরপর সিন্ডিকেটের ১০১তম সভায় অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা (নির্দিষ্ট পদে চাকরিকালীন সময়সহ অন্যান্য) বাতিল করা হয়। তবে ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ১১৫তম সভায় ওই বিশেষ সুবিধা পুনর্বহাল করা হয়। পরে ফেরদৌস রহমানকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

পুনর্বহাল করা ওই ধারায় অতিরিক্ত সংখ্যক প্রকাশনার জন্য ফেরদৌস রহমান এক বছরের রেয়াত নেন। তবে শিক্ষকেরা বলছেন, এই রেয়াত মোট চাকরিকালের ১২ বছর পূরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়; সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখা সূত্রে জানা গেছে, পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ী প্রশাসনিক পদে প্রতি তিন বছরের কর্ম অভিজ্ঞতার জন্য সর্বোচ্চ এক বছরের রেয়াত পাওয়া যায়। কিন্তু ওই সময় ফেরদৌস রহমানের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছিল ১ বছর ৪ মাস ১১ দিন।

তবে ফেরদৌস রহমান ১ সেপ্টেম্বর মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘নীতিমালার বাইরে কোনো কিছুই হয়নি। নীতিমালার মধ্যেই সবকিছু হয়েছে।’

‘নীতিমালা লঙ্ঘন করেই পদোন্নতি’

ফেরদৌস রহমানকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ছিলেন হারুন অর রশিদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নীতিমালা লঙ্ঘন করেই ফেরদৌস রহমানকে অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে নিয়োগ দিতে তখন ১০১তম সিন্ডিকেটের সভার একটি সিদ্ধান্ত পরের আরেকটি সিন্ডিকেটের সভার কার্যপত্র (রেজোল্যুশন) বাতিল দেখিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাস্তবে সেই সিন্ডিকেটের সভায় ওই সিদ্ধান্ত বাতিলসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি।

বিধি সংশোধন করে যে যোগ্যতায় ফেরদৌস রহমানকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল, সেই বিধি ও একই যোগ্যতার আলোকে আবেদন করলেও অনেক শিক্ষক পদোন্নতি পাননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক মো. আবদুল লতিফ প্রথম আলোকে বলেন, অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতে সব বিধি মেনে তিনিসহ আরও কয়েকজন শিক্ষক আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি।

একজন শিক্ষককে যোগ্যতা পূরণের আগেই অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া এবং একই সঙ্গে তাঁকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বহাল রাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ১০ জন শিক্ষক। তাঁরা বলেন, এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহামুদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন ব্যক্তিকে এত পদে–দায়িত্বে রাখা বিরল ঘটনাই বলব। অন্য অধ্যাপকদের দায়িত্ব না দিয়ে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদ একজনের ধরে রাখার বিষয়টি নৈতিকতাবিরোধীও।’

Read full story at source