ভারত ছাড়—ইউসুফ মেহরলির সেই স্লোগান

· Prothom Alo

কুইট ইন্ডিয়া (ভারত ছাড়) স্লোগানের জনক কে? যেহেতু এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী, তাই সাধারণ ধারণা হলো এ কৃতিত্ব তাঁরই। কিন্তু আরেকটি শক্তিশালী দাবি পাওয়া যায়। এ স্লোগানের জনক তৎকালীন ভারতের স্বাধীনতা কর্মী ও সমাজতান্ত্রিক নেতা ইউসুফ মেহরলি। ‘গান্ধী অ্যান্ড বোম্বে’ বইয়ে লেখক কে গোপালাসোয়ামি এ দাবির সপক্ষে একটি ঘটনা তুলে ধরেছেন—‘শান্তিকুমার মোরারজির বর্ণনা মতে, গান্ধী স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য চমৎকার একটি স্লোগান তৈরির জন্য মুম্বাইয়ে তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছিলেন (তবে বৈঠকটি কবে হয়েছিল তা উল্লেখ নেই)। একজন প্রস্তাব দিলেন “গেট আউট”। গান্ধীর তেমন পছন্দ হলো না। রাজাগোপালাচারি “রিট্রিট” বা “উইথড্র” এ দুটি স্লোগানের কথা বললেন। এ দুটোও টিকল না। ইউসুফ মেহরলি প্রস্তাব করলেন “কুইট ইন্ডিয়া”। গান্ধী পছন্দ করলেন। সমর্থন জানিয়ে বললেন, আমিন।’

মোরারজির বর্ণনায় ওপরের ঘটনাটির সময়কাল না থাকলেও রামচন্দ্র গুহের প্রবন্ধ ‘রিমেম্বারিং ইউসুফ মেহরলি, দ্য মুসলিম সোশ্যালিস্ট মেয়র অব মুম্বাই’ থেকে আঁচ করা যায়, এটি ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসের ঘটনা। গান্ধী অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সভায় যোগ দিতে ট্রেনযোগে মুম্বাই উপস্থিত হন। তাঁকে বরণ করে নেন ইউসুফ মেহরলি। ইউসুফ তখন মুম্বাইয়ের মেয়র। প্রথম সমাজতান্ত্রিক নেতা হিসেবে তিনিই প্রথম সে বছরের এপ্রিল মাসে মুম্বাইয়ের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। মুম্বাইয়ের গোয়ালিয়া ট্যাংক ময়দানে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সভাতেই ঐতিহাসিক কুইট ইন্ডিয়া আন্দোলনের প্রস্তাব পাস হয়েছিল। সম্ভবত সেই সময়ে ইউসুফ মেহরলি ‘কুইট ইন্ডিয়া’ স্লোগানটি উদ্ভাবন করেছিলেন। ইউসুফের বয়স তখন ৩৯ বছর। তাঁর জীবনীকার মধু দন্ডবতীর ভাষ্য অনুসারে, ‘পদ্মা’ নামে মেহরলির একটি প্রকাশনা সংস্থা ছিল। মুম্বাইয়ের ফিরোজ শাহ মেহতা সড়কে ছিল এর অবস্থান। ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের প্রাক্কালে এ প্রকাশনী থেকে একই শিরোনামে মেহরলি একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন। এক সপ্তাহের মধ্যেই সবকটি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। মধু দন্ডবতী রচিত ইউসুফ মেহরলির জীবনীর নাম ‘ইউসুফ মেহরলি: কোয়েস্ট ফর নিউ হরাইজনস’। মুম্বাইয়ে অবস্থিত ‘ইউসুফ মেহরলি সেন্টার’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জি জি পরেখের বর্ণনায় জানা যায়, ১৯৪২ সালের ৭ আগস্ট শুরু হওয়া অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সভার আগে ইউসুফ মেহরলি ‘কুইট ইন্ডিয়া’ সংবলিত হাজার হাজার ব্যাজ তৈরি করে স্লোগানটিকে জনপ্রিয় করেছিলেন। সে বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সিআইডি পদ্মা প্রকাশনীতে রেইড চালিয়ে পুস্তিকাগুলো জব্দ করে। তার আগেই আগস্টের ৯ তারিখ মহাত্মা গান্ধীসহ আরও বহু নেতা–কর্মীর সঙ্গে ইউসুফ মেহরলি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

Visit rouesnews.click for more information.

ইউসুফ মেহরলির জন্ম ১৯০৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, মুম্বাইয়ে। ভারদা উচ্চবিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হন। এলফিলস্টোন কলেজ থেকে ইতিহাস ও অর্থনীতি বিষয়ে তিনি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। এরপর সরকারি আইন কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু তাঁর ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে কখনো প্র্যাকটিস করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

ভারদা উচ্চবিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হন। এলফিলস্টোন কলেজ থেকে ইতিহাস ও অর্থনীতি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। এরপর সরকারি আইন কলেজ থেকে তিনি ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু তাঁর ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে কখনো প্র্যাকটিস করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

‘কুইট ইন্ডিয়া’ স্লোগানের মতো ইউসুফ মেহরলির উদ্ভাবিত আরেকটি জনপ্রিয় স্লোগান হলো ‘সাইমন, গো ব্যাক’। ১৯২৮ সালে স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে ভারতে আসে ‘সাইমন কমিশন’। এ কমিশনে সাত সদস্যই ছিলেন ব্রিটিশ। কোনো ভারতীয় প্রতিনিধি ছিল না। তাই সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে ভারতজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন ইউসুফ মেহরলি। সে বছর তিনি ‘বোম্বে ইয়ুথ লিগ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কমিশন মুম্বাই বন্দরে উপস্থিত হয়। ইউসুফ মেহরলি তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে কুলির ছদ্মবেশে বন্দরে প্রবেশ করেন। ‘সাইমন, গো ব্যাক’ স্লোগানে উত্তাল হয় বন্দর এলাকা। পুলিশ আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটা করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সাইমন কমিশনের সদস্যরা পেছনের দরজা দিয়ে বন্দর ত্যাগ করেন। ইউসুফ মেহরলি লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন এবং কারাবরণ করেছিলেন।

ইউসুফ মেহরলি

১৯৩৪ সালে ‘কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি’ গঠিত হয়। এর অন্যতম পুরোধা ছিলেন ইউসুফ মেহরলি। ১৯৩০ এর দশকে তিনি সমাজতন্ত্রের বাণী নিয়ে সারা ভারতবর্ষে অক্লান্ত ভ্রমণ করেছেন। এ সময় তিনি আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ইউরোপ ও আমেরিকায়ও গিয়েছিলেন। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে তাঁর কণ্ঠ ছিল সর্বদা বলিষ্ঠ। এশিয়া ও আফ্রিকার অন্যান্য দেশে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনেও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। রামচন্দ্র গুহের বর্ণনা অনুসারে, তিনি নিউইয়র্কের একটি বুকশপ থেকে ‘স্ট্রেঞ্জ কমিউনিস্টস আই হ্যাভ নৌন’ বইটি কিনেছিলেন। এটি একটি প্রবন্ধ সংকলন। রচয়িতা আমেরিকান সাংবাদিক ও ঐতিহাসিক বার্টরাম ডি উলফ। সেখানে ইউসুফ মেহরলিকে নিয়েও একটি প্রবন্ধ ছিল। শিরোনাম—‘গান্ধী ভার্সাস লেনিন’। ইউসুফের মধ্যে উলফ একজন মানবিক সমাজতন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি দেখেছিলেন। তাঁকে নিয়ে উলফ একটি চমৎকার ঘটনার বয়ান দিয়েছেন। উলফের বর্ণনায়, মেহেরলি আটলান্টিক মহাসাগর ও ম্যাসাচুসেটস বে’র সঙ্গমস্থলে গিয়েছিলেন। তিনি গাড়ি থেকে নামলেন। জুতা খুলে রাখলেন। অতঃপর পানিতে নামলেন। যখন তিনি পুনরায় তীরে ফিরলেন, তার চেহারা এক উজ্জ্বল আভায় উদ্ভাসিত ছিল। এমন দীপ্তি উলফ এর আগে কারও চেহারায় দেখেননি। ইউসুফ তখন তাঁকে বললেন, ‘দুটি প্রবাহের সংযোগস্থলকে আমরা ভারতীয়রা পবিত্র বলে বিশ্বাস করি।’

‘কুইট ইন্ডিয়া’ স্লোগানের মতো ইউসুফ মেহরলির উদ্ভাবিত আরেকটি জনপ্রিয় স্লোগান হলো ‘সাইমন, গো ব্যাক’। ১৯২৮ সালে স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে ভারতে আসে ‘সাইমন কমিশন’। এ কমিশনে সাত সদস্যই ছিলেন ব্রিটিশ। কোনো ভারতীয় প্রতিনিধি ছিল না। তাই সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে ভারতজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়।

ইউসুফ মেহরলি সম্পর্কে বিখ্যাত সমাজতান্ত্রিক-নারীবাদী কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় লেখেন, ‘তিনি ছিলেন নির্ভীক কিন্তু বিনয়ী, দুঃসাহসী কিন্তু বিবেচক, ত্যাগী কিন্তু ভালোবাসা ও স্নেহে পরিপূর্ণ, তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র; রাজনীতি ও ধর্ম–নির্বিশেষে তাঁর কাছে নিবেদিত বন্ধু ও অনুগত সহকর্মী গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’ ট্রেড ইউনিয়ন নেতা কমরেড পিটার আলভারেজ ইউসুফ মেহরলি সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি ছিলেন আগুন ও মধুর এক বিরল সমন্বয়! নিজেকে ছাড়া তিনি আর সবাইকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।’ অপরের মঙ্গল সাধনে তিনি এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে নিজের স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেননি। দ্রুত তাঁর শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধে এবং তিনি শয্যাশায়ী হন। তাঁকে মুম্বাইয়ের একটি ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়েছিল। যখন তাঁর স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি হচ্ছিল না, তখন তিনি বাসায় চলে যান, যেন ডাক্তারদের সুনাম ক্ষুণ্ন না হয়।

১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইউসুফ মেহরলি ১৯৪৬ সালে কারামুক্ত হন। স্বাধীন ভারতে তিনি এমএলএ হয়েছিলেন। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে ইউসুফ মেহরলি মুম্বাইয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

Read full story at source