‘টাকা ভাঙতির মতো তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে ওরা বাবাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে’

· Prothom Alo

টাকা ভাঙতির মতো তুচ্ছ একটা বিষয়কে কেন্দ্র করে তারা আমার বাবাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। আমি এর বিচার চাই—কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মো. তানভীর হোসেন। তাঁর ভাষ্য, হামলাকারীদের কবল থেকে বাঁচতে তিনি দৌড়ে পালাচ্ছিলেন। তখন তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন তাঁর বাবা বারিউল ইসলাম (৪০)। হামলাকারীরা তাঁকে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে।

Visit h-doctor.club for more information.

ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানার ডিঙ্গাডোবা বাকীর মোড় এলাকায়। শনিবার দিবাগত রাত পৌনে একটার দিকে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল হামলা চালায় বলে নিহতের পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ। এ সময় একটি মুদিদোকানে ভাঙচুর ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় রোববার বিকেলে নিহতের স্ত্রী মোসা. দিলরুবা পারভীন রাজপাড়া থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ২০ জনের নাম উল্লেখসহ ২০ থেকে ৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

২০০ টাকার নোট ভাঙানো নিয়ে শুরু

বারিউল ডিঙ্গাডোবা বাকীর মোড় এলাকায় একটি মুদিদোকান চালাতেন। তাঁর একমাত্র সন্তান তানভীর বাবাকে দোকানের কাজে সহযোগিতা করতেন।

তানভীর প্রথম আলোকে বলেন, শনিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে তিন ব্যক্তি তাঁদের দোকানে আসেন। তারা সম্ভবত মাদক কিনতে এসেছিল। তাঁরা ২০০ টাকার একটি নোট ভাঙাতে দেন। তাঁদের দুটি ১০০ টাকার নোট দেওয়া হয়। পরে তাঁরা ওই দুটি নোট আবার ৫০ টাকার নোটে ভাঙিয়ে দিতে বলেন; কিন্তু দোকানে তখন খুচরা টাকা না থাকায় তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। ওই ব্যক্তিরা তাঁর বাবাকে কেন টাকা ভাঙিয়ে দেওয়া হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন করেন। একপর্যায়ে বারিউলের কলার ধরে টানাহেঁচড়া ও মারধর করা হয়।

তানভীরের ভাষ্য, বাবাকে ছাড়াতে এগিয়ে যান তিনি। পরে তাঁর চাচা ও আশপাশের লোকজনও সেখানে আসেন। দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে বিপক্ষের কয়েকজন পাশের ড্রেনে পড়ে যান। বিপক্ষের একজনের মাথায় আঘাত পান বলেও জানান তানভীর। তাঁর দাবি, পরে তাঁরা চলে যাওয়ার সময় দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে যান। তানভীর বলেন, এরপর পাশের চণ্ডীপুর এলাকা থেকে তাঁদের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।

বারিউল ইসলামের মরদেহ বাড়িতে আনার পর দেখতে আসেন প্রতিবেশীরা

রাত সাড়ে ১২টার দিকে ফিরে আসে

এ ঘটনার জেরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে ৪০-৫০ জন আসে। তাদের বেশির ভাগের হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল। তানভীর বলেন, হামলাকারীরা প্রথমে তাদের দোকানে তারা ভাঙচুর করে। ইটপাটকেল ছোড়ে। দোকানের দিকে পেট্রলবোমা ও ককটেল নিক্ষেপ করে। এ সময় তাঁরা আতঙ্কে ছুটে পালানোর চেষ্টা করেন।

তানভীর বলেন, ‘আমি তখন বাঁচার জন্য দৌড়াচ্ছিলাম। বাবা আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন। তখনই তাঁকে ধরে ফেলে কুপিয়ে দেয়।’

হামলায় পরিবারের আরও কয়েকজন আহত হন। নিহত ব্যক্তির চাচা মো. ইমামুল ইসলামের হাতের তালুতে সাতটি সেলাই পড়েছে। তাঁর একটি আঙুল ভেঙে গেছে। নিহতের চাচাতো ভাই মো. একরামুলের বাঁ হাতের তালুতেও আঘাত লাগে। তাঁরা চিকিৎসা নিয়েছেন।

দোকানের সামনে পেট্রলবোমা, রক্তের দাগ

রোববার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বারিউলের দোকানের শাটার ও তালা আগুনে পুড়ে কালো হয়ে গেছে। দোকানের কাচ ভাঙা। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা কাচ ও বিভিন্ন জিনিসপত্র। দোকানের সামনেই একটি অবিস্ফোরিত পেট্রলবোমা পড়ে থাকতে দেখা যায়।

দোকানের পাশের একটি জায়গা গাছের ডালপালা দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। জায়গাটি কালো হয়ে আছে। স্থানীয় লোকজন জানান, ওই স্থানেই বারিউলকে কোপানো হয়েছিল।

ঘটনার পর ভয়ে স্থানীয় অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি। তবে কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিঙ্গাডোবা বাকীর মোড়সহ আশপাশের এলাকায় মাদক কেনাবেচা হয়। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। পুলিশ ওই এলাকায় একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে বলেও তাঁরা জানান।

বারিউল ইসলামের দোকানে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় হামলাকারীদের কয়েকজন সেখানে মাদক কিনতে এসেছিলেন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, সন্ধ্যার দিকে তাঁদের কয়েকজনকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখা গিয়েছিল।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও উপপুলিশ কমিশনার মো. গাজিউর রহমান বিকেলে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বক্তব্যে বলেন, গতকাল (শনিবার) সন্ধ্যায় বারিউল ইসলামের মুদিদোকানে তিন/চারজন লোক এসে টাকা ভাঙতি চায়। এ নিয়ে বারিউল এবং তাঁর ছেলের সঙ্গে তাদের মারামারি বাঁধে। পরে রাত ১২টার পরে ৪০-৫০ জন লোক দেশি অস্ত্র নিয়ে এসে রাবিউলের মুদিদোকানে হামলা চালায় এবং এক পর্যায়ে বারিউলকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি ভাবে কুপিয়ে ফেলে রেখে চলে যায়। স্থানীয় লোকজন বারিউলকে দ্রুত হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে রোববার বেলা তিনটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বারিউলের মরদেহ বাড়িতে আনা হয়। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। স্বজনেরা শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে ভিড় করেন। বাদ আসর নগরের মহিষবাথান এলাকায় বারিউলের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সেখানকার কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

Read full story at source