বিউটি পাল: সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে শিল্পের জয়

· Prothom Alo

‘ভাষা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই সংগীত শুরু হয়।’ —হাইনরিশ হাইনে (১৭৯৭—১৮৫৬)

কিছু কিছু ঘটনার রেশ মানুষের মনে গেঁথে রয়। আর সেই ঘটনা যদি হয় শিল্পসাহিত্য–সম্পর্কিত, তাহলে তার রেশ দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থায়ী হয়ে যায়। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পালের ঘটনাটি দেশজুড়ে এমনই আলোড়ন তুলেছিল যে ‘বিউটি পাল’ নামটি দেশের অধিকাংশ মানুষই আজ জানে। অবশ্য আবার নতুন করে আলোচিত হয়েছেন বিউটি পাল। সম্প্রতি প্রথম আলোর বরাতে বিউটি রানী পালের গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি সিলেট জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ আমাদের নিশ্চিত করেছেন।

Visit sweetbonanza.qpon for more information.

বিউটি পাল। গুণী শিক্ষক। গত ২৩ জুলাই তাঁর ফেসবুক পেজে কয়েক সেকেন্ডের একটি রিল পোস্ট করে রিলটির ব্যাকগ্রাউন্ডে যুক্ত করেছিলেন ডিফরেন্ট টাচ ব্যান্ডের মেজবাহ রহমানের গাওয়া ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটির একটি অংশ। বিউটি পালের সুন্দর ভিডিওটি পরে কোনো এক ‘অসুর’ একটি ফেসবুক পেজ থেকে ‘নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে’ ছড়িয়ে দেয়।

সংগীত আসলে এমন এক অতীন্দ্রিয়জাত ব্যাপার, মানুষের ভেতরের যেসব অনুভূতিকে শব্দবাক্যে প্রকাশ করা যায় না, সংগীত তা সুরের মূর্ছনা দিয়ে প্রকাশ করতে পারে। আমাদের মধ্যে এমন ব্যাপার হরহামেশাই ঘটে যে একটি পুরোনো গানের সুর বা কথা কোনো বিশেষ মুহূর্ত বা মানুষ বা স্থানকে চোখের সামনে মূর্ত করে তোলে। আর মানুষ ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে যায় সুরের দোলায়। এটা একান্তই অনুমান যে সেদিন আমাদের এই শিক্ষকের মনের ভেতরেও হয়তো এমন কিছু সুপ্ত হাহাকার বা আনন্দ ভর করেছিল। ফলে না–বলা কথাগুলো সুরের মূর্ছনায় রূপ দিয়ে তাঁর উদাসী মন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শাড়ি পরে হেঁটে হারিয়ে যেতে চেয়েছিল দূর অজানায়।

মানবমনের ওপর সংগীতের প্রভাব ব্যাপক। এর সপক্ষে কবি–সাহিত্যিক–শিল্পীরা বলেছেনও বিস্তর। জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের কালজয়ী উক্তিটি তো সুবিদিতই, ডেনিশ সাহিত্যিক হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের অভিমতটিও কমবেশি অনেকেরই জানা, ‘যেখানে শব্দ ব্যর্থ হয়, সংগীত সেখানে কথা বলে।’ ‘টুয়েল্ফথ নাইট’-এ তো শেক্‌সপিয়ার বলেই দিয়েছেন, ‘যদি সংগীতই হয় প্রেমের রসদ, তবে বাজুক অবিরাম মূর্ছনা সুরের।’ তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উল্লেখ করে বলা যায়, মানুষের অবচেতন বা সুপ্ত মন হলো আবেগ, স্মৃতি এবং অনুভূতির এমন এক গোপন প্রকোষ্ঠ, যেখানে সাধারণ কথা সহজে পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু সুরের কোনো সীমানা বা বাধা নেই; এটি সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে এবং সুপ্ত আবেগকে জাগিয়ে তোলে। ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ ব্যাপারে বলেছেন, ‘যেখানে অনির্বচনীয় সেইখানেই গানের প্রভাব। বাক্য যাহা বলিতে পারে না গান তাহাই বলে।’

বিউটি পাল। গুণী শিক্ষক। গত ২৩ জুলাই তাঁর ফেসবুক পেজে কয়েক সেকেন্ডের একটি রিল পোস্ট করে রিলটির ব্যাকগ্রাউন্ডে যুক্ত করেছিলেন ডিফরেন্ট টাচ ব্যান্ডের মেজবাহ রহমানের গাওয়া ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটির একটি অংশ। বিউটি পালের সুন্দর ভিডিওটি পরে কোনো এক অসুর একটি ফেসবুক পেজ থেকে ‘নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে’ ছড়িয়ে দেয়।

সংবাদমাধ্যম মারফত থেকে জানা যায়, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে বিউটি পাল একজন জনপ্রিয় শিক্ষক। তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিদ্যালয়ে আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা করানো, নাচের মাধ্যমে গণিতের বিভিন্ন চিহ্নসহ পাঠ্যবইয়ের পড়া শেখানো, বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণের ভিডিও আপলোড করা আছে। তবে উত্তর মেরুতে বরফে আটকা পড়া নীল তিমিকে বেটোফেনের সুরের মোহে নিরাপদ সমুদ্রে বের করে আনা সম্ভব হলেও কিছু মানুষ তো এই পৃথিবীতে আছে, যাদের মন কোনো সুরই টলাতে পারে না। কেননা, এরা ‘মিউজিক্যাল অ্যানহেডোনিয়া’। এদের মস্তিষ্কে ‘এনডোরফিন’ নিঃসৃত হয় না। এদের কোনো প্রিয় ‘প্লে-লিস্ট’ নেই৷ এরা কোনো গানের আসর দেখে মনের ভুলে থমকে দাঁড়িয়ে কান পাতে না। ‘অ্যামিউজা’ নামক একটি বিশেষ অবস্থায় থাকার ফলে সংগীতের বিভিন্ন তানগুলোকে এরা মস্তিষ্কে প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না। ফলে এদের মধ্যে ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি হয় না।

সংগীতের শক্তি এবং সুরহীন মানুষের অন্ধকার মানসিকতার মধ্যকার পার্থক্যটি খুব ভালোভাবে অনুধাবন করা যায় উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারের ‘দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস’ নাটকের একটি বিখ্যাত উক্তি পাঠ করে। শেক্‌সপিয়ার বলেছেন, যে মানুষের অন্তরে কোনো সুর জাগে না, যাকে কোনো মধুর তান করে না আপ্লুত, ব্যাকুল; সে আসলে যোগ্য কেবলই দেশদ্রোহ, চক্রান্ত আর লুণ্ঠনের। এমন সব মানুষকে ভুলেও বিশ্বাস করতে বারণ করেছেন শেক্‌সপিয়ার। কেননা, এদের আত্মার গতি নিশুতি রাতের মতোই জড়, আর এদের অনুরাগ পাতালের অন্ধকারের মতো কালিমাময়। আমরা মনে রাখি, ওই পরিস্থিতিতে জীবনের ভয়ে ভীত বিউটি পাল ভিডিওটি সরিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও একে কেন্দ্র করে ঘটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রোল, থানায় অভিযোগ, পুলিশি তদন্ত আর প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কমিটি গঠনের চিন্তাভাবনাসহ নানান ঘটনা।

বিউটি রানী পাল

ব্যাপারটি ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ একটি বার্তা বহন করে যে বিউটি পাল সাইবার হয়রানির শিকার হওয়ার পরপরই তাঁর সহকর্মী ও দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকেরা তাঁর সঙ্গে সংহতি জানাতে শুরু করেন। আমরা এ–ও দেখেছি, নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইলে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ দেশের সচেতন নাগরিকেরা ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানের ওই নির্দিষ্ট অংশ ব্যবহার করে নানা রকম ভিডিও পোস্ট করেছেন। কেউ কেউ স্কুলের ভেতরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভিডিও দেন, কেউ স্কুলের বাইরে থাকা অবস্থায় করা ভিডিও পোস্ট করেন।

তবে যে প্রশ্নগুলো সর্বাগ্রে আমাদের ভাবনায় করাঘাত করে তার মধ্যে অন্যতম হলো, বিউটি পালের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা আর প্রতিবাদী ভিডিওর মধ্যে আর সীমাবদ্ধ ছিল না। এই ভিডিও নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়ার পর সিলেট জেলার সেই প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, এমনকি পত্রিকায় বলেছেন যে তাঁরা চিন্তা করেছিলেন, এই ভিডিও সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নীতিমালা লঙ্ঘন করে কি না, এ ব্যাপারে তাঁরা খতিয়ে দেখবেন। সিলেট সফরে গিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করার পরই মূলত তাঁরা আর বিউটি পালের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে না বলে জানান।

সংবাদমাধ্যম মারফত থেকে জানা যায়, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে বিউটি পাল একজন জনপ্রিয় শিক্ষক। তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিদ্যালয়ে আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা করানো, নাচের মাধ্যমে গণিতের বিভিন্ন চিহ্নসহ পাঠ্যবইয়ের পড়া শেখানো, বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণের ভিডিও আপলোড করা আছে।

এর অর্থ এই দাঁড়ায়, তাঁরা কি মব সন্ত্রাসের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সেই কমিটি করতে চেয়েছিলেন? ভিকটিমের পক্ষে না দাঁড়িয়ে তাঁর বিরুদ্ধে কমিটি করবেন? প্রতিমন্ত্রী স্টেটমেন্ট না দিলে তাঁরা তাঁদের জ্ঞান, বোধবুদ্ধি প্রয়োগ করবেন না? বিউটি পালের পর অন্য কাউকে যদি মব সন্ত্রাস বা সাইবার সন্ত্রাসের কবলে পড়তে হয়, এর জন্য রাষ্ট্রের মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীকেই দেখভাল করতে হবে?

কোনো রাখঢাক না করে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ একজন গুণী শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়ে একটি দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘গান গাওয়া অন্যায়, এটা আর কেউ মানুক বা না মানুক, আমি মানতে রাজি না।’ না, আমি শিল্পসাহিত্যে অশ্লীলতার পক্ষে নই। তবে প্রতিমন্ত্রীর কথার রেশ ধরে, ‘আমি আশপাশে জিজ্ঞেস করে জানলাম, একজন একটা গান গেয়ে একটি ভিডিও করেছে এবং সেখানে অশ্লীলতা বা তেমন কিছু নেই।’ একটি প্রশ্ন জাগ্রত হয়েছে, শিল্পসাহিত্যে শ্লীল বা অশ্লীলতার মাপকাঠি আসলে কোন নিক্তিতে নির্ধারণ করা হবে? মব বা প্রেশার গ্রুপের চাপে? অশ্লীলতা তেমন কিছু নেই, এই অংশটুকুও পরিষ্কার করার জোর আহ্বান জানাই।

‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানের রিলে আলোচিত বিউটি সিলেটের গুণী শিক্ষক

Read full story at source