ডাহুক পাখির শ্বাস
· Prothom Alo

‘হাজার হাজার ফড়িং উড়ত। বড় বড় ফড়িং। দেখেন নাই, দাদা? আমরা ফড়িং ধরতাম আর জবাই করতাম। ফড়িংকে আমরা মনে করতাম মুরগি।’
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
বড় বড় ফড়িং। আমি দেখেছি। আমরা বলতাম রাজা ফড়িং। হাজার হাজার ফড়িং-নিবেদিত দৃশ্যও দেখেছি। তবে কোনো ফড়িং জবাই করি নাই কখনো। ফড়িংকে মুরগি মনে করি নাই।
‘জবাই করে কী করতা? রান্না করতা?’
‘না দাদা। বড় ফড়িং আর কত বড় হইত? ও কি আর রান্না করা যায়?’
‘রান্না করা যাবে না কেন? পৃথিবীর অনেক মানুষ ফড়িং ভেজে খায়।’
‘আপনি খাইছেন?’
‘পাই নাই, খাই নাই।’
‘পাইলে খাবেন?’
‘অবশ্যই।’
সে বুঝতে পারে নাই সে কত বড় সর্বনাশ করে দিয়েছে। ফড়িংকে মুরগি বানিয়ে দিয়েছে। ফড়িং হইল পক্ষী—কথা আছে বটে। সেটা যে মুরগি, কে জানত। ফড়িংভাজা যদি পেয়ে যাই, আমি কী মনে করে খাব? চিকেন চিলি ফ্রাই?
কোথায় বসে খাব?
প্রাগৈতিহাসিক সেই সব গুহার কোনো একটায় হলে ভালো হয়, দেয়ালে মানুষের প্রচুর হাতের ছাপ আর বর্ণাঢ্য বাইসন আঁকা যে কয়েকটা গুহা এখনো অবশিষ্ট আছে।
যাই সেই গুহাতে একবার। ফড়িং খাই, জোনাকি দেখি।
কাকতালীয় মতো হলো ব্যাপারটা।
সে বলল, ‘দাদা, বাতিটা নিভাই?’
‘কেন?’
‘আপনার ঘরে জোনাকি ঢুকেছে।’
জোনাকি? কোথায়? কত বছর ধরে আমি জোনাকি দেখি না? উনত্রিশ বছরের একটা
হিসাব আছে মাথায়। ফড়িংউড়া ইউনিয়নে গিয়েছিলাম। সিজন ছিল না বলে ফড়িং দেখতে পাই নাই, অযুত–নিযুত জোনাকি দেখে ফিরেছিলাম। সেই জোনাকিপরম্পরা? এত বছর পর আবার। ফড়িংউড়ায় না, আমার ঘরে। উনি কোথায়?
মুরগি মনে করত সে, ফড়িং জবাই করত কিন্তু ভেজে খায় নাই, সে কে? আমি? আমি কে? সে? ‘দাদা, যাই।’ চলে গেল সে। বা থেকে গেল। আমি চলে গেলাম। বা থাকলাম। ডাহুক পাখির শ্বাসের মতো এই সব।
সে দেখাল। জানালার পর্দার ভাঁজে লেগে আছে। নীল রঙের না, স্নিগ্ধ কমলা রঙের জোনাকি। জোনাকির আলো কখনো কমলা হয় নাকি?
সে বাতি নিভিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে জোনাকি উধাও। কী হলো?
‘বাতি জ্বালাও।’
আলোয় আবার দৃশ্যমান হলো পোকাটা। কমলা রঙের স্নিগ্ধ আভাসমেত। জোনাকি না, রাংতা আসলে। ছোট একটা টুকরো লেগে আছে পর্দায়—আলো পড়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। প্রায় স্থির মৃদু স্নিগ্ধ কমলা রঙের আলো। জোনাকি হলে জ্বলত–নিভত, ম্যাজেন্টা বা সবুজ রঙের হলেও।
‘তুমি কখনো জোনাকি দেখো নাই।’
‘দেখব না, দাদা?’
আমি প্রশ্ন উত্থাপন করি নাই। সে এটা আমলে নিল না, প্রচুর জোনাকি দেখার কথা বলতে থাকল।
‘কয়টা দেখছ?’
‘জি, দাদা?’
‘তোমার বয়স এখন কত? উনত্রিশ হইছে? এত দিনে কয়টা জোনাকি দেখছ? আটাশ কোটি হবে মনে করো? পৃথিবীর আটাশ কোটি মানুষ বিষাদগ্রস্ত এখন। আমাদের দেশের জনসংখ্যা কমবেশি আঠারো কোটি।’
সে ভাবল এবং বলল, ‘আটাশ কোটি হয়তো দেখি নাই।’
‘শুমার করে রাখো নাই কেন?’
সে হাসল, ‘জোনাকি শুমার করে রাখব?’
আমাদের টাউনের আর্টিস্ট ফিরু ভাই নদীর ঢেউ শুমার করত।
‘ও ফিরু ভাই, কী করো?’
‘নদীর ঢেউ গুনি রে ভাই।’
‘কয়টা গুনলা?’
‘সে বড় দুঃখের কথা রে ভাই। গুনি আর ভুলে যাই। মনে থাকে না কয়টা গুনলাম।’
ফিরু ভাই ডুবে মরেছিল। কলেজের মুসলিম হোস্টেলের পুকুরে তার লাশ উপুড় হয়ে ভাসছিল। টাউনের মানুষ ভেঙে পড়েছিল দেখতে।
থানা–পুলিশ হয় নাই। অহীন্দ্র দাস ফিরু। জগৎ–সংসারে কেউ ছিল না তার। টাউনের মানুষ সম্মিলিতভাবে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন
করেছিল। ফিরু ভাইয়ের মুখে আগুন দিয়েছিল বকশীদার ছেলে নবকৃষ্ণ। কালে সে–ই নব মদখোর হয়েছে। বাজি ধরে এক জেরিক্যান বাংলা মদ খেয়ে রেকর্ড করেছে। কত–কী! কী থেকে কী! এই যে একজন আমার সামনে বসে আছে, ফড়িংকে
মুরগি মনে করত সে, ফড়িং জবাই করত কিন্তু ভেজে খায় নাই, সে কে? আমি? আমি কে? সে?
‘দাদা, যাই।’
চলে গেল সে। বা থেকে গেল।
আমি চলে গেলাম। বা থাকলাম।
ডাহুক পাখির শ্বাসের মতো এই সব।