কাভা খেয়ে, কাদা মেখে ফিজিতে

· Prothom Alo

প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]

Visit mchezo.co.za for more information.

নাদি শহরের নিউ টাউনে খরচ কমাতে ১৬ জনের ডরমিটরিতে উঠেছিলাম। গিয়ে দেখি, ইন্টারনেট নেই। ব্যস, ভোগান্তির শুরু এখান থেকেই। সন্ধ্যায় অবশ্য এখানে গানের আসর বসে। দুজন গিটার বাজায়। ডরমিটরির দায়িত্বে থাকা ছেলেটির নাম বিল। বিল বড় গামলায় কাভা বানায়, যা এখানকার ঐতিহ্যবাহী পানীয়। গান আর কাভা—দুইয়ে মিলে ইন্টারনেটের ভোগান্তির দুঃখটা ভুলিয়ে দেয় ওরা আমাকে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভানুয়াতু থেকে বেড়াতে এসে এবার আমার ঠিকানা ফিজির নাদি শহর। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ৩৩২ দ্বীপ নিয়ে ফিজি। নীল সমুদ্র, নারকেলগাছ আর পাহাড়—এই তিনে মিলে দেশটি।

নাদি ফিজির বড় শহর। পর্যটকদের বড় একটি অংশের ফিজি-অভিজ্ঞতা শুরু হয় এই শহর থেকেই। শহরটির কাছেই দেশটির প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

এক সকালে বিলকে বললাম, আমার জরুরি একটা ই–মেইল করতে হবে। সে বলল, ‘আমার মোবাইল থেকে নেট কানেকশন নাও।’ আমি তা–ই করলাম। কিন্তু বিল তো আর এক জায়গায় বসে থাকে না। আমার বাঁ হাতে ল্যাপটপ। বিল যেদিকে হাঁটে, আমিও সেদিকে হাঁটি! ই–মেইলে আমার ছবি আপলোড হচ্ছে। এমন সময় দেখি, সামনের রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান। বিল এগিয়ে যাচ্ছে সেদিকেই, আমিও বিলকে অনুসরণ করছি। ই–মেইলে তখন আমার ছবি আপলোড হচ্ছে। বিল টপ করে উঠে পড়ল পুলিশের গাড়িতে। আমিও উঠে পড়লাম পুলিশের গাড়িতে!

এক মিনিটও যায়নি। বুঝলাম, ই–মেইল হয়ে গেছে। এবার আমাকে নামতে হবে।

বললাম, ‘এবার আমায় নামিয়ে দাও।’ পুলিশ বলল, ‘না, তোমাকে কাস্টডিতে নিয়ে যাচ্ছি।’ আমি আঁতকে উঠে বললাম, ‘আমি তো কোনো অপরাধ করিনি!’

বিল হেসে উঠল। বলল, ‘আরে, মজা করছি। এই গাড়ি সকাল-বিকেল দুবার এখানে এসে চক্কর দেয়। আমি এ পাড়ার ছেলে, তাই সঙ্গে যাই।’

হুম, এখানেও দেখি এক বাকের ভাই! পুলিশের গাড়িও তার কাছে নিজের গাড়ির মতো! নেটের অভাবে মানুষ ডেটা কেনে, আর আমি কিনা প্রায় কাস্টডির টিকিট কেটে ফেলছিলাম!

এক দুপুরে নাদি শহরের প্রধান বাসস্টেশনে হাঁটছি। ছেলেমেয়েতে মুখর স্টেশন। বুঝলাম, স্কুল ছুটি হয়েছে। কয়েকজন স্কুলছাত্রীর সঙ্গে ছবি তুললাম। কারও সঙ্গে অভিভাবক নেই। ছেলেমেয়েরা একা একাই বাসে করে বাড়ি ফিরছে।

ব্রিটিশদের কাছ থেকে ১৯৭০ সালে স্বাধীন হওয়ার পরও বহু জাতি ও ভাষার মানুষের দেশ ফিজি যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইংরেজিকে ভাষা হিসেবে ধরে রেখেছে।

একদিন শহরের বাইরে দূরে কোথাও যাব। বাসস্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি বাসের অপেক্ষায়। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি নারকেলগাছ। এমন সময় ছুটে এলেন এক ফিজিয়ান। তিনি বললেন, ‘নারকেলগাছের নিচে দাঁড়াবেন না।’

আরে, তাই তো! মাথার ওপর তাকিয়ে দেখি, গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া আছে সতর্কবার্তা, ‘নারকেল থেকে সাবধান!’

নাদি শহরের সমুদ্রসৈকত

আরেক দিন ডরমিটরির একটি দেয়ালে দুটি শব্দের ওপর আমার চোখ আটকে গেল, ‘স্লিপিং জায়ান্ট’। শুনলাম, এখানে নাকি পর্যটকেরা খুব যায়। নাদি শহর থেকে একটু দূরে। আমি তো ভাবলাম, সেখানে নিশ্চয়ই ঘুমানোর কোনো ব্যবস্থা আছে—পাতালপুরীর মতো কিছু একটা। শিয়রে সোনার কাঠি, পইথানে রুপার কাঠি। কেউ একজন এসে এই দুই কাঠি না তুললে ঘুমই ভাঙবে না আমার!

যাওয়ার পর হাতে একটা ম্যাপ ধরিয়ে দিয়ে আমাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো বোটানিক্যাল গার্ডেনে।

১৮৭৯ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত ভারত থেকে ব্রিটিশরা প্রায় ৬০ হাজার চুক্তিবদ্ধ শ্রমিককে ফিজিতে নিয়ে এসেছিল। আখখেতে শ্রম দেওয়ার জন্য তাঁদের আনা হয়েছিল। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অনেকেই আর ভারতে ফিরে যাননি, থেকে গেছেন ফিজিতেই।

ফিজিতে এসে দেখেছি, সেই পূর্ব প্রজন্মের শ্রম আর ঘামের উত্তরাধিকার বহন করছেন এখানকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষেরা। নাদির শ্রীশিব সুব্রামানিয়া মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, আমি যেন দাঁড়িয়ে আছি সেই দীর্ঘ ইতিহাসের সামনে, যে ইতিহাস সমুদ্র পেরিয়ে মানুষকে ফিজিতে নিয়ে এসেছিল।

একদিন নাদি শহর ছাড়িয়ে দূরে মাড পুলে গিয়ে দেখি, পর্যটকেরা সারা শরীরে কাদা মেখে প্রাকৃতিক পুলে নেমে পড়েছেন। ওরা পোশাক কমিয়ে শরীরে কাদা মাখার জায়গা বাড়িয়েছে, শরীরটাকে কাদার হাতে তুলে দিয়েছে। আমি একটি লম্বা হাতা টপস আর লম্বা প্যান্ট পরেছি। আমি ভাবছি, আমি কাদাটা মাখব কোথায়! না, এ জীবনে আমার আর বিকিনি পরার সাধ মিটল না।

যতবার বাসে উঠেছি বা ট্যাক্সিতে, ড্রাইভার পেয়েছি ভারতীয়। যেই না শোনে বাংলাদেশ থেকে এসেছি, অমনি বলে, এখানে বাংলাদেশিরা সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। গর্বে বুক ভরে যায়।

ফিজির লোককথায় তাদের প্রধান দেবতা দেগেই। দেগেই নড়াচড়া করলেই নাকি ভূমিকম্প নামে। আমি চাই না দেগেই আর নড়াচড়া করুন, তিনি ঘুমিয়ে থাকুন, আমি বরং যাই ফিজি থেকে সামোয়ায়।

Read full story at source