পর্বত, হ্রদ, গরু আর চিজের দেশ সুইজারল্যান্ডে
· Prothom Alo

কখনো কখনো কোনো দেশকে প্রথম দেখার আগেই তার একটি ছবি মনের মধ্যে তৈরি হয়ে যায়। সুইজারল্যান্ড আমার কাছে তেমনই এক দেশ—বরফঢাকা আল্পস, ফিরোজা রঙের হ্রদ, সবুজ উপত্যকা আর পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ঘর। ৯২ লাখ মানুষের এই দেশে আছে ২৬টি প্রদেশ আর প্রশাসনিক প্রদেশ হলো—বার্ন। ৪১,২৯১ বর্গকিলোমিটারের এই দেশ জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, অস্ট্রিয়া আর একটা ছোট দেশ লিখটেন্সটাইন দিয়ে ঘেরা। আর ভাষা হলো জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান ও রোমানশ্ব। মুদ্রা সুইস ফ্রেঙ্ক, যা বাংলাদেশি ১৪৭ টাকার মতো।
১৩ সেপ্টেম্বর রাতে জুরিখ পৌঁছে পরদিন ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হলো আমাদের আসল পথচলা। গন্তব্য ছিল লিশটেনস্টাইনের রাজধানী ভাদুজ। ভাদুজ ছোট শহর, কিন্তু তার চারপাশের পাহাড় এবং পাহাড়ের ঢালে থাকা Vaduz Castle শহরটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়, যা পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত। Städtle এলাকায় হাঁটলাম, দেখলাম সিটি সেন্টার, ক্যাথিড্রাল, পার্লামেন্ট এবং সরকারি এলাকার আশপাশ। ১৬০ বর্গকিলোমিটারের এই দেশ ১৭১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এখন যেখানে মাথাপিছু আয় ২ লাখ ২০ হাজার ডলারের ওপরে। আশ্চর্য হলাম এই দেশে হালাল খাবার দেখে। বিকালের দিকে আবার জুরিখের পথে। গন্তব্য জুগ (Zug)।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
১৫ সেপ্টেম্বর সকালে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম জুগের পথে। শহর পেরিয়ে যত সামনে এগোতে লাগলাম, ততই বদলে যেতে থাকল চারপাশ। কংক্রিটের শহর পেছনে পড়ে সামনে এল সবুজ পাহাড়, ছোট ছোট গ্রাম, চারণভূমি আর দূরে আল্পসের রেখা। জুগে একটা লেকের পাশে কিছুক্ষণ কাটিয়ে রওনা হলাম পিলাটুসের দিকে। উঁচুতে উঠতে উঠতে নিচের পৃথিবী ক্রমশ ছোট হয়ে আসছিল। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে মেঘ, উপত্যকা ও বিস্তৃত পাহাড়শ্রেণির দিকে তাকিয়ে মনে হলো প্রকৃতির বিশালতার সামনে মানুষের সব ব্যস্ততা কত ক্ষুদ্র! দিনের শেষ গন্তব্য লুঞ্জার্ন। পাহাড়ঘেরা শান্ত হ্রদটি দিনের ব্যস্ততার পর যেন এক টুকরা প্রশান্তি এনে দিল। এই এলাকা ফার্মিংয়ের জন্য বিখ্যাত।
পাঁচ দিনে সুইজারল্যান্ডকে পুরোপুরি দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত সফরেও কিছু বিষয় বারবার চোখে পড়েছে—পরিচ্ছন্নতা, সময়ের মূল্য, নিয়ম মেনে চলা এবং পরিকল্পিত অবকাঠামো। এখানে পাহাড় আছে, কিন্তু পাহাড়কে অযথা বদলে দেওয়া হয়নি। হ্রদ আছে, কিন্তু তার চারপাশের পরিবেশকে অবহেলা করা হয়নি।
১৬ সেপ্টেম্বর পৌঁছালাম ইন্টারলেকেনে। নামের মতোই দুটি হ্রদের মাঝখানে গড়ে ওঠা এই শহর। Istelwald হ্রদের ধারে ছোট্ট এই জনপদটি শান্ত, নিরিবিলি এবং অত্যন্ত মনোরম গ্রাম। সেদিন বৃষ্টি আমাদের পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন এনেছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের সৌন্দর্য কমেনি; বরং মেঘে ঢাকা পাহাড়, ভেজা রাস্তা আর হ্রদের ওপর ধূসর আকাশ দৃশ্যপটকে দিয়েছে অন্য রকম আবহ। আর এই বৃষ্টির জন্য ভ্রমণ কিছুটা সংক্ষিপ্ত করতে হলো। গ্রিন্ডেলওয়াল্ড গেলেও বৃষ্টির জন্য অসমাপ্ত রেখে ফিরতে হলো হোটেলে, যা ছিল সমতল থেকে অনেক উঁচুতে। হোটেলের সঙ্গেই ছিল গরুর খামার। রুমে জানালা খুললেই গরুর খামার দেখা যায়। লক্ষণীয় হলো এখানে গরুর গলায় বিশাল গোলাকৃতির ঘণ্টা ঝুলানো হয়। গরু ঘাস খাওয়ার সময় ঢং ঢং শব্দ হয়। বৃষ্টির মাঝে সেই শব্দ শুনতে ভালোই লাগল।
১৭ সেপ্টেম্বর লাউটারব্রুনেন। যেন পাহাড়ের বুকের মধ্যে তৈরি একটি প্রাকৃতিক মঞ্চ। দুই পাশে উঁচু পাথুরে পাহাড়, মাঝখানে সবুজ উপত্যকা আর পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা জলধারা। এর মধ্যে Staubbach Falls বিশেষভাবে চোখে পড়ে। দূর থেকে জলপ্রপাতটিকে দেখে মনে হয় পাহাড়ের বুক থেকে একটি সাদা রেখা নেমে এসেছে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এরপর মুরেন। মুরেনে যেতে চাপতে হলো কেব্ল কারে লাউটারব্রুনেন থেকে। প্রায় দেড় কিলোমিটার পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা। তারপর পাহাড়ের উপরে আরেকটি ট্রেন ধরে মুরেন যাত্রা আরও সাড়ে চার কিলোমিটারের মতো। যাত্রাটা ছিল একেবারে শাহরুখ খানের ছাইয়্যা ছাইয়্যা গানের মতোই অবস্থা। এই জনপদে পৌঁছানোর পর মনে হলো, শহর এখানে প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি; বরং প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে। পথের বাঁকে বাঁকে কখনো মেঘের আড়ালে পাহাড়, কখনো সবুজ ঢাল, কখনো দূরের তুষারশৃঙ্গ—সুইজারল্যান্ডের সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এটাই। এখান থেকে সোজা চলে গেলাম সারনেন নামের গ্রামীণ এলাকার একটা হোটেলে।
১৮ সেপ্টেম্বর জুরিখ শহর ও চিড়িয়াখানায় সময় পার করলাম। আমাদের রাজকন্যার কাছে সম্ভবত এটিই ছিল সবচেয়ে আনন্দের জায়গাগুলোর একটি। তার কাছে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকানো, বৃষ্টিতে গাড়ির পেছনের ওয়াইপারের দিকে তাকিয়ে থাকা, অচেনা মানুষ দেখা, নতুন জায়গায় হাঁটা সবকিছুতেই তার কৌতূহল। বড়দের চোখে সুইজারল্যান্ডের গল্প হয়তো পাহাড়, হ্রদ ও সুন্দর শহরকে ঘিরে। কিন্তু আমাদের ছোট্ট রাজকন্যার কাছে দেশটির গল্প ছিল কিছুটা ভিন্ন। তার সবচেয়ে পছন্দের জায়গাগুলোর একটি ছিল বড় দোকানগুলো। যেখানে ঢুকলেই তার চোখে যেন নতুন পৃথিবী খুলে যেত। রঙিন প্যাকেট, তৈজসপত্র, খেলনা ও নানা ধরনের ছোট ছোট জিনিস তার কাছে একেকটি আবিষ্কার। একটি হাতে নিয়ে দেখছে, আরেকটির দিকে তাকাচ্ছে—দোকানের তাকগুলো যেন তার জন্য ছোট্ট এক খেলনার জগৎ। আবার বাইরে সে খালি পায়ে হাঁটত। প্রকৃতিকে সে হয়তো আমাদের মতো করে দেখেনি, কিন্তু নিজের মতো করে উপভোগ করেছে। মানে একটি দেশের সৌন্দর্য সবার চোখে এক রকম নয়। আমাদের কাছে আল্পস, তার কাছে হয়তো দোকানের একটি রঙিন তাক কিংবা ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটা।
পাঁচ দিনে সুইজারল্যান্ডকে পুরোপুরি দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত সফরেও কিছু বিষয় বারবার চোখে পড়েছে পরিচ্ছন্নতা, সময়ের মূল্য, নিয়ম মেনে চলা এবং পরিকল্পিত অবকাঠামো। এখানে পাহাড় আছে, কিন্তু পাহাড়কে অযথা বদলে দেওয়া হয়নি। হ্রদ আছে, কিন্তু তার চারপাশের পরিবেশকে অবহেলা করা হয়নি। পর্যটন আছে, কিন্তু প্রকৃতির ওপর তার চাপ কম রাখার চেষ্টা স্পষ্ট। সৌন্দর্য শুধু প্রকৃতির দান নয়; সেটিকে ধরে রাখার জন্য মানুষের দায়িত্ববোধও প্রয়োজন— সুইজারল্যান্ড সেই কথাটিই যেন নীরবে মনে করিয়ে দেয়। ফেরার সময় পেছনে পড়ে থাকল ৩,০০০ কিলোমিটারের বেশি পথের ড্রাইভিং, অসংখ্য পাহাড়ি বাঁক, ফিরোজা রঙের হ্রদ, বৃষ্টিভেজা রাস্তা, গরুর ঘণ্টার ঢং ঢং শব্দ, ভাদুজের স্মৃতি এবং রাজকন্যার অসংখ্য কৌতূহলী মুহূর্ত। সর্বশেষ সুরা আর-রাহমানের সেই আয়াত: ‘অতএব, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?’
*লেখক: কফিল উদ্দিন আহমদ, [email protected]