ব্যাংক বাঁচানোর ‘জরিমানা’ জনগণ দেবে, বিনিময়ে কী পাবে

· Prothom Alo

ব্যাংক খাতের অর্থ লুটপাটের দায় থেকে রেহাই পাবে না কোনো সরকারই। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে কারোরই তুলনা করা যাচ্ছে না। তখন সব ধরনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লুটপাট হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে চরম ব্যর্থ ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সে সময়ের সরকারের চাওয়া মেনে লুটপাটের সব ধরনের অনুমোদন দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এর ফলে দেশে এখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এই মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশই দেশের মাত্র ১০টি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। সব মিলিয়ে বিশ্বে এখন সর্বোচ্চ ঋণখেলাপির দেশ আমরা। এর দায় অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের।

Visit sportnewz.click for more information.

সেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এখন বলছেন, জনগণের অর্থ লুটপাট হয়েছে, আর সেই লুটপাটের টাকা জনগণকেই দিতে হবে। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের ভাষায়, জনগণকে জরিমানা দিতে হবে। এই জরিমানার একটি হিসাবও দিয়েছেন তিনি। অঙ্কটি বেশ বড়। গত শনিবার এক অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছেন, প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে ধসে পড়া ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে। আর এই অর্থ দিতে হবে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর ধরে।

পাঁচ বছর ধরে দিলে মোট ব্যয় হবে ৩ লাখ কোটি টাকা, আর আট বছর হলে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এখন যদি আমরা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে প্রতিবছরে দিতে হবে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ অর্থ।

বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর অবশ্য একটা তুলনামূলক হিসাবও দিয়েছেন। যেমন ৬০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে বছরে দুই কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা করা সম্ভব বা দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত।

আমরা কেন জরিমানা দেব

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা ধরে হিসাব করলে মাথাপিছু জরিমানার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৪৩২ টাকা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণের করের টাকা না নিলে এই অর্থ কি কোনো দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ হিসাবে পাবে? পাবে না। কারণ, এখন কোনো দাতা সংস্থাই লুটপাট হওয়া ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটাতে ঋণ দেবে না।

আমরা জানি, বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য বিশ্বব্যাংকের একটি ঋণ কর্মসূচি চালু আছে। ৪৫ কোটি ডলারের এই কর্মসূচির আওতায় আছে আমানত সুরক্ষা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক পুনর্গঠনের প্রস্তুতি। অর্থাৎ ক্ষতি কাটানোর কোনো অর্থ বিশ্বব্যাংক দিচ্ছে না। সুতরাং একমাত্র ভরসা দেশের জনগণের করের টাকা।

মনে রাখা দরকার, কোনো দাতাই কিন্তু শর্ত ছাড়া ঋণ দেয় না। বিশ্বব্যাংকের কাছে যে অর্থ পাচ্ছে, তাতেও অনেক শর্ত জুড়ে দেওয়া আছে। দাতারা যদি ঋণ দেওয়ার সময় শর্ত জুড়ে দেয়, তাহলে জনগণ কেন শর্ত ছাড়া জরিমানার নামে নিজের করের টাকা দেবে?

সুতরাং প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কেন জরিমানা দেব। আর এর বিনিময়ে আমরা কী পাব?

সরকারের সদিচ্ছা আছে কতটা

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যাংক খাত ঠিক করতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা আসলে কতটা আছে? এ নিয়ে সন্দেহ করার কিছু কারণ তো অবশ্যই আছে।

যেমন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ৯ মে ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ওই অধ্যাদেশে ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ ছিল না। কিন্তু বিএনপি সরকার এসে সংসদে যে আইনটি পাস করে, তাতে নতুন একটি ধারা যুক্ত করে। সেখানে ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের আবার মালিকানা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। সমালোচনা ছিল নির্দিষ্ট একজন বিতর্কিত ব্যবসায়ীকে ফেরাতেই এই ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হলে শেষ পর্যন্ত ধারাটি বাতিল করা হয়। দাতারাও আপত্তি তুলেছিল।

বিগত সরকারের সময়ে অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল বেসরকারি ব্যাংকের পরিবারতন্ত্র কায়েম। আগের সরকার এটি করেছিল লুটপাটের সুযোগ দেওয়ার জন্যই। সবারই প্রত্যাশা ব্যাংক খাতে আর পরিবারতন্ত্র কায়েম হবে না। আর এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তাব দিয়েছিল যে একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা তিনজন থেকে কমিয়ে দুজন করা হবে এবং পরিচালক থাকার সর্বোচ্চ মেয়াদ টানা ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৬ বছর করা হবে। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) দুটি প্রস্তাবই বাতিল করে দিয়েছে। তারা একজন পরিচালকের টানা মেয়াদের সীমা ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৯ বছর এবং একই পরিবার থেকে সর্বোচ্চ তিনজন পরিচালক রাখার বর্তমান নিয়ম অপরিবর্তিত রাখার কথা বলেছে।

* ব্যাংক খাতে ৫-৮ বছরে লাগতে পারে ৩ থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।* সম্ভাব্য ব্যয় মাথাপিছু প্রায় ৩ হাজার ৪৩২ টাকা।* পরিবারতন্ত্র কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ভিন্ন অবস্থানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন উঠেছে।* মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইডেনের অভিজ্ঞতায় একীভূতকরণের পাশাপাশি ছিল ঋণ পুনর্গঠন, মূলধন জোগান ও জবাবদিহি।* করদাতার অর্থ ব্যয়ের আগে সংস্কার, অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতি ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

অতীতেও দেখা গেছে, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার জন্যই সরকার ব্যাংক খাত তদারকের নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে টিকিয়ে রাখে। এখনো তা দেখা যাচ্ছে। যদিও নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি আর্থিক খাত সংস্কারে একটি কমিশন গঠন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার কথা বলেছিল। নির্বাচিত হওয়ার পরে এ দুই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার বড় প্রমাণ।

এ ক্ষেত্রে ২০১৯ সালে আইএমএফের তৈরি একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করতে চাই। যদিও ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর স্ট্যাবিলিটি রিভিউ’ নামের সেই প্রতিবেদনটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পছন্দ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। সেই প্রতিবেদনে আইএমএফ বলেছিল, ‘সমাজের একটি অংশের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করার গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রবণতা রয়েছে। কিছু প্রভাবশালী ও ধনী ব্যবসায়ীরা বুঝে গেছেন যে তাঁদের ঋণ পরিশোধে বাধ্য করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা দেশে নেই। বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। পরিস্থিতি এমনই যে মাত্র তিনজন বড় ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলেই একটি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।’ এখন আবারও সেই ব্যবস্থা যদি ফিরে আসে, তাহলে জনগণের জরিমানা দেওয়া পুরোটাই বিফলে যাবে।

ঋণ ফেরত পাওয়ার কী ব্যবস্থা

সরকারি হিসাবে, দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের জন্য দেশে-বিদেশে থাকা প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ, ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে দেশে রয়েছে ৫৭ হাজার ৩২৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকার সম্পদ। বিদেশে থাকা সম্পদের মূল্য ১৯ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা।

আমরা জানি বিদেশে থাকা সম্পদ ফেরত আনা সহজ নয়। এ জন্য নানা ধরনের আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। তবে জব্দ হওয়া সম্পদ দেশেই বেশি। এগুলো উদ্ধার করলেও তো ব্যাংক খাত খানিকটা স্বস্তি পেত। এ জন্য কেবল টাস্কফোর্স গঠনের কথা বললেই জরিমানা দেওয়া জনগণ আশ্বস্ত হবে না। দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চাইবে সবাই।

কেবল ক্ষতি কাটালেই ব্যাংক সবল হয় না

বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠন করেছে। এটি সফল হবে কি না, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। তবে কেবল একীভূত করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না।

দুর্বল ব্যাংক খাত কীভাবে ঠিক করতে হয়, তার উদাহরণ হচ্ছে মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ আরও কিছু দেশ। ১৯৯৭ সালের আর্থিক সংকটে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ব্যাংক খাত ধ্বংসের মুখে চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে আসার গল্প বাংলাদেশের জন্য বড় উদাহরণ হতে পারে।

এশীয় আর্থিক সংকটের পর মালয়েশিয়া খেলাপি ঋণ কিনে ব্যবস্থাপনার জন্য দানাহার্তা, ব্যাংকে মূলধন জোগানোর জন্য দানামোদাল এবং বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের দেনা পুনর্গঠনের জন্য করপোরেট ঋণ পুনর্গঠন কমিটি গঠন করে। একই সময়ে দেশটির ব্যাংক খাত একীভূত করে ৫১টি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানকে ১০টি ব্যাংকিং গ্রুপে আনা হয়। অর্থাৎ শুধু খারাপ ঋণ সরানো হয়নি, ব্যাংকের মূলধন ও কাঠামোও বদলানো হয়েছিল।

সংকটের সময় দক্ষিণ কোরিয়া কয়েকটি অদক্ষ ব্যাংক বন্ধ করে দেয়। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিনে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় কোরিয়া অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশনকে। আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সরকার সাময়িকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতের নিশ্চয়তা দেয়।

এর আগে ১৯৯০-এর দশকের ব্যাংক সংকটে সুইডেন একটি বিশেষ ব্যাংক সহায়তা কর্তৃপক্ষ গঠন করেছিল। সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা যাচাই করে যেগুলোকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব, সেগুলোতে মূলধন জোগানো হয়। যেগুলোকে বাঁচানো সম্ভব ছিল না, সেগুলো সরকার নিয়ন্ত্রণে নেয়। খেলাপি সম্পদ সামলাতে ‘সেকুরাম’ ও ‘রেত্রিভা’ নামে আলাদা সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানও গড়া হয়। সরকার ব্যাংক খাতের অবস্থা ও সহায়তার তথ্য প্রকাশ করায় জবাবদিহিও ছিল এই কর্মসূচির অংশ।

জনগণেরও শর্ত আছে

দাতাদের কাছ থেকে ঋণ নিলে সেই অর্থ ব্যবহারের শর্ত পূরণ করতে হয়, অগ্রগতির হিসাবও দিতে হয়। ব্যাংক বাঁচাতে সাধারণ মানুষের করের টাকা ব্যবহার করলেও একইভাবে শর্ত পূরণ করতে হবে। স্পষ্ট করতে হবে যে এই অর্থের বিনিময়ে কী সংস্কার হবে, কী ফল মিলবে এবং ব্যর্থ হলে দায় কার, আর পূর্বের সংকটের জন্য কে কী শাস্তি পেল। ব্যাংক পুনরুদ্ধারে অর্থ প্রয়োজন, কিন্তু সেই অর্থের বিনিময়ে ব্যাংক খাত কতটা বদলাবে, সেটিও দেখাতে হবে।

Read full story at source