উত্তাল ফ্রান্স, কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি

· Prothom Alo

দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি সেবার অবনতি এবং আবাসনসংকট ঘিরে ইউরোপের কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ চলছে। সবচেয়ে বেশি সহিংসতার পর ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের লিলসহ চার শহরে গতকাল সোমবার রাত আটটা থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত এবং আজ রাত আটটা থেকে কাল বুধবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত আংশিক কারফিউ জারি করেছে সরকার।

গত শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এদিন অনেক জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি হলেও পরে তা সহিংস হয়ে ওঠে। সরকারি ভবনে আগুন, দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। রাস্তাজুড়ে ধিকিধিকি আগুনের ধোঁয়া ও ভাঙা কাচ ছড়িয়ে–ছিটিয়ে ছিল।

Visit freshyourfeel.org for more information.

ফ্রান্সে শনিবারের বিক্ষোভ থেকে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় এক হাজার নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পুলিশের একটি ভিড় নিয়ন্ত্রণকারী গ্রেনেডে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ-সহিংসতার পর প্যারিসের ‘প্লাস দ্য লা রিপাবলিক’ চত্বরে জড়ো হন বিক্ষোভকারীরা। এ সময় এক বিক্ষোভকারীকে কাঁদানে গ্যাসের শেল লাথি দিয়ে সরিয়ে দিতে দেখা যায়। ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। বাণিজ্য সংগঠনের হিসাবে, ক্ষয়ক্ষতি কয়েক শ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শুধু রাজধানী প্যারিসেই তিন শ থেকে চার শ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়। শহরের অভিজাত দোকানগুলোর দরজা ও জানালার কাচও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইতালির মিলানেও শনিবার ও রোববার পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। অন্যদিকে স্পেন ও পর্তুগালে বাড়িভাড়ার চাপ ও আবাসনসংকটের প্রতিবাদে মানুষ তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন। বেলজিয়াম ও আলবেনিয়াতেও বিক্ষোভ সহিংস হয়েছে। এখানে দেশভেদে দাবি আলাদা হলেও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ অনেক আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে।

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভের পরদিন প্যারিসে ম্যাকডোনাল্ডসের একটি ক্ষতিগ্রস্ত রেস্তোরাঁর সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন মানুষ। ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সের চার শহরে কারফিউ

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর কার্যালয়ের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলের চার শহরে দুই রাতের জন্য আংশিক কারফিউ থাকবে। এর একটি লিল। স্থানীয় সময় রাত আটটা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত বিধিনিষেধের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে রাজধানী প্যারিসজুড়ে একসঙ্গে কারফিউ জারির সম্ভাবনা নাকচ করেছেন লেকর্নু।

জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় দাঙ্গা ও লুটপাটের দুদিন পর প্যারিসে আন্তমন্ত্রণালয় জরুরি বৈঠকে বসেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা নুনেজ ও প্রধানমন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ ফিলিপ গুস্তিন। ১৯ অক্টোবর ২০২৬

গতকাল মন্ত্রীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমি পুরোপুরি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন হলে জরুরি অবস্থা জারি করা যেতে পারে বলেও জানান তিনি।

মার্সেই শহরে গতকাল দুপুর থেকে রাত আটটা পর্যন্ত জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এটি কারফিউ নয়, সমাবেশের ওপর আলাদা নিষেধাজ্ঞা। উত্তরাঞ্চলের দেনাঁ শহরেও আগে কারফিউ ঘোষণা করে পরে নির্দিষ্ট এলাকায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সীমিত করা হয়েছিল।

ফ্রান্সে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শিক্ষকসংকট ও স্কুলের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ অন্যরাও যোগ দেন। মার্চের পর দেশটিতে ডিজেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ এবং পেট্রলের দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে।

শনিবারের সহিংসতা মোকাবিলায় প্রায় ৬০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। তবু প্যারিস, মার্সেই ও লিওঁর মেয়ররা নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে সরকারের কাছে জবাব চেয়েছেন। ফরাসি দৈনিক লিবারাসিওঁতে গতকাল প্রকাশিত এক যৌথ লেখায় তাঁরা লেখেন, ‘শনিবার প্রথমবারের মতো আমাদের মনে হয়েছে, আমাদের শহরগুলোর বিস্তীর্ণ অংশ কোনো সুরক্ষা ছাড়াই ফেলে রাখা হয়েছে।’

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ পদত্যাগ করতে চাইলেও প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ তা গ্রহণ করেননি। গত রোববার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানান। তিনি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের আলাদা করে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন। নিজ দেশে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল সোমবার জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কুয়েত সফরের মধ্য দিয়ে তিন দিনের উপসাগরীয় সফর শুরু করেন মাখোঁ। তাঁর সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কাতারও রয়েছে।

লুটের পণ্য বিক্রি ঠেকাতে উদ্যোগ

ফ্রান্সের ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী আন ল্য হেনানফ গতকাল অভিযোগ করেন, সপ্তাহান্তে লুট হওয়া পণ্য অনলাইনের কয়েকটি প্ল্যাটফর্মে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। এসব বিজ্ঞাপন দ্রুত সরানোর আহ্বান জানান তিনি। ভিনটেড, অ্যামাজন, ইবে, লেবনকোয়াঁ, মেটা ও টিকটকের প্রতিনিধিদের আলোচনায় ডাকা হয়।

ভিনটেড জানিয়েছে, সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন সরাতে তারা কাজ করছে। ইবে বলেছে, লুটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন বেড়েছে কি না, তারা নিশ্চিত করতে পারছে না। মন্ত্রী বলেছেন, চোরাই পণ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে।

গতকাল বিক্ষোভকারীরা প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘরের প্রবেশপথ আটকে দেন। দীর্ঘ উড়োজাহাজযাত্রা শেষে এসে জাদুঘর বন্ধ পান অস্ট্রেলীয় পর্যটক অ্যান বোল্যান্ড। অন্য পর্যটকদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, ‘বাড়িতেই থাকুন!’

ফ্রান্সে নেদারল্যান্ডসের পর্যটক পিটার বলেন, শহরের রাস্তায় আগুনে পোড়া আবর্জনা ও ভাঙা কাচ দেখে তাঁর মনে হয়েছে, তিনি যেন ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ ঘুরছেন। গাড়ি চলাচল আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় বিশেষ সতর্ক করছেন ট্যাক্সিচালকেরা। ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলন আগামী শনিবার আবার বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

ইতালিতে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার

সরকারি পরিষেবা খাতের বেহাল ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইতালির মিলান শহরে বিক্ষোভ হয়। এ সময় ইটপাটকেল ও আবর্জনায় ভরা রাস্তা দিয়ে বিক্ষোভকারীদের দৌড়াতে দেখা যায়। ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ইতালির মিলান, বোলোনিয়া, ব্রেশিয়া, বেরগামো ও তুরিনে শনিবার বিক্ষোভ হয়। রোববার মিলানে মুখোশধারীরা রাস্তায় আগুন ধরান, দোকানে লুটপাট চালান। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। গতকাল রয়টার্স জানায়, রোববার মিলানে ২৭১ জনকে থানায় নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও ২৮ জনের বিষয়ে বিচারিক কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এর আগে শনিবার উত্তরাঞ্চলের শহরগুলোয় গ্রেপ্তার হন ২৮ জন।

প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে গতকাল সরকারি বৈঠক ডাকেন। তিনি বলেছেন, বিক্ষোভ করার অধিকার আছে, কিন্তু শহরে আগুন লাগানোর অধিকার নেই।

পর্তুগালে আবাসনসংকট

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে বিক্ষোভকারীরা

পর্তুগালে শনিবার রাজধানী লিসবনের রসিও চত্বরে শত শত মানুষ তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নেন। পোর্তো শহরেও এমন কর্মসূচি হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানকে সমাজকর্মী এলেনা কস্তা বলেন, ‘আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে বাসস্থানের অধিকার। আমরা যেন দমবন্ধ অবস্থায় আছি।’

সরকারি হিসাবে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রো মানুষের ক্ষোভের কথা বুঝতে পারার কথা জানালেও অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।

স্পেনে বাড়িভাড়া নিয়ে আন্দোলন

উচ্ছেদ বন্ধ এবং আবাসনসংকট নিরসনে রাজনৈতিক পদক্ষেপের দাবিতে স্পেনের মাদ্রিদে বিক্ষোভ করছেন বিক্ষোভকারীরা। ৩ অক্টোবর ২০২৬

স্পেনে সেপ্টেম্বরে ৮৭ বছর বয়সী মারিয়া দেল কারমেন আবাসকালকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ ঘিরে আন্দোলন ছড়ায়। নতুন মালিক ভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়াতে চেয়েছিলেন। পরে ওই নারীর মৃত্যু হয়। মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সোল চত্বরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান চলছে। ভাড়াটেদের সুরক্ষার উদ্যোগ পার্লামেন্টে আটকে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন।

বেলজিয়ামে বিক্ষোভ

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকালে পুলিশের দিকে চেয়ার ছুড়ে মারছেন এক বিক্ষোভকারী। ১৭ অক্টোবর ২০২৬

বেলজিয়ামের ব্রাসেলস ও লিয়েজে শিক্ষার ব্যয় এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়। ব্রাসেলসে সংঘর্ষের সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।

আলবেনিয়াতেও সহিংস বিক্ষোভ

আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ার মধ্যে সতর্ক অবস্থানে দেখা যায় দাঙ্গা পুলিশকে। ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আলবেনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, উচ্চ টিউশন ফি ও সরকারবিরোধী ক্ষোভ থেকে বিক্ষোভ চলছে। শনিবার রাজধানী তিরানায় বিক্ষোভকারীরা পাথর ও পেট্রলবোমা ছোড়েন, গাড়ি ও ময়লার পাত্রে আগুন দেন। পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ চাইছেন।

অন্যদিকে ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ নিজেদের নাগরিকদের বড় জমায়েত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহিংসতার নিন্দা করলেও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।

Read full story at source