মাটির ভাস্কর, মানুষের শিল্পী

· Prothom Alo

কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের পরিচয় কোনো স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। নিজের জীবনই হয়ে ওঠে তাঁদের ‘পরিচয়পত্র’। তাঁরা নিজেদের কথা খুব বেশি বলেন না; তাঁদের হয়ে কথা বলে তাঁদের সৃষ্টি। তেমনই এক মানুষ হরিপদ পাল। তিনি মূলত একজন প্রতিমাশিল্পী।

হরিপদ পালকে নিয়ে গল্পটি আসলে মাটির গল্প। সেই মাটির—যেখান থেকে মানুষ জন্ম নেয়, স্বপ্ন গড়ে, আবার একদিন ফিরে যায়। তিনি নিজেই বলেন, ‘মাটিকে অস্বীকার করলে স্রষ্টাকে অস্বীকার করা হয়।’ এই বিশ্বাসই তাঁর শিল্পীজীবনের কেন্দ্রবিন্দু।

Visit forestarrow.help for more information.

ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার কুড়লিয়া গ্রামে হরিপদ পালের জন্ম। গ্রামবাংলার মাটি, মানুষ আর লোক-ঐতিহ্যই পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পভাবনার ভিত্তি হয়ে ওঠে। বড় হয়েছেন এক শিল্পী পরিবারে। তিন ভাই, চার বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। লেখাপড়া করেছেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত; কিন্তু তাঁর প্রকৃত বিদ্যালয় ছিল শিল্পের কর্মশালা; আর তাঁর প্রথম শিক্ষক ছিলেন তাঁর দাদু ও বাবা।

সম্প্রতি শাঁখারীবাজারে আলাপ হলো প্রবীণ এই প্রতিমাশিল্পীর সঙ্গে। শোনালেন তাঁর জীবনের আরও কিছু কথা।

শৈশবের একটি দৃশ্য আজও হরিপদ পালের মনে গেঁথে আছে। একদিন দাদু হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছিলেন। যন্ত্রণাভরা সেই মুখখানি দেখে ছোট্ট হরিপদর মনে হয়েছিল, এই মুখটাকে যদি ধরে রাখা যেত! যদি মাটির ভেতর সেই অনুভূতি বন্দী করা যেত! সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন।

প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তিনি দাদুর পাশে বসে প্রতিমা গড়ার কাজ দেখতেন। বাবা হয়তো চাইতেন, ছেলে লেখাপড়া করে অন্য পেশায় যাক; কিন্তু দাদু তাঁকে ডাকতেন, ‘আয়, কাজ করি।’ সেই ডাকে সাড়া দিতে দিতেই মাটির সঙ্গে তাঁর আজীবনের বন্ধন গড়ে ওঠে।

কৈশোরে ঢাকায় আসেন হরিপদ পাল। লোকশিল্প নিয়ে কাজ করেন। বুলবুল ললিতকলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হন। আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও শিল্পের প্রতি তাঁর তৃষ্ণা ছিল অসীম। শিল্পকলার শিক্ষক, শিল্পী, ভাস্কর—যাঁদের সান্নিধ্য পেয়েছেন, সবার কাছ থেকেই শিখেছেন। বিশেষ করে শিল্পী মরণচাঁদ পালের সান্নিধ্য তাঁর শিল্পীজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

একসময় হরিপদ পাল পাড়ি জমান কলকাতার বিখ্যাত কুমারটুলীতে। সেখানে দীর্ঘ সময় কাজ করেন। মাটির বৈশিষ্ট্য, প্রতিমার গড়ন, অঙ্গসৌষ্ঠব, মুখের সৌন্দর্য সৃষ্টিতে বিশিষ্টতা অর্জন করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। তারপর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতেই গড়ে তুলেছেন তাঁর দীর্ঘ শিল্পযাত্রা।

মাটির সঙ্গে আজীবনের বন্ধন

বহু বছর ধরে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে হরিপদ পালের প্রতিষ্ঠান যেন এক নীরব শিল্পতীর্থ। সেখানেই বছরের পর বছর ধরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য প্রতিমা, ভাস্কর্য, মডেল ও শিল্পকর্ম। জাতীয় জাদুঘর থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মন্দির, প্রদর্শনী এবং সরকারি প্রকল্পে ছড়িয়ে আছে তাঁর সৃষ্টির ছাপ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য তৈরি করেছেন অসংখ্য মডেল ও ভাস্কর্য।

হরিপদ পালের জীবনে কষ্টও কম আসেনি। তাঁর বড় মেয়ে নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। করোনাকালে হারিয়েছেন একমাত্র ছেলেকে। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ স্ত্রীকে নিজ হাতে রান্না করে খাওয়ান, সেবা করেন। দিনের পর দিন রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করে বাড়ি ফিরে সংসারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তারপর গভীর রাতে ঘুমাতে যান; কিন্তু কখনো অভিযোগ করেন না; বরং বলেন, ‘যতক্ষণ আমি কাজে থাকি, ততক্ষণই আমার আনন্দ।’

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিমা গড়ছেন প্রতিমাশিল্পী হরিপদ পাল

অর্থ হরিপদ পালের কাছে কখনো বড় হয়ে ওঠেনি। সম্মান, সততা ও আত্মমর্যাদাই ছিল তাঁর জীবনের মূলধন। বাবার কাছ থেকে তিনি শিখেছেন, ‘ঠকতে পারো; কিন্তু কাউকে ঠকাবে না।’ সেই শিক্ষাই তিনি আজীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন।

হরিপদ পাল আসলে সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁরা শিল্পকে পেশা নয়, সাধনা হিসেবে বেছে নেন। কখনো কোনো স্বীকৃতির মোহ না থাকা এই শিল্পীকে এ বছর আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ। পুরস্কার গ্রহণ করে আবেগাপ্লুত হরিপদ পাল আয়োজকদের প্রতি বিনয়ের সঙ্গে বলেন, ‘আপনারা কৃপা করে আমাকে যে সম্মানিত করলেন, তাতে আমি খুবই আনন্দিত। মনের আনন্দেই সারা জীবন কাজ করেছি। প্রার্থনা করি, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যেন কাজ করে যেতে পারি।’

মাটির বুকে মানুষের মুখ গড়তে গড়তেই জীবনের শেষ দিনটি কাটিয়ে দিতে চান সত্তরোর্ধ্ব এই শিল্পী।

Read full story at source