দান–সদকা কোথায় করবেন, কোথায় করবেন না
· Prothom Alo

ইসলামে দান-সদকা শুধু একটি পুণ্যময় কাজই নয়, এটি সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তবে শুধু পকেট থেকে অর্থ বের করে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং কষ্টে উপার্জিত হালাল অর্থ সঠিক স্থানে ও সঠিক পাত্রে প্রদান করাও ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোথায় দান করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি সবচেয়ে বেশি অর্জিত হবে এবং কোথায় দান করা থেকে বিরত থাকা উচিত—এ বিষয়ে কোরআন ও হাদিসতে সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা রয়েছে।
Visit freshyourfeel.com for more information.
সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৫তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে, তারা কী ব্যয় করবে? বলে দিন, তোমরা যে সম্পদই ব্যয় করো না কেন, তা পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য।কোথায় দান করবেন
১. নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার: যেকোনো দানে সবচেয়ে বেশি হকদার হলেন অভাবী নিকটাত্মীয়রা। এতে দান ও আত্মীয়তা রক্ষা—উভয় পুণ্য অর্জিত হয়।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে, তারা কী ব্যয় করবে? বলে দিন, তোমরা যে সম্পদই ব্যয় করো না কেন, তা পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৫)
মহানবী (সা.) বলেছেন, সাধারণ গরিবকে দান করলে শুধু দানের সওয়াব মেলে, আর আত্মীয়কে দান করলে দুটি সওয়াব মেলে—দান এবং আত্মীয়তা রক্ষা। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২৫৮২)
দান-সদকায় নিজের সম্পদের কতটা ব্যয় করা যাবে২. আত্মমর্যাদাশীল অভাবী: সমাজের এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিদারুণ অভাবের মধ্যে দিন কাটালেও আত্মসম্মানের ভয়ে কারও কাছে হাত পাতেন না। কোরআনে এ ধরনের মানুষদের খুঁজে বের করে সাহায্য করার বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি বিধবা, এতিম ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের দান করা সর্বোচ্চ সওয়াবের কাজ।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘বিধবা ও মিসকিনদের অভাব মোচনে চেষ্টাকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদ অথবা ওই ব্যক্তির মতো, যে দিনে রোজা রাখে এবং রাতে ইবাদত করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫৩)
মুমিনের উচিত এমন কল্যাণমূলক খাতে তার সম্পদ ব্যয় করা, যা শুধু সাময়িক অভাবই মেটায় না, বরং সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত করে এবং দাতার মৃত্যুর পরও যার ফলপ্রসূ প্রভাব অব্যাহত থাকে।
৩. স্থায়ী জনকল্যাণমূলক খাত: এমন কোনো খাতে দান করা, যার উপকারিতা দীর্ঘস্থায়ী, ইসলামে একে ‘সাদাকায়ে জারিয়া’ বলা হয়। মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা বা জনকল্যাণমূলক চিকিৎসালয়ে দান করলে মৃত্যুর পরও এর সওয়াব আমলনামায় যুক্ত হতে থাকে।
ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি উল্লেখ করেছেন, মুমিনের উচিত এমন কল্যাণমূলক খাতে তার সম্পদ ব্যয় করা, যা শুধু সাময়িক অভাবই মেটায় না, বরং সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত করে এবং দাতার মৃত্যুর পরও যার ফলপ্রসূ প্রভাব অব্যাহত থাকে। (আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, ৬/২২৫, দারুল হিজর, কায়রো, ১৯৯২)
দান-সদকার ভুয়া লিংক থেকে সাবধানকোথায় দান করবেন না
১. পেশাদার ভিক্ষুক: ইসলামে কর্মক্ষম মানুষের ভিক্ষাবৃত্তিকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। যারা পেশা হিসেবে ভিক্ষাকে বেছে নিয়েছে এবং মানুষের আবেগ নিয়ে প্রতারণা করে, তাদের দান করা অনুচিত; কারণ এতে পরোক্ষভাবে একটি সামাজিক ব্যাধিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অভাব না থাকা সত্ত্বেও মানুষের কাছে হাত পাতে, সে মূলত আগুনের অঙ্গার ভক্ষণ করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৪১)
ইমাম নববি এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, যারা সুস্থ ও কর্মক্ষম হওয়া সত্ত্বেও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে মানুষের কাছে সম্পদ প্রার্থনা করে, তাদের দান করা মাকরুহ বা অপছন্দনীয়।
দাতার উচিত আবেগতাড়িত না হয়ে প্রকৃত অভাবী ও আত্মমর্যাদাশীল দারিদ্র্যপীড়িত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে সাহায্য করা। (ইমাম নববি, আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব, ৬/২৩৯, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৭)
সুরা মায়িদা, আয়াত: ২তোমরা সৎকর্ম ও খোদাভীতির কাজে একে অপরকে সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরের সাহায্য কোরো না।২. পাপের কাজে সহায়ক খাত: এমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দান করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যা ইসলামবিরোধী কাজ, নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন বা কোনো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত।
কাউকে দান করার পর সে যদি সেই অর্থ দিয়ে মাদক সেবন করে বা পাপকাজে লিপ্ত হয়, তবে সেই দানে কোনো পুণ্য নেই।
কোরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ হলো, ‘তোমরা সৎকর্ম ও খোদাভীতির কাজে একে অপরকে সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরের সাহায্য কোরো না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)
দানের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও সমাজের প্রকৃত কল্যাণ সাধন। তাই যত্রতত্র দান না করে একটু সময় নিয়ে সঠিক খাতটি নির্বাচন করা একজন মুমিনের প্রজ্ঞার পরিচায়ক।
এতে দানের শতভাগ সুফল যেমন সমাজ পায়, তেমনি দাতার আমলনামাও পরিপূর্ণ সওয়াবে সমৃদ্ধ হয়।
কীভাবে দান করলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর হবে