সাময়িক স্বস্তিকে টেকসই করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ
· Prothom Alo

কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড়ের টাউন হল মাঠ, কেন্দ্রীয় ঈদগাহ কিংবা রেলস্টেশন এলাকা—যেখানে এক মাস আগেও গভীর রাতে বসত মাদকের আসর, চলত মোটরসাইকেলের বিকট মহড়া আর ছিনতাইয়ের ভয়, সেখানে আজ নেমে এসেছে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি। পুলিশ জেলাজুড়ে টানা এক মাস অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংগুলোর আস্তানা ও তৎপরতা বন্ধ করে দিতে সক্ষম হওয়ায় রাতে নির্ভয়ে চলাচল করতে পারছেন সাধারণ মানুষ ও সাধারণ শ্রমজীবীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এ সাময়িক স্বস্তিকে কীভাবে স্থায়ী নিরাপত্তায় রূপ দেওয়া যায়, এখন সেটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কিশোর গ্যাংয়ের দাপট ও অপরাধের বাড়বাড়ন্তের কথা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল; কিন্তু গত সেপ্টেম্বরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের স্কুলপড়ুয়া সন্তানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড আবারও বুঝিয়ে দিয়েছে যে এই অপসংস্কৃতি কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ওই ট্র্যাজেডির পর জনদাবির মুখে জেলাজুড়ে একযোগে চিরুনি অভিযানে নামে পুলিশ। এক মাসে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষকে আটক এবং এক হাজারের বেশি কিশোর অপরাধী ও গ্যাং লিডারকে আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পাশাপশি অনেক কিশোরকে আটক করে অভিভাবকদের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে পুলিশ যেমন কঠোরতার পরিচয় দিয়েছে, তেমনি সামাজিক সংশোধনের একটি সুযোগও তৈরি করেছে।
Visit tr-sport.click for more information.
তবে শুধু পুলিশি অভিযান চালিয়ে রাস্তাঘাট ফাঁকা করলেই কিশোর অপরাধ পুরোপুরি দমন করে ফেলা সম্ভব নয়, যদি না এর পেছনের মূল আশ্রয়দাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের বক্তব্য, কিশোর গ্যাং একা তৈরি হয় না। স্থানীয় রাজনীতি বা অপরাধজগতের একশ্রেণির ‘বড় ভাই’ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের পেশিশক্তি বৃদ্ধি ও কায়েমি স্বার্থ হাসিল করতে অল্প বয়সী কিশোরদের ব্যবহার করে। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্রয় বন্ধ না হলে এবং এ নেপথ্য কারিগরদের আইনের আওতায় না আনলে অভিযান শিথিল হওয়ার পরপরই নতুন নামে আবার এসব গ্যাং মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।
কিশোর অপরাধ দমনে কেবল সাময়িক ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ বা লোকদেখানো অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; পুলিশকে তাদের পেশাদারত্ব ও নজরদারির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাং কালচার ও মাদকের ছোবল থেকে কিশোরদের বাঁচাতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সবচেয়ে জরুরি। সন্তানেরা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কী করছে—অভিভাবকদের সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকদের গ্রেপ্তার, মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধ করা এবং পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই কেবল কুমিল্লাকে সত্যি সত্যি কিশোর গ্যাংমুক্ত একটি নিরাপদ নগরে পরিণত করা সম্ভব। কুমিল্লায় কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সফলতা অন্যান্য জেলায়ও ছড়িয়ে পড়ুক।