পানাউল্লারচর বধ্যভূমি পরিষ্কার করল ভৈরব বন্ধুসভা

· Prothom Alo

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীন দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্য যুদ্ধ চলে দীর্ঘ ৯ মাস, ঝরে অনেক প্রাণ। পাকিস্তানি বাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ চালায় দেশব্যাপী, নির্বিচার হত্যা করে বহু মানুষকে, চালায় গণহত্যা। ভৈরবেও চলে গণহত্যা। শহীদদের স্মৃতিতে পানাউল্লাচরে গড়ে ওঠে বধ্যভূমি। তবে দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বধ্যভূমিটি এখন ধূলিমলিন ও অবহেলিত।

প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পানাউল্লাচরের বধ্যভূমি পরিষ্কার করে দিয়েছেন ভৈরব বন্ধুসভার বন্ধুরা। ‘শহীদের স্মৃতির আঙিনা’ শিরোনামে ২৫ অক্টোবর বিকেলে প্রথম আলো ভৈরব অফিসে বন্ধুরা একত্র হন। নিয়ে আসেন বালতি, ঝাড়ু ও অন্যান্য পরিষ্কারের সামগ্রী। বিকেল চারটা থেকে শুরু হয় বধ্যভূমি পরিষ্কারের কাজ।

Visit newsbetting.club for more information.

ভৈরব বন্ধুসভার একটি ভালো কাজ

বন্ধুদের কেউ ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে পানি আনেন, কেউ ঝাড়ু দেন, কেউ ধুয়েমুছে পরিষ্কার করেন। ঘণ্টাখানেক পর বধ্যভূমি তার পুরোনো রূপ ফিরে পায়। পরিষ্কার করার সময় আগ্রহী অনেকেই দেখতে আসেন, বন্ধুসভার কাজের প্রশংসা করেন। একজন বলল, ‘আপনাদের অনেক ধন্যবাদ জায়গাটি পরিষ্কারের জন্য।’ বধ্যভূমির পাশেই আছে মনচূড়া কফি হাউস। কফি হাউসের কর্ণধার শাহীন কাদীর এসে বন্ধুদের বলেন, ‘সব শেষ করে আমার এখানে খিচুড়ি খেয়ে যাবেন সবাই। আপনাদের এই কাজের জন্য আমার পক্ষ থেকে উপহার।’

বধ্যভূমি গড়ে ওঠার পেছনে গল্প শোনান প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক সুমন মোল্লা। তিনি বলেন, ‘১৪ এপ্রিল ভৈরবে প্রবেশ করে পাকিস্তানি বাহিনী। আকাশে দেখা গেল চারটি জেট বিমান, একাধিক হেলিকপ্টার ও গানশিপ। শুরু হয় নির্বিচার হত্যা, গুলিবর্ষণ আর অগ্নিসংযোগ। প্রাণ বাঁচাতে হাজারখানেক মানুষ জড়ো হন উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের পানাউল্লারচর খেয়াঘাটে। উদ্দেশ্য নৌকাযোগে ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে পার্শ্ববর্তী নরসিংদীর বেলাব উপজেলার ইব্রাহিমপুর গ্রামে আশ্রয় নেওয়া। খেয়াঘাটে হাজারো মানুষের ঢল, কিন্তু খেয়া মাত্র একটি। কেউ সাঁতরে, ছোট শিশুদের কোলে নিয়ে যে যাঁর মতো নদী পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু খেয়া পার হওয়ার আগেই পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে শহীদ হন সাড়ে তিন শ মানুষ। রক্তে ব্রহ্মপুত্রের স্বচ্ছ পানি লাল হয়ে গিয়েছিল। সবকিছু থেমে যাওয়ার পরও পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে আপনজনের লাশ অনেকে নিতে আসেননি। তাঁদের সবাইকে দেওয়া হয় গণকবর। সেই থেকে জায়গাটির নাম পানাউল্লারচর বধ্যভূমি।’

ভৈরব বন্ধুসভার একটি ভালো কাজ

সেদিনের ঘটনা শুনে বন্ধুদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। শেষ বিকেলের রক্তিম সূর্যটা যেন লাল রক্তে রাঙিয়ে দিচ্ছিল চারপাশ। বন্ধুরা প্রতিজ্ঞা করেন, যে ভাষার জন্য আমাদের এত ত্যাগ, সেই ভাষার যেন অবমূল্যায়ন না হয়। পরিষ্কার অভিযান শেষে টাঙানো হয় সচেতন বার্তামূলক কিছু পোস্টার।

এ বিষয়ে সভাপতি জান্নাতুল মিশু বলেন, ‘এখানে এসে মনে হলো জায়গাটি মাদকসেবীদের অভয়ারণ্য। সিগারেটের উচ্ছিষ্ট আর দেশলাইয়ের কাঠিতে ভর্তি ছিল চারপাশ। আমাদের উচিত এই স্মৃতিস্তম্ভকে শ্রদ্ধা করে চারপাশ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখা।’

ভৈরব বন্ধুসভার একটি ভালো কাজ

বন্ধু প্রিয়াংকা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার। আমরা যেন মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা না করি। জায়গাটিতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা দরকার এবং দেখাশোনা করার জন্য একজন কেয়ারটেকার প্রয়োজন।’

কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সভাপতি নাহিদ হোসাইন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাফিস রহমান, পাঠচক্র ও পাঠাগার সম্পাদক মহিমা মেধা, বন্ধু হেপি বেগম, রাকিব হোসেন, রাসেল রাজ, সানজিদা ইসলাম, ইমরান হাসানসহ অনেকে।

মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক, ভৈরব বন্ধুসভা

Read full story at source