‘জায়গাজমিন আইবো–যাইবো, স্বামী–সন্তান তো আর আইবো না’

· Prothom Alo

‘জায়গাজমিন নিয়া কত বছর ধইরা ঝগড়া। আমাগো কতবার মারল, মামলা দিল, জায়গা দখল কইরা নিল। শেষ পর্যন্ত আমার স্বামী-সন্তানরে মাইরা ফালাইলো। জায়গাজমিন কত আইবো-যাইবো, আমার স্বামী-সন্তান তো আর আইবো না।’

Visit rouesnews.click for more information.

১১ মাস বয়সী ছোট্ট মেয়েকে কোলে নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন শিউলি আক্তার (২৫)। মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার দোসরপাড়া এলাকায় প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত গোলাপ হোসেনের (৩২) স্ত্রী তিনি। মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পথে বুধবার রাতে গোলাপের ওপর হামলা হয়। এতে তাঁর চার বছর বয়সী মেয়ে তোয়াবাও মারা যায়।

রাতে বাড়ি ফেরার পথে হামলা, সকালে কাশবনে মেয়ের লাশ, দুপুরে বাবার মৃত্যু
পুলিশ ও স্বজনদের ভাষ্যমতে, বুধবার বিকেলে মেয়ে মেয়েকে নিয়ে রামকৃষ্ণদী গ্রামে বাবার বাড়িতে যান গোলাপ হোসেন। রাতে মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ফেরার পথে পাথরঘাটা ইটভাটা এলাকায় প্রতিপক্ষ সোহরাব হোসেন ও তাঁর লোকজন তাঁদের ওপর হামলা করেন। এতে ছোট্ট মেয়েটি বাবার থেকে আলাদা হয়ে যায়।

নিহত গোলাপ হোসেন সিরাজদিখান উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের রামকৃষ্ণদী গ্রামের জয়নাল আবেদিনের ছেলে। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও মাকে নিয়ে তিনি একই ইউনিয়নের দোসরপাড়া এলাকায় থাকতেন। পেশায় দিনমজুর গোলাপ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

শুক্রবার সকালে দোসরপাড়ায় গোলাপের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বামীর রেখে যাওয়া ছোট্ট দোচালা টিনের ঘরে বসে বিলাপ করছেন শিউলি আক্তার। স্বামী–সন্তানকে হারিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। স্বামী ও ছোট্ট মেয়ের নাম নিয়ে বারবার আহাজারি করছিলেন। স্বজনেরা চেষ্টা করেও তাঁকে শান্ত করতে পারছিলেন না।

নিহত বাবা গোলাপ হোসেন এবং মেয়ে তোয়াবা

শিউলি আক্তার বলেন, ‘আমার মেয়েটার গলা কাইট্টা, চোখ উঠায় ফালাইছে, নদীর পানিতে ডুবাইয়া, আছড়ায়া, কত কষ্ট দিয়া মারছে। আমার স্বামীরে বিষ খাওয়াইছে। পেটে পোচ দিছে। আমার স্বামীও কষ্ট লইয়া মরছে। আমার তো সবকিছু শেষ হইয়া গেছে। আমার বাবা নাই। আমাগো সবাইরে গোলাপ দেইখা রাখত। আমার মা, শাশুড়ি আর ১১ মাসের সন্তান লইয়া কই যামু? কে আমাগো দেখব, কে সংসারের হাল ধরব?’

গোলাপ হোসেন জন্মের পর থেকেই মামার বাড়িতে থাকতেন। বিয়ে করেছিলেন খালাতো বোনকে। তাঁর শ্বশুরবাড়ি ও নানার বাড়ি একই জায়গায়। নানা বাড়ির জমিজমা নিয়ে গোলাপের মামাদের সঙ্গে প্রতিবেশী সোহরাব হোসেনের পরিবারের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে দুই পক্ষ আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলাও করেছে। জমি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে আগেও মারামারির ঘটনা ঘটেছে।

‘পোলাডা আমার আশা-ভরসা ছিল’

আহাজারি করতে করতে গোলাপের মা হাসু বেগম বলেন, ‘গোলাপ আমার একমাত্র সন্তান ছিল। কত কষ্ট কইরা মানুষের জমিনে, স্টোরে (হিমাগারে) কাজ কইরা তাঁরে বড় করছি। পোলাডা আমার আশা-ভরসা ছিল। ভাবছিলাম আমার সুখের দিন আইবো। সুখ তো দেখলাম না, আমার সব শেষ হইয়া গেল।’

এর আগে ২০২৪ সালে প্রতিপক্ষ সোহরাব হোসেনের লোকজন গোলাপকে একাধিকবার মারধর করেছেন এবং মিথ্যা মামলায় জেল খাটিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন স্বজনেরা। গোলাপের মামা-খালাদের টেঁটাবিদ্ধ করার ঘটনাও ঘটেছে। তবে অভিযুক্ত সোহরাব হোসেন গ্রেপ্তার হওয়ায় অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্বামী–সন্তানকে হারিয়ে কান্না থামছে না স্ত্রী শিউলি আক্তারের। শুক্রবার সকালে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার দোসরপাড়া এলাকায়

গোলাপের মামা আলম মোহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পড়ালেখা করি নাই। কাগজপত্র বুঝতাম না। গোলাপ বুঝত। সবকিছু লইয়া গোলাপ দৌড়াদৌড়ি করত। সোহরাবরা বারবার কইছিল, গোলাপরে ওরা মাইরা ফালাইবো। যে জায়গা লইয়া ঝামেলা, সোহরাবরা ওইটা দহল (দখল) করছে। আমি এর বিচার চাই।’

কী হয়েছিল সেদিন

পুলিশ ও স্বজনদের ভাষ্যমতে, গত বুধবার বিকেলে মেয়ে তোয়াবাকে নিয়ে রামকৃষ্ণদী গ্রামে বাবার বাড়িতে গিয়েছিলেন গোলাপ হোসেন। এশার নামাজের পর তিনি মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। পথে পাথরঘাটা ইটভাটা এলাকায় পৌঁছালে প্রতিপক্ষ সোহরাব হোসেন ও তাঁর লোকজন বাবা-মেয়ের ওপর হামলা করেন। এতে ছোট্ট মেয়েটি বাবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায়।

স্বজনদের অভিযোগ, গোলাপকে জোর করে বিষপান করানোর পাশাপাশি পেটে ছুরিকাঘাত করা হয়। গুরুতর আহতাবস্থায় কোনোমতে বাড়িতে ফেরেন গোলাপ। প্রথমে তাঁকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরদিন দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে গোলাপ মারা যান।

বাবা–মেয়েকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। শুক্রবার সকালে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার দোসরপাড়া এলাকায়

এদিকে বুধবার রাতে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও শিশু তোয়াবাকে পাননি স্বজনেরা। বৃহস্পতিবার সকালে রামকৃষ্ণদী এলাকার একটি কাশবনে তার গলাকাটা মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। পরে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

মূল অভিযুক্ত গ্রেপ্তার

বাবা–মেয়েকে হত্যার ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে সিরাজদিখান থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন নিহত গোলাপের বাবা জয়নাল আবেদিন। মামলায় দোসরপাড়া এলাকার সোহরাব হোসেনসহ দুজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ১২ থেকে ১৫ জনকে। ইতিমধ্যে সোহরাবকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বিষয়টি নিশ্চিত করে মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কামরান হাসান শুক্রবার সকালে প্রথম আলোকে বলেন, মূল অভিযুক্ত সোহরাবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি কেন, কীভাবে ঘটেছে, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

Read full story at source