বিচ্ছিন্ন দ্বীপে ক্রিকেট শেখাচ্ছে যে একাডেমি

· Prothom Alo

পড়ন্ত বিকেলে মাঠে ব্যাট-বল হাতে অনুশীলনে ব্যস্ত একদল শিশু-কিশোর। কেউ নেটে বোলিং করছে, কেউ ব্যস্ত ব্যাটিংয়ের কৌশল রপ্তে। বলের লেংথ বুঝে খেলা, ব্যাট ধরার পদ্ধতি, পায়ের অবস্থান—প্রশিক্ষকের নির্দেশনায় শিখছে ক্রিকেটের এসব খুঁটিনাটি।

Visit fish-roadgame.online for more information.

সম্প্রতি এই চিত্র দেখা গেল চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের সরকারি হাজী আবদুল বাতেন কলেজের মাঠে। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে যিনি ক্রিকেট প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন, তাঁর নাম আরিফুল আলম ওরফে খালেদ। ২০১৯ সালে দ্বীপটির শিশু-কিশোরদের প্রশিক্ষণ দিতে তিনি গড়ে তোলেন ‘সন্দ্বীপ ক্রিকেট একাডেমি’।

একসময় সন্দ্বীপে ক্রিকেট খেলার প্রচলন ছিল সীমিত। প্রশিক্ষণের সুযোগও ছিল না বললেই চলে। সাগর পেরিয়ে মূল ভূখণ্ডে গিয়ে অনুশীলন কিংবা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ছিল কঠিন। সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যে দ্বীপের শিশু-কিশোরদের ক্রিকেট শেখানোর উদ্যোগ নেন আরিফুল। ৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী নিয়ে শুরু হওয়া তাঁর একাডেমিতে এখন সদস্যসংখ্যা ১৫০।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে একাডেমি

ক্রিকেটের টানে ২০১০ সালে সন্দ্বীপ ছেড়ে চট্টগ্রাম নগরে যান আরিফুল। ভর্তি হন এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের উদীয়মান ক্রিকেট একাডেমিতে। ২০১৪ সালে পেসার হান্টে ভালো করার পর তাঁর জায়গা হয় চট্টগ্রাম জেলার অনূর্ধ্ব-১৮ দলে। পরে উদীয়মান ক্রিকেট একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন তিনি।

চট্টগ্রামে বিভিন্ন উপজেলার কিশোর-তরুণদের একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে দেখে আরিফুল বুঝতে পারেন, সন্দ্বীপের শিশু-কিশোরেরা সেই সুযোগ থেকে পিছিয়ে আছে। ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ থাকলেও নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও বড় পরিসরে খেলার সুযোগ সন্দ্বীপের শিশু-কিশোরদের জন্য সীমিত। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এই ঘাটতি পূরণের চিন্তা করেন আরিফুল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে ৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী নিয়ে শুরু করেন সন্দ্বীপ ক্রিকেট একাডেমির কার্যক্রম।

—আরিফুল আলম, প্রশিক্ষক, সন্দ্বীপ ক্রিকেট একাডেমি।প্রথম যখন প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করি, তখন স্থানীয়ভাবে ভালো খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত অনেককে দেখেছি, বল ও ব্যাটের গ্রিপ, পায়ের পজিশন, স্টেপ সম্পর্কে ধারণা ছিল না। সেসব ধরিয়ে দিতেই তাদের খেলার ধার ও ধরনে অনেক পরিবর্তন আসে।

আরিফুল বলেন, ‘প্রথম যখন প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করি, তখন স্থানীয়ভাবে ভালো খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত অনেককে দেখেছি, বল ও ব্যাটের গ্রিপ, পায়ের পজিশন, স্টেপ সম্পর্কে ধারণা ছিল না। সেসব ধরিয়ে দিতেই তাদের খেলার ধার ও ধরনে অনেক পরিবর্তন আসে।’

একাডেমিতে ব্যাট ও বল ধরার পদ্ধতি, ব্যাটিংয়ের সময় পায়ের অবস্থান, পা ফেলার কৌশল এবং বলের লেংথ বুঝে খেলাসহ নানা খুঁটিনাটি বিষয় শেখানো হয়। আরিফুলের পর্যবেক্ষণ, কেউ ভালো বোলিং করলেও কৌশলগত কিছু পরিবর্তনে তা আরও কার্যকর হয়ে ওঠে। আবার পায়ের অবস্থান ও স্টেপের ভুলের কারণে ভালো বলেও ব্যাটসম্যান দ্রুত আউট হয়ে যেত। প্রশিক্ষণে এসব ভুল সংশোধনের সুযোগ পাচ্ছে প্রশিক্ষণার্থীরা।

মাঠে প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে কথা বলছেন আরিফুল আলম ওরফে খালেদ। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের সরকারি হাজী আবদুল বাতেন কলেজের মাঠে

দ্বীপ থেকে দেশের বিভিন্ন মাঠে

একাডেমির প্রশিক্ষণার্থীদের কেউ বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, কেউ খেলেছে ঢাকা লিগের প্রথম বিভাগে, আবার কেউ অংশ নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায়। ২০২১ সালে শেখ রাসেল অনূর্ধ্ব-১১ ক্রিকেট টুর্নামেন্টে শিরোপা জেতে একাডেমির দল। ২০২৩ সালে রাজশাহীর ক্লেমন টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে তারা। একই বছর চাঁদপুরে বিসিবি কাউন্সিলর কাপের ফাইনালেও খেলে।

একাডেমির ক্রিকেটার সাজ্জাদ হোসাইন ঢাকার কলাবাগান ক্লাবের হয়ে ঢাকা লিগে খেলেছেন। চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে খেলার স্বপ্ন ছিল তাঁর। একাডেমির মাধ্যমে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে বলে জানান তিনি।

একাডেমির প্রশিক্ষণার্থীদের কেউ বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, কেউ খেলেছে ঢাকা লিগের প্রথম বিভাগে, আবার কেউ অংশ নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায়। ২০২১ সালে শেখ রাসেল অনূর্ধ্ব-১১ ক্রিকেট টুর্নামেন্টে শিরোপা জেতে একাডেমির দল।

একাডেমির প্রশিক্ষণার্থীদের একজন মিশু। তার স্বপ্ন ক্রিকেট খেলে পরিচিতি পাওয়া, একদিন জাতীয় দলে খেলা। একাডেমির কনিষ্ঠ প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছরের সিলভিয়া ইসলাম। মাত্র তিন বছর বয়সে তাকে একাডেমিতে নিয়ে আসেন বাবা হেদায়েতুল ইসলাম। মেয়ের ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ দেখে তিনি তাকে প্রশিক্ষণে যুক্ত করেন।

হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, ‘ক্রিকেটের প্রতি সিলভিয়ার আগ্রহ দেখে এখানে নিয়ে আসি। ভবিষ্যতে বিকেএসপিতে ভর্তি করাতে চাই। সন্দ্বীপ থেকেই যাত্রা শুরুর সুযোগ পেয়েছি, এটাই বড় কথা।’

সন্দ্বীপ ক্রিকেট একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে কয়েকজন শিশু–কিশোর। সম্প্রতি তোলা

সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চলছে প্রশিক্ষণ

একাডেমির নিজস্ব মাঠ বা ভবন নেই। সরকারি হাজী আবদুল বাতেন কলেজের মাঠে অস্থায়ী নেট ও পিচে চলে অনুশীলন। কার্যক্রম এগিয়ে নিতে আরিফুলকে সহযোগিতা করছে ইয়ুথ গ্রুপের ‘রয়্যাল অ্যাথলেটিক নেটওয়ার্ক’ এবং আকবর হায়দার ও রিদোয়ানুল বারী নামের স্থানীয় বাসিন্দা। আরিফুল বলেন, ‘তাঁদের সাহায্য না পেলে আমার উদ্যোগ এত দূর এগোত না।’

সন্দ্বীপ ওল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সংগঠক আবু হেনা মহসিন বলেন, যাত্রা শুরুর এই সুযোগ তৈরিই একাডেমির সবচেয়ে বড় কীর্তি। তাঁর মতে, এই একাডেমির মাধ্যমে দ্বীপের কিশোরদের ক্রিকেট প্রতিভা সামনে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সরকারি হাজী আবদুল বাতেন কলেজের অধ্যক্ষ আবুল হাশেম বলেন, ‘সাগরবেষ্টিত দ্বীপের অনুশীলন নেটে এলাকার শিশু-কিশোরেরা কেবল ক্রিকেট খেলছে না, দ্বীপের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।’

সন্দ্বীপ উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমজাদ হোসেনের প্রত্যাশা, এই একাডেমি তৃণমূলের প্রতিভা বিকাশে ভূমিকা রাখবে। এখানকার খেলোয়াড়েরা একদিন দেশের বাইরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।

Read full story at source