এইচএসসি পরীক্ষা: ফেল করা মানেই জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া নয়

· Prothom Alo

এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী তাদের কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করেছে, কেউ প্রত্যাশার চেয়ে কম ফল করেছে, আবার কেউ হয়তো অকৃতকার্য হয়েছে। যারা ভালো ফল করেছে, তাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। আর যারা প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি কিংবা অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের প্রতি রইল আমার আন্তরিক সহমর্মিতা।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

তবে তোমাদের উদ্দেশে একটি কথা বলতে চাই, ভেঙে পড়ার কোনো কারণ নেই। মনে রেখো, জীবনের পথচলায় ভালো ফল একটি অবলম্বন হতে পারে, কিন্তু সেটিই একমাত্র অবলম্বন নয়। পরীক্ষার ফলাফল জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, কিন্তু জীবনের সাফল্য নির্ধারণের চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়।

ছেলেরা এত বেশি ফেল করছে কেন

একটু চারপাশে তাকিয়ে দেখো। তোমাদের অনেক সিনিয়র ভালো ফল করে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, কেউ ডাক্তার হয়েছে, কেউ প্রকৌশলী হয়েছে, কেউবা উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জন করেছে। কিন্তু তাদের সবাই কি জীবনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেয়েছে? তাদের অনেকেই পড়াশোনা শেষ করে উপযুক্ত কর্মসংস্থান খুঁজে পাচ্ছে না। কেউ কেউ সামাজিক প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার চাপ, লোকলজ্জা কিংবা হতাশায় নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। আবার এমন অনেক মানুষও আছে, যারা শিক্ষাজীবনে খুব অসাধারণ ফল করতে পারেনি, কিন্তু পরবর্তী জীবনে নিজেদের মেধা, দক্ষতা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তাহলে আজ যারা ভালো ফল করেছ, তাদের সবার জীবন যে ভবিষ্যতে প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? আবার যারা আজ ভালো ফল করতে পারোনি, তাদের জীবন যে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে, সেই সিদ্ধান্তই বা কে দিল?

জীবন আসলে অনেকগুলো যুদ্ধের সমষ্টি। এইচএসসি পরীক্ষা সেই যুদ্ধগুলোর মধ্যে একটি মাত্র। এই একটি যুদ্ধে জয়ী হওয়া যেমন জীবনের সব যুদ্ধে জয়ী হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না, তেমনি একটি যুদ্ধে পরাজিত হওয়া মানেই পরবর্তী সব যুদ্ধে পরাজিত হওয়া নয়। পৃথিবীতে এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছেন, যাঁরা জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী সময়ে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। তাঁদের অনেকেই আজ নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে অনুকরণীয়, কেউ কেউ ইতিহাসেও অমর হয়ে আছেন।

মনে রেখো, একটি পরীক্ষায় হেরে যাওয়া মানেই জীবনের যুদ্ধে হেরে যাওয়া নয়। একটি যুদ্ধের পরাজয় পরবর্তী যুদ্ধের বিজয়ের সম্ভাবনাকে কখনোই শেষ করে দেয় না। জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখনো বাকি, আর সেই পরীক্ষার নাম জীবন নিজেই।

একটি যুদ্ধে পরাজিত হলে একজন বিচক্ষণ যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যান না। তিনি পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ করেন, নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করেন, নতুন কৌশল তৈরি করেন এবং পরবর্তী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেন। জীবনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কোনো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে কিংবা প্রত্যাশিত ফল না পেলে হতাশায় ডুবে না থেকে কেন এমন হলো, তা খুঁজে বের করতে হবে। প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল কি না, পড়াশোনার পদ্ধতিতে সমস্যা ছিল কি না, সময় ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ছিল কি না, এসব বিষয় পর্যালোচনা করতে হবে। তারপর নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

মনে রাখতে হবে, জীবনে সফল হওয়ার পথ একটিমাত্র নয়। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফল করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া কিংবা ডাক্তার, প্রকৌশলী হওয়ার বাইরে আরও অনেক সম্ভাবনার জগৎ রয়েছে। কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা হওয়া, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, সৃজনশীল পেশা, ব্যবসা কিংবা দক্ষতাভিত্তিক নানা কাজের মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ্যের পরিচয় দিতে পারে। প্রয়োজন নিজের আগ্রহ, সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে চিনে নেওয়া এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া।

আরও মনে রাখতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে শুধু সার্টিফিকেটের মূল্য ক্রমেই কমবে; বরং একজন মানুষ বাস্তবে কী জানে, কী পারে এবং কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করতে পারে, সেটিই হবে তার যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি। সার্টিফিকেট–নির্ভর যোগ্যতার দিন ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে; সামনে দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার দিন।

পরীক্ষার্থীদের আত্মহত্যা কেন থামেনি

তাই আজ যারা প্রত্যাশিত ফল করতে পারোনি, তাদের বলব, নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা কোরো না। বন্ধু ভালো করেছে, প্রতিবেশীর সন্তান ভালো করেছে, আত্মীয়ের সন্তান ভালো করেছে, এসব ভেবে নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলো না। প্রত্যেক মানুষের মেধা, আগ্রহ, সক্ষমতা ও বিকাশের সময় এক নয়। আজকের ফলাফল তোমার অতীতের প্রস্তুতির প্রতিফলন হতে পারে, কিন্তু এটি তোমার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার চূড়ান্ত পরিচয় নয়।

এবার অভিভাবক, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক, পাড়া-প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষের উদ্দেশে কিছু কথা বলতে চাই।

যারা কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারেনি, তাদের পাশে দাঁড়ান। তাদের সঙ্গে নিয়ে ছোট পরিসরে হলেও আনন্দের পরিবেশ তৈরি করুন। তাদের মনে করিয়ে দিন, জীবনে তারা ইতিপূর্বে কত কিছু অর্জন করেছে। হয়তো কোনো প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছে, কোনো কঠিন কাজ সম্পন্ন করেছে, কোনো প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছে কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের অতীতের অর্জনগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনুন। তাদের বোঝান, একটি পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে একজন মানুষের মেধা, যোগ্যতা কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না।

বিশেষ করে অভিভাবকদের অনুরোধ করব, সন্তানকে বকাঝকা, অপমান কিংবা অন্যের সঙ্গে তুলনা করে আরও হতাশার মধ্যে ঠেলে দেবেন না। আপনার হতাশা, রাগ কিংবা সামাজিক সম্মানহানির ভয় যেন সন্তানের জীবনে নতুন সংকট তৈরি না করে। বরং তার কথা শুনুন, তার মানসিক অবস্থাকে বোঝার চেষ্টা করুন এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে পাশে থাকুন।

শিক্ষকদেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের শুধু নম্বরের ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করে তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিও সংবেদনশীল হতে হবে। যারা পিছিয়ে পড়েছে, তাদের উৎসাহ দিতে হবে এবং নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাতে হবে।

আরেকটি বিষয় আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, একটি ভালো ফল যেমন উদ্‌যাপনের বিষয়, তেমনি একটি খারাপ ফলাফলও কারও জন্য অপমান বা উপহাসের কারণ হতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে নিয়ে ঠাট্টা করা, ব্যর্থতার গল্প ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা তার পারিবারিক অবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের আনন্দ যেন অন্য কারও বেদনার কারণ না হয়।

জীবনের কঠিন সময়ে কে পাশে থাকে, সেটিই সম্পর্কের প্রকৃত পরিচয়। আপনজন শুধু আনন্দের সময় পাশে থাকার জন্য নয়; বরং বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর জন্যই আপনজন। যে শুধু সাফল্যের দিনে অভিনন্দন জানায়, কিন্তু ব্যর্থতার দিনে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে প্রকৃত অর্থে আপনজনের দায়িত্ব পালন করে না।

আজ যারা ভালো ফল করেছ, তোমাদের অভিনন্দন। এই অর্জনকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হিসেবে কাজে লাগাও। আর যারা ভালো করতে পারোনি, তাদের বলব, মাথা উঁচু করে দাঁড়াও। নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নাও, নতুন করে স্বপ্ন দেখো এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে চলো।

মনে রেখো, একটি পরীক্ষায় হেরে যাওয়া মানেই জীবনের যুদ্ধে হেরে যাওয়া নয়। একটি যুদ্ধের পরাজয় পরবর্তী যুদ্ধের বিজয়ের সম্ভাবনাকে কখনোই শেষ করে দেয় না। জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখনো বাকি, আর সেই পরীক্ষার নাম জীবন নিজেই।

  • ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; আহ্বায়ক, ওয়েলবিইং ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ

Read full story at source