হৃদয়জুড়ানো ডাবল সেঞ্চুরি

· Prothom Alo

প্রায়শ্চিত্তেরও বোধ হয় নিজস্ব একটা সৌন্দর্য আছে। সেখানে অনুশোচনা থাকে, থাকে নিজেকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। কখনো কখনো থাকে এমন এক উদ্‌যাপন, যা দেখে মনে হয়, এতক্ষণে বুঝি নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়াটা হয়ে গেল!

সিলেট টেস্টে তাওহিদ হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরির পরের দৃশ্যটা যেমন। ব্যাটের আগায় হেলমেট রেখে ড্রেসিংরুমের দিকে ছুটলেন। মুখে কী আনন্দ! যেন একটা ডাবল সেঞ্চুরি নয়, বহুদিনের জমে থাকা কোনো ঋণ শোধ করলেন।

Visit afsport.lat for more information.

প্রায়শ্চিত্ত বোধ হয় এভাবেই করতে হয়!

মিরপুরে আগের টেস্টের কথা মনে আছে? দুই ইনিংসেই অসময়ে শট খেলতে গিয়ে আউট হয়েছিলেন হৃদয়। সেই ভুলের বিষাদ নিশ্চয়ই তাঁকে তাড়া করেছে। কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্যই তো এখানে। কাল যে ভুলের জন্য মাথা নিচু করতে হয়, আজ সেই ক্রিকেটই মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয়।

হৃদয় সেটাই করেছেন। শুধু করেছেন বললে কম বলা হয়। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন এক ইনিংস খেলেছেন, যা নিয়ে অনেক বছর আলোচনা হবে। বাংলাদেশের সেরা টেস্ট ইনিংসগুলোর একটি তো বটেই, সর্বকালের সেরা কি না, সেই বিতর্কও চলতে পারে।

হৃদয়ের এই ডাবল সেঞ্চুরি বহুদিন মনে রাখবে বাংলাদেশ ক্রিকেট

সিলেট টেস্টের ফল কী হবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও দুদিন। কিন্তু হৃদয়ের ইনিংসের মহিমা বুঝতে ফলাফলের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।

একটু পেছনে ফেরা যাক। কাল যখন ব্যাট হাতে মাঠে নামলেন, বাংলাদেশ তখন ২২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে বিপদে। দলের অবস্থা তখন অনেকটা ডুবন্ত নৌকার মতো। হৃদয় নিজেও খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না। শুরুতে তাঁকে দেখে মনে হয়নি, এই ইনিংসের শেষে এমন একটা মহাকাব্য লেখা হবে।

তবু হাল ছাড়েননি। উইকেটে পড়ে থেকেছেন। প্রথম দিনটা শেষ করেছেন ২৯ রানে অপরাজিত থেকে।

টেস্টের মেজাজে হৃদয় নিংড়ে সেঞ্চুরি হৃদয়ের

তারপর সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে পরিস্থিতি। পাল্টেছে হৃদয়ের ব্যাটিংও। কখনো রক্ষণে অবিচল, কখনো আক্রমণে দুরন্ত। বল বুঝে খেলেছেন। বাউন্ডারি পাওয়ার সুযোগ এলে হাতছাড়া করেননি। সিলেটের গ্যালারিতে করতালি বেড়েছে। ড্রেসিংরুমে সতীর্থরা উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছেন। ইবাদত হোসেন তো মাঝপথেই জানিয়ে দিয়েছেন কুর্নিশ।

হৃদয়ের ইনিংসের বিবর্তনটা বোঝার জন্য কয়েকটি সংখ্যা দেখা যেতে পারে। প্রথম ৫০ রান করতে খেলেছেন ১০৯ বল, সময় লেগেছে ১৭৮ মিনিট। সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে পরের ৬২ বলে লেগেছে ৮০ মিনিট। দেড় শ করতে আরও ৬৪ বল, ৬৭ মিনিট। সেখান থেকে ডাবল সেঞ্চুরি? মাত্র ৬৯ বল, ৯০ মিনিট। অর্থাৎ যত সময় গড়িয়েছে, হৃদয়ের ব্যাট তত দ্রুত কথা বলেছে। এ প্রতিবেদন লেখার সময় অপরাজিত ৩৫১ বলে ২৩৬ রান করে।

হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরির পর ড্রেসিংরুমের অভিবাদন

তবে এই ইনিংসকে শুধু রান আর বলের হিসাব দিয়ে মাপা যাবে না। এর সবচেয়ে সুন্দর গল্পটা লুকিয়ে আছে শেষ দুই ব্যাটসম্যানকে নিয়ে। এক প্রান্তে হৃদয়। অন্য প্রান্তে একের পর এক সতীর্থের বিদায়। উইকেট যেন বিলিয়ে দিয়ে আসছিলেন বাকিরা। কিন্তু হৃদয় খেই হারাননি। তাসকিন আহমেদ কিংবা তাইজুল ইসলামকে বারবার কাছে গিয়ে বুঝিয়েছেন, ভয় নেই, শুধু আমাকে স্ট্রাইকটা দিন। কী অদ্ভুত এক দায়িত্ববোধ!

শেষ দুই ব্যাটসম্যানকে নিয়ে ১৭২ রান যোগ করেছেন হৃদয়। শুধু টিকে থাকেননি, প্রয়োজনের সময় চার-ছক্কাও মেরেছেন। বলের পর বল ঠেকিয়ে প্রতিপক্ষের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের জন্য তখন কাজটা কতটা বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিল, একটু কল্পনা করলেই বোঝা যায়। উইকেট পাচ্ছে না, আবার অন্য প্রান্তের ব্যাটসম্যানকে আউট করার সুযোগও নেই। হৃদয় আছেন।

সিলেট টেস্ট: হৃদয়ের রেকর্ড ডাবল সেঞ্চুরিতে তৃতীয় দিনটা বাংলাদেশের

এমন পরিস্থিতিতে অনেক ব্যাটসম্যান নিজের মাইলফলকের কথা ভাবেন। হৃদয় ভেবেছেন দলকে নিয়ে। নিজের ডাবল সেঞ্চুরির চেয়েও তখন বড় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের লিড নেওয়া। মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের পর বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করা চতুর্থ ব্যাটসম্যান হৃদয়। তবে প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি নিজের টেস্ট সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিলেন তিনি। আর নিজের মাত্র ষষ্ঠ টেস্ট ইনিংসেই এই কীর্তি। এত দ্রুত এই উচ্চতায় পৌঁছানোও তো কম কথা নয়!

সেঞ্চুরির পর হৃদয়ের উদ্‌যাপন

একটা সময় ছিল, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কাছে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি ছিল প্রায় স্বপ্নের মতো। সেই স্বপ্নের তালিকায় এখন যোগ হলো আরেকটি নাম। তবে হৃদয়ের ইনিংসের গুরুত্ব শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ডে আটকে থাকবে না। পরের প্রজন্মের জন্য তিনি একটা মানদণ্ডও রেখে গেলেন।

বিপর্যয় থেকে কীভাবে দলকে টেনে তুলতে হয়, কীভাবে শেষ দুই ব্যাটসম্যানকে নিয়েও লড়াই চালিয়ে যেতে হয়, কীভাবে নিজের মাইলফলকের চেয়ে দলের প্রয়োজনকে বড় করে দেখতে হয়, তার একটা পাঠ দিয়ে গেলেন হৃদয়।

এখন প্রশ্ন একটাই। সতীর্থরা কি পারবেন এই ইনিংসের রং আরও গাঢ় করতে? হৃদয় তাঁর কাজটা করেছেন। ২২ রানের ধ্বংসস্তূপ থেকে বাংলাদেশকে টেনে এনে দিয়েছেন লিড। এখন তাঁর সতীর্থদের দায়িত্ব, এই মহাকাব্যের শেষটা যেন জয় দিয়ে লেখা হয়।

কারণ, কিছু ইনিংস শুধু স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না। সেগুলো ভবিষ্যতের ক্রিকেটারদের বুকেও সাহস হয়ে থেকে যায়।

Read full story at source