আমি নারী, এটাই আমার গর্ব

· Prothom Alo

আমার অধিকার আমি প্রতিদিন চর্চা করি, নিজেকে সম্মান দিয়ে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়ে, অন্যায়ের সামনে নীরব না থেকে, এবং অন্য নারীর হাত শক্ত করে ধরে।

আমার কাছে মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীর সবচেয়ে সূক্ষ্ম নৈপুণ্য দিয়ে আমাকে গড়েছেন। আমার ভেতরে যেমন কোমলতা আছে, তেমনি আছে দৃঢ়তা। আমি কাঁদি, কিন্তু ভেঙে পড়ি না। আমি ভালোবাসি, কিন্তু নিজেকে হারিয়ে ফেলি না।

Visit forestarrow.rest for more information.

নারীর জন্ম হওয়া মানে এক দীর্ঘ, গভীর ও সাহসী যাত্রার শুরু। ছোটবেলা থেকেই বুঝেছি, মেয়েদের জীবন গল্পের মতো সহজ নয়। আমাদের শেখানো হয় মানিয়ে নিতে, সহ্য করতে, চুপ থাকতে। কিন্তু আমার ভেতরে আরেকটি কণ্ঠ ছিল, যে কণ্ঠ প্রশ্ন করত, জানতে চাইত, নিজের জায়গা নিজেই তৈরি করতে চাইত।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আসলে মনে হয় এটি একধরনের আত্মস্বীকৃতির মুহূর্ত। সচেতনতার দিন। যখন আয়নায় নিজেকে দেখি, আমি শুধু একজন নারী দেখি না; দেখি শক্তি, সহমর্মিতা, প্রজ্ঞা আর সীমারেখা টানতে জানার সাহস।

নারীর অধিকার নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু আমার কাছে অধিকার মানে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। আমার সীমারেখা আমিই নির্ধারণ করি। আমার সম্মান আমার হাতে। কেউ যদি আমার দুর্বল সময়ে পাশে না দাঁড়ায়, সে আমার শক্ত সময়ের দাবিদার নয়—এই বোধটাই আমার স্বাধীনতা।

আমার শৈশব আমাকে সংবেদনশীল করেছে। কৈশোর আমাকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে। আর বিবাহিত জীবন আমাকে শিখিয়েছে, সম্পর্ক মানে আত্মবিলোপ নয়। সম্পর্কের ভেতরেও একজন নারীর নিজস্ব সত্তা থাকে, থাকা উচিত।

ডিভোর্সি জীবন আমার কাছে ভাঙন নয়, বরং পুনর্জন্ম। সমাজ অনেক সময় নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে তার চরিত্রের মানদণ্ড বানিয়ে ফেলে। কিন্তু আমি বুঝেছি, একটি সম্পর্ক শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের মর্যাদা শেষ হয় না। নিজের ভাঙা অংশগুলোকে জোড়া লাগিয়েছি। কান্নাকে শক্তিতে রূপান্তর করেছি। একা দাঁড়াতে শিখেছি, এবং একা দাঁড়িয়ে থেকেও অসম্পূর্ণ বোধ করিনি।

সমতার পাল্লায় পোশাকশিল্পের নারী কি শুধুই সংখ্যা

পেশাগত জীবন আমাকে আরও গভীরভাবে নারীকে চিনতে শিখিয়েছে। অসংখ্য নারীর চোখের জল, অপূর্ণ স্বপ্ন, দমিয়ে রাখা ক্ষোভ, অবহেলিত প্রতিভা—এসব খুব কাছ থেকে স্পর্শ করেছি। তাঁদের গল্প শুনতে শুনতে আমি বুঝেছি, নারী শুধু সহনশীল নয়; নারী অসাধারণভাবে সহনশীল।

কিন্তু সহনশীলতা যেন আত্মবিসর্জনে পরিণত না হয়, এই বোধটাই জরুরি।
আমি শিখেছি, ‘না’ বলতে পারা একধরনের আত্মসম্মান। শিখেছি, নিজের যত্ন নেওয়া স্বার্থপরতা নয়, এটা দায়িত্ব। শিখেছি, নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরকে সম্মান করা মানে নিজের অধিকারকে সম্মান করা।

আমার যাত্রা নিখুঁত নয়, কিন্তু স্বাস্থ্যকর। আমি ধীরে ধীরে এগোই, সচেতনভাবে, সীমা বেঁধে, আত্মসম্মান ধরে রেখে। আমি জানি, আমার কাজ, আমার স্বপ্ন, আমার ভালোবাসা— সবকিছুতেই আমি যথেষ্ট। চ্যালেঞ্জ আমাকে থামাতে পারেনি, বরং শাণিত করেছে। আমি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসি। কারণ, প্রতিটি চ্যালেঞ্জ আমাকে আমার গভীরতর শক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমি জানি ভয় কী, কষ্ট কী, প্রত্যাখ্যান কী। তবু জানি, আমি দাঁড়াতে পারি।

আমি অন্য নারীদের মধ্যে নিজেকে দেখি। তাঁদের লড়াইয়ে নিজের ছায়া খুঁজে পাই। তাঁদের শক্তিতে অনুপ্রাণিত হই, ভাঙনে কষ্ট পাই। আমি জানি, একজন নারী যখন নিজের মর্যাদা বুঝতে শেখে, তখন সে শুধু নিজের জীবন বদলায় না, চারপাশের পৃথিবীকেও বদলে দেয়।

আমি নারী।
আমি কোমল, কিন্তু দুর্বল নই।
আমি সংবেদনশীল, কিন্তু ভঙ্গুর নই।
আমি একা চলতে পারি, তবু ভালোবাসতে জানি।

আমার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেমন: শৈশব, বিবাহ, বিচ্ছেদ, পেশা—সব মিলিয়ে আমি আজ যে নারী, তাকে শ্রদ্ধা করি। নিজেকে ভালোবাসি। কারণ, জানি আমি কী পার করে এসেছি।

আমার অধিকার আমি প্রতিদিন চর্চা করি, নিজেকে সম্মান দিয়ে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়ে, অন্যায়ের সামনে নীরব না থেকে, এবং অন্য নারীর হাত শক্ত করে ধরে।

আজ নারী দিবসে আমি অন্য কারও কাছে স্বীকৃতি চাই না, আমি নিজেকে স্বীকৃতি দিই।
আমি নারী।
এটাই আমার শক্তি।
এটাই আমার গর্ব।

সাইকোথেরাপিস্ট ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষক, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড এবং যুগ্মসাধারণ সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ।

Read full story at source