সুফী মোতাহার হোসেনের অগ্রন্থিত নিবন্ধ
· Prothom Alo

সুফী মোতাহার হোসেন (১৯০৭-৭৫) বাংলা সাহিত্যে সনেটিয়ার হিসেবে খ্যাতিমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আবুল ফজল, আবদুল কাদির, আতাউর রহমান খান প্রমুখ তাঁর সহপাঠী ছিলেন। মেধা, মনন ও সাহিত্য-প্রতিভার জন্য তিনি শিক্ষকমণ্ডলী, সহপাঠী ও সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবীদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’–এর (১৯২৬-৩৮) কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সুফী মোতাহার হোসেনের প্রত্যক্ষযোগ ছিল। আবুল ফজলের রেখাচিত্র (১৯৬৫, বাতিঘর সংস্করণ ২০২০, ঢাকা) গ্রন্থ ছাড়া তাঁর সেই সম্পৃক্তির বিশেষ উল্লেখ দেখা যায় না। মুসলিম সাহিত্য সমাজের তৃতীয় বষের্র কর্মী থাকাকালে তিনি সংসদের সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। সাহিত্য সমাজের অর্থসংস্থানের লক্ষ্যে শিখার পুরোনো সংখ্যা বিক্রয় ও পত্রিকার নতুন গ্রাহক সংগ্রহের প্রয়োজনে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির সদস্য হিসেবে অন্যান্যের সঙ্গে সুফী মোতাহার হোসেনের ওপর ‘শহরের মেস এবং প্রাইভেট হাউস হইতে অর্থ সংগ্রহের ভার অর্পণ করা হয়।’ [আবুল আহসান চৌধুরী (সংকলন-সম্পাদনা-ভূমিকা), মুসলিম সাহিত্য সমাজ: সভার সংক্ষিপ্ত কার্যবিবরণী ১৯২৬-১৯৩৮, ঢাকা, পাঠক সমাবেশ, ২০২৫, প্রথম প্রকাশ ২০১৫, পৃ. ৭৩-৭৪]
এ সূত্রেই তিনি মুসলিম সাহিত্য সমাজের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও চিন্তানায়ক আবুল হুসেনের (১৮৯৭-১৯৩৮) সান্নিধ্য লাভ করেন। অধ্যাপক আবুল হুসেনের প্রয়াণের অব্যবহিত পরে মাসিক মোহাম্মদীর ১২ বর্ষ প্রথম সংখ্যায় (কার্তিক ১৩৪৫) সুফী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিচারণা ও মূল্যায়নধর্মী নিবন্ধ ‘আবুল হুসেন’ প্রকাশিত হয়, যেখানে ব্যক্ত হয়েছে আবুল হুসেনের সংগ্রামী জীবন ও সাধনার কথা। নিবন্ধটি আবুল হুসেন ও সুফী মোতাহার হোসেনের জীবনী ও প্রাসঙ্গিক কোনো গ্রন্থ বা সংকলনে গ্রন্থিত হয়নি বা এ–সংক্রান্ত কোনো তথ্যও দৃষ্ট নয়। নিবন্ধটির সঙ্গে আবুল হুসেনের একটি নবীন বয়সের ছবি রয়েছে, যা অন্য কোথাও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়নি।
Visit afnews.co.za for more information.
মাসিক মোহাম্মদীতে প্রকাশিত সুফী মোতাহার হোসেনের নিবন্ধ ‘আবুল হুসেন’ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলোআবুল হুসেন
সুফী মোতাহার হোসেন
মৌলভি আবুল হুসেন, এম-এ, এম-এল, অ্যাডভোকেট সাহেবের মৃত্যুসংবাদে ব্যথিত হইয়াছি। তিনি বাঙ্গালি মুসলমান সমাজের অন্যতম রত্ন ছিলেন। তাঁর সম্বন্ধে দু–চার কথা বলিবার প্রয়োজন আছে।
একসময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমার্স বিভাগের অধ্যাপক এবং ঢাকা মুসলিম হলের হাউস টিউটর ছিলেন। ১৯২৬ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম হলে তাঁর কর্তৃত্বাধীনে ছিলাম। ঢাকায় সেই সময়ে তরুণ মুসলিমদিগের জীবনে যে এক নবজাগরণের পুলকস্পন্দন সঞ্চারিত হইয়াছিল, তাহার অন্যতম নেতা আবুল হুসেন সাহেব ছিলেন। জ্ঞানচর্চায় ও কর্মসাধনায় অসামান্য উৎসাহ ও প্রতিভার পরিচয় দিয়াছিলেন মরহুম মৌলভি আবুল হুসেন সাহেব। তাঁর সাহস, হৃদয়মনের বলশালিতা, চরিত্রের দৃঢ়তা ও সত্যাশ্রয়ী চিত্তের একাগ্রতা তাঁর রচনায়, কর্মে, ব্যক্তিত্বে, এমনকি তাঁর দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটিতে পর্যন্ত এক অপূর্ব বৈশিষ্ট্য আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল। এককথায় নিজের ধর্মকে, জাতিকে ও সমাজকে তিনি ভালোবাসিতেন এবং মুসলিম ধর্ম ও সভ্যতা বিষয়ে বিস্তৃত অধ্যয়ন ও চর্চা করিয়াছিলেন।
তিনি সুসাহিত্যিক ও চিন্তাশীল লেখক ছিলেন। তাঁর তথ্যপূর্ণ সুদীর্ঘ রচনা ‘মুসলিম কালচার’ একসময় মুসলিম সমাজে সমাদর লাভ করিয়া বিখ্যাত হইয়াছিল। তাঁর আরও অনেক মূল্যবান রচনা ও পুস্তকাদি তাঁর জ্ঞানের, বিদ্যার ও সাহিত্য-প্রতিভার নিদর্শনস্বরূপ হইয়া রহিয়াছে। বাঙ্গলার স্কুল ও কলেজের শিক্ষাপদ্ধতি ও শিক্ষণীয় বিষয়াদি সম্বন্ধে তিনি একসময় যথেষ্ট গবেষণা করিয়া সুদীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করিয়াছিলেন এবং এ দেশের ছাত্রসমাজের, বিশেষত মুসলিম ছাত্রসমাজের, বিদ্যাচর্চার নিয়ম–ব্যবস্থার বহু অত্যাবশ্যকীয় সংস্কার সাধনে অনেক মূল্যবান কথা বলিয়াছিলেন। নানা কারণে বাধ্য হইয়া একসময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোটা মাহিনার চাকরি ত্যাগ করিয়া স্ত্রী-পুত্র, কলত্র ও ভ্রাতৃবর্গসমন্বিত বিরাট সংসার লইয়া কলিকাতায় আসেন এবং হাইকোর্টের আইন ব্যবসায়জীবী হন। তাঁর প্রতিভা এ ক্ষেত্রে জয়যুক্ত হইয়াছিল। হাইকোর্টে ৮–৯ বৎসর কাল যশ ও খ্যাতির সহিত তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করিয়াছেন।
এই ৮-৯ বৎসর তিনি সাহিত্য ও সমাজসেবা তেমন আর করেন নাই, যেমন করিতেন ঢাকায়। তবে স্কুলপাঠ্য অনেক পুস্তক তিনি রচনা করিয়াছিলেন। ঢাকায় তাঁহার অভাব সকলেই বোধ করিতেন। এবং কালক্রমে সেই সকল জ্ঞানচর্চা, কর্মপ্রচেষ্টা অধ্যাপকদিগের নিজ নিজ গৃহেই সীমাবদ্ধ হইয়াছে। সভা-সমিতি, পত্রিকা বন্ধ হইয়া গিয়াছে। আবুল হুসেন সাহেবের অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা সকলেই ব্যথিত। জীবিত থাকিলে তাঁর দ্বারা সমাজ ও জাতি বিভিন্ন প্রকার খেদমত আমরা নিশ্চয়ই বহুকাল পাইতাম। কিছুকাল আগে তাঁর ডিসপেপসিয়া ও ক্যানসার হইয়াছিল। তাঁর সে রোগজীর্ণ চেহারা বেশ মনে পড়ে। আল্লাহ তাঁর আত্মাকে শান্তি দিন।