৭৬ বছরের স্মৃতিতে খাপড়া ওয়ার্ড
· Prothom Alo

রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডের ২০ নম্বর সেলে পাবনার আমিনুল ইসলামের সঙ্গে ছিলেন আসামের শিলচরের অনন্ত দেব। প্রচণ্ড আঘাতে দুজনই ছিলেন চলনশক্তিহীন। অপচিকিৎসায় তাঁদের অবস্থার আরও অবনতি হচ্ছিল। এমন সময় অনন্ত দেবের বদলির আদেশ হয় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে। মৃত্যুশয্যাশায়ী জেলসাথি আমিনুল কিছুই টের পেলেন না। ৪৭ বছর পর দুজনই জানতে পারেন, তাঁরা বেঁচে আছেন।
অনন্ত দেব লিখেছেন, তিনি ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল দুপুরে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসে ঢাকায় আসছিলেন। তাঁকে স্বাগত জানাতে হাজির ছিলেন আমিনুল ইসলাম। অনন্ত দেবের ভাষায়, ‘স্টেশনে উভয়ে উভয়কে চেনার কথা ছিল না। কিন্তু আত্মিক সম্পর্ক এত গভীর যে ট্রেনের গ কামরার জানালায় ১৯ নম্বর সিটে আমাকে দেখামাত্র আমিনুলের জিজ্ঞাসা ছিল, তুই অনন্ত না?’ (খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড ১৯৫০, মতিউর রহমান)
Visit moryak.biz for more information.
এ পর্যন্ত পড়তেই ৭৬ বছর আগের ঘটনায় চোখ ভিজে উঠল। নিম্নমানের খাবার, বন্দীদের নির্যাতনের প্রতিবাদে অনশন ও আন্দোলন করায় ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল এই খাপড়া ওয়ার্ডে দেশপ্রেমিক রাজবন্দীদের ওপর নির্বিচার গুলি চালায় তৎকালীন পুলিশ। এতে ৭ জন বন্দী নিহত হন। আহত হন ৩২ জন। আহত ব্যক্তিদের দুজন হলেন আমিনুল ইসলাম ও অনন্ত দেব।
অনন্ত দেব লিখেছেন, ‘২৭ এপ্রিল ভোরে ছিল আমার ঢাকা ছাড়ার পালা। পারাবত এক্সপ্রেসে সিলেটে ফিরব। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছিল আমিনুল। নানা কথার পর গাড়ি ছাড়ার প্রাক্মুহূর্তে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল আমিনুল, “দেখা হবে, তোদের ওখানে আসব।”
ঢাকায় প্ল্যাটফর্মে নেমেই দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরেন। পরের দিন ২৪ এপ্রিল (১৯৯৮ সাল) ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘খাপড়া শহীদ স্মরণ’ অনুষ্ঠানে যোগ দেন তাঁরা। সেই অনুষ্ঠানে আমিনুল ইসলামকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁর আমন্ত্রণ পেয়েই বাংলাদেশে এসেছিলেন ভারতের আসামের শিলচর শহরে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
অনন্ত দেব লিখেছেন, ‘২৭ এপ্রিল ভোরে ছিল আমার ঢাকা ছাড়ার পালা। পারাবত এক্সপ্রেসে সিলেটে ফিরব। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছিল আমিনুল। নানা কথার পর গাড়ি ছাড়ার প্রাক্মুহূর্তে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল আমিনুল, “দেখা হবে, তোদের ওখানে আসব।” সাথি আমিনুলের জীবিতকালে এটাই শেষ কথা আমার সঙ্গে। ওর আসা হলো না, দেখাও হলো না। ও চিরবিদায় নিয়ে চলে গেল ১৯৯৮ সালের ৪ আগস্ট। কথাটি সম্পদ হয়ে রইল আমার স্মৃতির পাতায়।’
খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে নিহত রাজবন্দীরা হলেন ময়মনসিংহের সুখেন্দু ভট্টাচার্য, ঠাকুরগাঁওয়ের (তৎকালীন দিনাজপুর) কম্পরাম সিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুধীন ধর, কুষ্টিয়ার দেলোয়ার হোসেন ও হানিফ শেখ, খুলনার বিজন সেন ও আনোয়ার হোসেন। তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন সাম্যবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের মুক্তিসংগ্রামের সৈনিক।রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে নিহত ৭ শহীদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ
খাপড়া ওয়ার্ডের শহীদেরা
খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে নিহত রাজবন্দীরা হলেন ময়মনসিংহের সুখেন্দু ভট্টাচার্য, ঠাকুরগাঁওয়ের (তৎকালীন দিনাজপুর) কম্পরাম সিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুধীন ধর, কুষ্টিয়ার দেলোয়ার হোসেন ও হানিফ শেখ, খুলনার বিজন সেন ও আনোয়ার হোসেন। তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন সাম্যবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের মুক্তিসংগ্রামের সৈনিক। ওই সময় এ ঘটনায় একদিকে যেমন শোষক শ্রেণির অমানবিক হিংস্রতা ও বর্বরতার পরিচয় উন্মোচিত হয়েছিল, তেমনি শোষিত মানুষের মুক্তিসংগ্রামে মহান বীরত্ব, গৌরবময় আত্মত্যাগ ও সর্বোচ্চ মানবিক গুণাবলির প্রকাশ পেয়েছিল।
৮০০ জনের ধারণক্ষমতার কারাগারে
তখন রাখা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার বন্দী। কারাগার কর্তৃপক্ষ বন্দীদের পশুর স্তরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। সে সময় ঢাকা জেল থেকে আরও সাতজন বন্দী আনার পর খাপড়া ওয়ার্ডে মোট বন্দীর সংখ্যা হয়েছিল ৩৯। এটা
বুঝতে পেরেছিলেন রাজবন্দীরা। তাই সিপিআইয়ের (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া) জেল কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই জেল কমিটিতে ছিলেন কম্পরাম সিংহ। আহত হওয়ার এক দিন পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। গত বছরের মার্চ মাসে ঠাকুরগাঁওয়ে এই ত্যাগী নেতার বাড়িতে গিয়ে তাঁর স্বজনদের দুরবস্থা দেখে মন খারাপ হয়ে যায়।
খাপড়া ওয়ার্ডের দক্ষিণ পাশে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে নিহত রাজবন্দীদের নাম খোদাই করা আছে। প্রতিবছর ২৪ এপ্রিল সিপিবি ও ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকে কারাগারের ভেতরের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
খাপড়া ওয়ার্ড নিজেই একটা স্মৃতিস্তম্ভ
এই ওয়ার্ডে ১৯৯৯ সালের পর থেকে আর বন্দী রাখা হয়নি। ওয়ার্ডটিকে কনডেমড ঘোষণা করা হয়। মাঝখানে চালা ভেঙে পড়েছিল। অবশ্য পরে আগের মতো করেই সংস্কার করা হয়েছে। আগেও চালার টাইলস লাল রঙের ছিল। সংস্কারের পরও সেই রঙের টাইলসই লাগানো হয়েছে। বাইরের দেয়াল ও পিলারের রংও লাল। যেন শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে খাপড়া ওয়ার্ড নিজেই একটা স্মৃতিস্তম্ভের ভূমিকা পালন করছে।
রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারটির বয়স হয়েছে। ১৮২৫ সালে নবাবের ঘোড়ার আস্তাবলে প্রথম এই কারাগার চালু করা হয়। ইতিমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর কারাগারটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণের জন্য ‘রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার পুনর্নির্মাণ প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে। এ জন্য তারা প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ডিপিপি জমা দিয়েছে। নকশাও অনুমোদিত হয়েছে। নকশায় ৬৪টি নতুন স্থাপনা স্থান পেয়েছে। নতুন কারাগারের ধারণক্ষমতা হবে দুই হাজার জনের। এর মধ্যে নারীদের ওয়ার্ডে মায়েদের সঙ্গে বাচ্চাদের দিবাযত্ন কেন্দ্র ও বিনোদনের জন্য ফিমেল জেল স্কুলও থাকছে।
ছুটে যাই রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুল ইসলামের কাছে। তিনি আশ্বস্ত করলেন, হেরিটেজ স্থাপনা হিসেবে এই কারাগারের একমাত্র পুরোনো ভবন খাপড়া ওয়ার্ডটি রাখা হয়েছে। থাকছে শহীদ মিনারটিও।
খাপড়া ওয়ার্ডের কী হবে
এ খবর জানার পর মনের মধ্যে খচ করে ওঠে—খাপড়া ওয়ার্ডের কী হবে? পাশেই রয়েছে সাত শহীদের নামাঙ্কিত স্মৃতিসৌধ। প্রতিবছর ২৪ এপ্রিল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কী ব্যবস্থা হবে।
ছুটে যাই রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুল ইসলামের কাছে। তিনি আশ্বস্ত করলেন, হেরিটেজ স্থাপনা হিসেবে এই কারাগারের একমাত্র পুরোনো ভবন খাপড়া ওয়ার্ডটি রাখা হয়েছে। থাকছে শহীদ মিনারটিও।
জানা গেল, ওয়ার্কার্স পাটির পক্ষ থেকে ১০ জন ও সিপিবির পক্ষ থেকে ৪১ জন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। অনুমতি পেলে তাঁরা প্রতিবছরের মতো এবারও খাপড়া ওয়ার্ডে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।