বাংলাদেশের ঐশ্বর্য সন্ধান ২৭: পাঁচলাইশ জমিদারবাড়ি যেন সময়ের আড়ালে হারানো ঐতিহ্য
· Prothom Alo

অজানা ইতিহাসের টানে পথচলা। এ এক হারিয়ে যাওয়া জমিদারবাড়ি অনুসন্ধানের নাছোড় প্রয়াস। শহরের ভিড় পেরিয়ে এই খুঁজে ফেরা বস্তুত সময়ের স্তরে চাপা পড়ে থাকা স্মৃতির সন্ধান। ভাঙা দেয়ালে লুকিয়ে থাকা অতীত আর বর্তমানের আলোয় উত্তরাধিকারকে ছুঁয়ে দেখার নীরব অথচ গভীর অনুভবও বটে।
Visit turconews.click for more information.
সেদিন সকালে ঘুম ভাঙেনি। আগের রাতে আবাসনে ফিরতে কিছুটা দেরি হয়ে যায়। আবাসনের শোবার স্থানটিও আরামদায়ক নয়। ফলাফল, সকাল শুরু হলো দেরিতে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম ভ্রমণের এক সকালের গল্প বলছি।
চটজলদি রেডি হয়ে বহদ্দারহাট এলাকার জামান হোটেলে নাশতা সারলাম। গন্তব্য বায়েজিদ বোস্তামীর দরগাহ। আসল গন্তব্য সেখানে নয়। বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় গিয়ে বাকি গন্তব্য তালাশ করব। চট্টগ্রাম শহরে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সুবিধা রয়েছে। নানা রকম বাহন আছে কমবেশি দূরত্বে যাওয়ার জন্য। গণপরিবহনের বিচারে আমার কাছে ঢাকার চেয়ে আরামের মনে হয়েছে। রিকশার অপ্রতুলতার জন্য নানা রকম বাহনের ব্যবহার আছে। চট্টগ্রামের উঁচু–নিচু পাহাড়ি সড়ক রিকশার জন্য খুব উপযোগী নয়।
যাহোক, টেম্পোর মতো বাহনে করে অক্সিজেন মোড়ে এলাম। তারপর সেখান থেকে সিএনজিতে বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় পৌঁছালাম। সেখানে কেউ এয়ার আলী খান হাট চিনতে পারছেন না। আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি পাঁচলাইশ জমিদারবাড়ি। পুরো ২০২৫ সাল খুঁজেছি এই বাড়ির অস্তিত্ব। কেউই সন্ধান দিতে পারেননি। গুগলও কিছু বলতে পারছে না। বিভিন্ন বই আর গুগলে বলতে গেলে একটিমাত্র ছবি আছে।
জমিদার বাড়ি চত্বরে গড়ে ওঠা নতুন ভবনচট্টগ্রামের কেউ সে ছবি দেখে বাড়ির সন্ধান দিতে পারেননি। এরপর ১৬ উপজেলার কাজ করতে গিয়ে আমি বেমালুম ভুলে গেছি। এবার মনে হলো খুঁজে বের করবই। বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় একটি মার্কেটের প্রায় সব দোকানের স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। সুরাহা হলো না। মিনিট দশেক পর একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন, যেতে হবে নয়ারহাট। সেখানে আব্বাস চেয়ারম্যানের বাড়ি খুঁজবেন। মনে বল পেলাম। আশাও জাগল।
খান মঞ্জিলনয়ারহাটে আব্বাস চেয়ারম্যানের বাড়ির কাছে নামিয়ে দিল পাবলিক সিএনজি অটোরিকশা। এপ্রিলের কড়া রোদ আর তীব্র গরম! যাকেই জিজ্ঞাসা করি, সেই বলে, দুই মিনিট হাঁটলেই হবে। কিন্তু দুই মিনিট আর শেষই হয় না! উপায়ান্তর না দেখে অটোরিকশা নিই আবার। এই এলাকাটা বেশ শান্ত। আবাসিক এলাকার মতো লাগছে। চট্টগ্রামের মূল শহর থেকে বেশ দূরে মনে হচ্ছে।
গিয়ে হাজির হলাম আব্বাস চেয়ারম্যানের বাড়ি। রিকশা থেকে নেমে দেখতে পেলাম একটি দ্বিতল ও দুটি একতলা বাড়ি। অবয়ব দেখে মনে হচ্ছে পাকিস্তান আমলে নির্মিত। ভবনের গায়ে ইংরেজি ও আরবিতে লেখা রয়েছে খান ম্যানসন। মনে হলো, এয়ার আলী খান বাড়ির কাছাকাছি হয়তো এসেছি। একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক জানালেন, সেখানে কোনো পুরোনো ভবন নেই।
বাড়ির সামনে দীঘিআমি গুগলের ছবিটি দেখালাম। তিনি দু–চার জায়গায় ফোনে কথা বলে অটোরিকশাচালককে নির্দেশ দিলেন কোথায় যেতে হবে। মিনিট ১৫ পর একটি মসজিদ দেখতে পেলাম এয়ার আলী খান নামে। তারপর সড়ক দিয়ে চলছি আর বিভিন্ন বাড়ির সামনের দেখছি নামফলকগুলো। প্রতিটি নামের টাইটেল খান। বুঝলাম সঠিক স্থানে এসেছি।
যাঁরা এই বাড়ি সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁরা কি আসলেই এখানে সরেজমিনে এসেছিলেন? কারণ, যে দুই–তিনটি লেখা দেখেছি, কোথাও এলাকার বর্ণনা বা অন্য বিষয়ের উল্লেখ নেই। যাহোক অটোরিকশাচালক একটি পুরোনো মাটির বাড়ির কাছে নিয়ে এলেন। দারুণ সুন্দর বাড়িটি! সেখানে একজন তরুণ কাজ করছেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘আপনি চট্টগ্রামের ভিডিও করেন সেই আপু নাকি?’ তিনি জানালেন, এটি কাছারিঘর ছিল। তবে শত বছর হয়নি। সেই কাছারিঘর থেকে খানিকটা দূরে আরও দুটি দ্বিতল মাটির বাড়ি দেখতে পেলাম। বাড়ি দুটির বয়স জানি না।
খান বাড়ির কাছারি ঘরতরুণের নাম শাহীন। তিনি নিয়ে গেলেন একটি পুকুরপাড়ে। ঘাট বাঁধানো একটি পুকুরপাড়। পাশেই একটি বহুতল আধুনিক ভবন। গেট ঠেলে শাহীন প্রবেশ করলেন। আমিও পিছু নিলাম। বেশ ছিমছাম বাড়ি। চারপাশ একদম পরিষ্কার। ভবনের পাশেই একটি সবুজ চত্বর। এই চত্বরে একতলা ভাঙা পুরোনো ভবনটির কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় বাসিন্দারা, এমনকি তাঁদের অন্য উত্তরসূরিরা কেন পুরোনো ভবনের কথা জানেন না, এখন বুঝতে পারলাম।
আংশিক স্থাপত্যটি দেয়ালঘেরা একটি বাড়ির ভেতরে। সামনের সড়ক থেকে বোঝার উপায়ই নেই। লক্ষ্য স্থির করে খুঁজতে না গেলে, এই বাড়ির সন্ধান পাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।
এয়ার আলি খান জমিদার বাড়ির টিকে থাকা একমাত্র অংশনতুন ও অচেনা আগন্তুক দেখে বাড়ির ভেতর থেকে তিনজন মুরব্বি নেমে এলেন। কোনো নারীকে আজ অবধি এই বাড়ির খোঁজে আসতে দেখেননি, ফলে কিছুটা সন্দেহ, কিছুটা আগ্রহ নিয়ে তাঁরা জানতে চাইলেন আমার আগমনের উদ্দেশ্য। ব্যাখ্যা দেওয়ার পর সানন্দেই গল্প করলেন আমার সঙ্গে।
উত্তরসূরিরা জানালেন, তাঁরা সম্ভবত পঞ্চম বা ষষ্ঠ বংশধর হবেন। পরিত্যক্ত ভবনটির বয়স আনুমানিক ২০০ বছর। অনলাইনের কিছু লেখায় দেখেছি ভবনটি মোগল স্থাপত্য। বিষয়টি সঠিক নয়। পূর্বপুরুষদের জমিদারি শুরু হয়েছিল মোগল আমলে। তিন বরিষ্ঠের মধ্যে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে এসব তথ্য আমরা শুনেছি। কতটুকু সত্য জানা নেই।’ সতেরো শ শতাব্দীতে চট্টগ্রাম আসেন হামজা খাঁ। তিনি কোন দেশ থেকে চট্টগ্রামে আসেন, সঠিক জানা যায়নি।
এয়ার আলী খান-বাড়ি সড়কসম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে জমিদারি লাভ করেন। তাঁর নামে চট্টগ্রামে একটি এলাকা রয়েছে। সেখানে হামজা খাঁ নামে একটি মসজিদও রয়েছে। সেটা আবার নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে; কিন্তু মসজিদের ভেতরে পুরোনো শিলালিপি আছে। আমি দেখেছি। হামজা খাঁর পাঁচ ছেলে—শেরবাজ খান, টেকবাজ খান, নসরত খান, এয়ার আলী খান ও মনা খান। চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের নামকরণ হামজা খাঁর পাঁচ পুত্রের নামানুসারে। পাঁচ অর্থ পাঁচজন, হামজা খাঁর পাঁচ পুত্রকে বোঝানো হয়েছে। ফারসি শব্দ লাইশ অর্থ বাঘ।
জানা যায়, হামজা খাঁর পাঁচ পুত্র ছিলেন সুদর্শন ও সুঠামদেহী। পাঁচলাইশের এয়ার আলী খান বাড়ি, মনা খান বাড়ির বাসিন্দারা হামজা খাঁর বংশধর। চট্টগ্রামের বিবিরহাটের নামকরণ হয়েছে হামজা খাঁর মেজ বিবির নামে। ছোট বিবির কবরও রয়েছে ওয়াজেদিয়া মসজিদে। যেটি মাইজ্যা (মেজ) বিবির মসজিদ নামে পরিচিত ছিল।
খান-বাড়ির চত্বরে দ্বিতল মাটির বাড়িএয়ার আলী খানের জমিদারি ফটিকছড়ি, চকরিয়া, কুতুবদিয়া, রাউজানের কদলপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত ছিল। বর্তমানে যে স্থাপনাটি রয়েছে, তার চারপাশে আরও স্থাপনা ছিল উল্লেখ করে উত্তরসূরিরা বলেন, মূল ভবনটি ছিল দোতলা। এই ভবনের দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে আরও ভবন ছিল। হামজা খাঁ কোন দেশ থেকে এসেছেন, তার কোনো দলিল বা ইতিহাস সুস্পষ্টভাবে কোথাও লেখা নেই। তবে তুরস্ক থেকে আসার সম্ভাবনা বেশি। মোগল আমল থেকেই হামজা খাঁর জমিদারি ছিল। তিনি ছিলেন এই এলাকার প্রথম দিকের জমিদার।
জানতে চেয়েছিলাম এয়ার আলী খান হাট কোথা হতে শুরু হয়েছে এবং এই জমিদারির আয়তন বর্তমানে কত? সঠিক আয়তন কেউই জানেন না। তবে এলাকাটি বিশাল। সড়কের নাম খানবাড়ি সড়ক; কেউ কেউ বলেন মিয়াবাড়ি সড়ক।
পুরো এলাকাটিই এয়ার আলীর নামেএয়ার আলী খান হাটের নাম বদল হয়ে নয়ারহাট হয়েছে। সেখানে একটি স্কুলও রয়েছে। খানবাড়ি সড়কের পাশে তাদের পারিবারিক কবরস্থান দেখতে পেলাম। এয়ার আলী খান বাড়ির শেষ অংশটুকু কত দিন টিকে থাকবে কে জানে। পাঁচলাইশ জমিদারির অল্প কিছু তথ্য জেনে দ্রুত রওনা হই বহদ্দারহাটের উদ্দেশে। কারণ, বিকেলের ট্রেনেই ঢাকায় ফেরার কথা।
ছবি: লেখক