রবিন ফন পার্সিকে কেন ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’ বলা হয়
· Prothom Alo

‘পাইরেটস অব দি ক্যারিবিয়ান’ মুভির বিখ্যাত জাহাজ ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’-এর কথা মনে আছে? অভিশপ্ত সেই জাহাজ মৃত আত্মাদের নিয়ে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়। ঝড়ের রাতে সমুদ্রে ফ্লাইং ডাচম্যানের ডাক যেন অশনিসংকেত। কল্পগাঁথা অনুযায়ী ১৭ শতকে ক্যাপ্টেন ফিলিপ ফন ডার ডেকেন রাজত্ব করে বেড়াতেন উত্তাল সমুদ্রে। ভীষণ একরোখা আর জেদি নাবিকের কাছে সমুদ্র ছিল এক খেলার পাত্র। সেই সমুদ্রই একদিন প্রতিশোধ নিল তাঁর বিরুদ্ধে। সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করে সমুদ্রেই হারিয়ে যান তিনি। বেঁচে থাকেন এক অশরীরী ছায়া হয়ে। জেদি ক্যাপ্টেন জাহাজ নিয়ে পারে ভিড়তে পারেননি বটে, কিন্তু এখনো তাঁর দেখা পাওয়া যায় ঝড়ের উত্তাল সমুদ্রে।
Visit mwafrika.life for more information.
মনে হতে পারে বিশ্বকাপের লেখায় ফ্লাইং ডাচম্যান কোত্থেকে এল! ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’ জাহাজের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও নামটা মিশে আছে নেদারল্যান্ডসের ফুটবলার রবিন ফন পার্সির সঙ্গে। ২০১৪ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে পুরো বিশ্ব কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এর আগের আসরে অর্থাৎ ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছিল স্পেন। এর পর থেকেই ডাচদের মনে জেঁকে বেসেছিল প্রতিশোধের নেশা। ২০১৪ বিশ্বকাপে যখন ঘোষণা এল, দেখা গেল দুই ইউরোপিয়ান দল পড়ছে একই গ্রুপে। ডাচদের মনে আবারও জেগে ওঠে প্রতিশোধের নেশা। স্প্যানিশ টিকিটাকাকে বিধ্বস্ত করতে না পারলে যেন ডাচদের প্রতিশোধ অপূর্ণই থেকে যাবে।
সুয়ারেজের ‘কামড়কাণ্ড’প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররাও অবাক।প্রথমার্ধেই ১-০ গোলে এগিয়ে যায় স্পেন। পিছিয়ে থেকেই প্রথমার্ধ শেষ করতে হবে, এমন ভাবনা যখন সবার মনে, তখনই বাঁ পাশ থেকে উড়ে আসে বল। ডেলি ব্লিন্ড মাঝমাঠের কিছুটা ওপর থেকে বক্সের ভেতর এক অবিশ্বাস্য লম্বা বল বাড়ান। বল যখন বাতাসে ভাসছে, তখন সবাই ধরেই নিয়েছিল বলটা হয়তো সহজেই ধরে ফেলবেন ক্যাসিয়াস। ফন পার্সি সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও বলের নাগাল পাবেন না। কিন্তু সবার কল্পনাকে হার মানিয়ে দিয়ে তিনি যা করলেন, তার ব্যাখা শুধু দুই শব্দেই দেওয়া সম্ভব—ফ্লাইং ডাচম্যান!
সবাইকে অবাক করে দিয়ে ফন পার্সি ভেসে উঠলেন শূন্যে। মাটি থেকে প্রায় তিন ফুট উঁচুতে ভেসে উঠে ফন পার্সি করলেন এক অবিশ্বাস্য ‘ডাইভিং হেড’। স্পেনের ইতিহাসের সেরা গোলরক্ষক ইকার ক্যাসিয়াস স্রেফ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন মাথার ওপর দিয়ে বল জড়িয়ে গেল জালে। ফন পার্সি শুধু লাফিয়ে ওঠেননি, যেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বাতাসে স্থির হয়ে গিয়েছিলেন। ফন পার্সির ভেসে থাকার পোজ এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে ইন্টারনেটে ‘পার্সিয়িং’ নামের এক ট্রেন্ড শুরু হয়ে গিয়েছিল, যেখানে সবাই তাঁর মতো করে ডাইভ দেওয়ার ভিডিও আপলোড করছিল টুইটারে।
টিম ক্রাল: টাইব্রেকারের নায়কইকার ক্যাসিয়াস হতবাক হয়ে দেখছেন সেই গোল।ফন পার্সি পরে একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছিলেন, ‘এটা কোনো টেকনিক ছিল না, কোনো স্কিলও ছিল না। পুরোটাই ছিল আমার বিশ্বাস। যে আমি লাফ দিলে ছুঁতে পারব। আর যদি মাথা কোনোমতে ছোঁয়াতে পারি, তাহলেই গোল। নেদারল্যান্ডস যে শেষ হয়ে যায়নি, বিশ্বমঞ্চে যে আবারও নেদারল্যান্ডস মাথা তুলে দাঁড়াবে, তার প্রতিশ্রুতি ছিল এই গোল।’
ফন পার্সি যেন সত্যি সত্যিই ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’ হয়ে হাজির হয়েছিলেন। ওই গোলেই আত্মবিশ্বাস তলানিতে পৌঁছে গিয়েছিল স্পেনের। ম্যাচটি নেদারল্যান্ডস জিতেছিল ৫-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে। বিশ্বজয়ী দল এতটাই মুখ থুবড়ে পড়েছিল যে গ্রুপ পর্বের গণ্ডিও পেরোতে পারেনি। ইকার ক্যাসিয়াসের দুর্দান্ত ক্যারিয়ার শেষ হয়েছিল ফ্লাইং ডাচম্যানের কাছে পরাস্ত হয়ে। আর রবিন ফন পার্সি বিশ্বকাপ ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন উড়ন্ত এক পাখি হয়ে।
ওয়াকা ওয়াকা গান, ভুভুজেলা বাঁশির সঙ্গে তিকিতাকার জয়োধ্বনি