বিনিয়োগ সচল না হলে সবকিছু আটকে যাবে: মাসরুর রিয়াজ
· Prothom Alo

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেছেন, দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণে বিনিয়োগকে সচল করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিনিয়োগ যদি সচল করা না যায়, তবে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বৈচিত্র্যকরণ এবং উৎপাদনশীলতা—সবকিছুই আটকে যাবে।
Visit grenadier.co.za for more information.
মাসরুর রিয়াজ আরও বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ‘তলানিতে’ এসে ঠেকেছে, যা থেকে উত্তরণে বড় ধরনের সংস্কার অপরিহার্য।
আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলো আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় মাসরুর রিয়াজ এ কথা বলেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত সোনারগাঁও হোটেলে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বর্তমান সময়কে একটি বহুমাত্রিক সংকটের কাল হিসেবে অভিহিত করে অনুষ্ঠানে এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতির চাকা ধীর হয়ে গেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে (৪ দশমিক ৭ শতাংশ) নেমে এসেছে। এটি বিনিয়োগের জন্য এক অশনিসংকেত।’
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অনুষ্ঠানে জানান মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ পরিবেশ এখন একটি ভাঙা ঘর। এই বাড়ি মেরামত না করে যদি আমরা ভাড়াটে বা বিনিয়োগকারী খুঁজতে যাই, তবে তারা হতাশ হয়ে ফিরে যাবে। গত ১৮ মাসে (অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে) কিছু বিচ্ছিন্ন সংস্কার হয়েছে, যাকে আমি বলব “মিকি মাউস” রিফর্ম। এমন ছোটখাটো সংস্কার দিয়ে বিনিয়োগের বড় বাধা দূর করা সম্ভব নয়।’
মাসরুর রিয়াজ আরও বলেন, মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) তুলনায় বিনিয়োগের হার বর্তমানে প্রায় ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। এই স্থবিরতা ভাঙতে না পারলে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বিনিময় হারের অস্থিরতা আরও বাড়বে।
সংকটের তিন মাত্রা
মাসরুর রিয়াজ তাঁর বক্তব্যে বর্তমান সংকটকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমত, অর্থনীতির শ্লথগতি যা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং রাজস্ব আহরণকে বাধাগ্রস্ত করছে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সুশাসনের চরম বিপর্যয়। তৃতীয়ত, সংস্কারের স্থবিরতা। এ অবস্থায় আগামী বাজেট দর্শনে তিনটি বিষয় থাকা বাধ্যতামূলক বলে মনে করে মাসরুর রিয়াজ। এক. ভঙ্গুর ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতকে টেনে তোলা; দুই. অভ্যন্তরীণ পলিসি ফেইলিউর বা বৈশ্বিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা তৈরি করা এবং তিন. প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তিগুলোকে বহুমুখী করা।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, আমাদের উৎপাদনশীল সক্ষমতা গত ১৫ বছরে থমকে গেছে। অবকাঠামোতে ব্যয় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়াতে দক্ষতা, প্রযুক্তি বা মানবসম্পদে বিনিয়োগ হয়নি। নদীর নিচ দিয়ে টানেল করা হয়েছে অথচ ডানে-বাঁয়ে অর্থনৈতিক সংযোগ নেই—এমন বিনিয়োগ অর্থনীতির সমৃদ্ধিতে কাজে আসে না। আমরা ভারত, থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের চেয়ে উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে আছি।
‘বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিন’
আগামী বাজেটের জন্য ধ্রুবতারা হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যমূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও তা মোটেও শক্তিশালী অবস্থানে নেই। ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য যে পরিমাণ আমদানি প্রয়োজন, সেই চাপ সামলানোর মতো রিজার্ভ আমাদের নেই। যদি মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী ধারা চলতেই থাকে, তবে টাকার মানে বড় ধরনের অবমূল্যায়ন আসবে।’
বাজেট বাস্তবায়নে মাসরুর রিয়াজ তিনটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যেহেতু আগামী বছরেও রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হবে না, তাই সরকারকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বা বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হবে। যে প্রকল্পগুলো থেকে বাণিজ্যিক রিটার্ন আসার সম্ভাবনা আছে, সেখানে সরকারি টাকা খরচ না করে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। দ্বিতীয়ত, বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো উচিত। মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাজেটে কখনোই সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। তৃতীয়ত, কেবল উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বা ‘অ্যাসপিরেশনাল প্ল্যান’ তৈরি করলেই হবে না; এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘আমাদের অনেক ভালো পরিকল্পনা আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন না হলে সেই কথাগুলো কেবল কথাই থেকে যাবে। জনগণের ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির যে ব্যবধান, তা ঘোচাতে হলে যা বলছি তা কাজে করে দেখাতে হবে।’