১ লাখ কোটি টাকার কোরবানির বাজার: আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী শিক্ষা দেয়

· Prothom Alo

কোরবানিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই জমে ওঠে কোরবানির হাট বা পশুর বাজার। এই হাটগুলো শুধু বেচাকেনার স্থান নয়, বরং আমাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ধর্মীয় অনুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, এবার কোরবানিকে ঘিরে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বা বাজারের আকার এক লাখ কোটি টাকার বেশি হতে পারে, যা এ খাতের ব্যাপক অর্থনৈতিক গুরুত্বকে তুলে ধরে। তবে এই বৃহৎ আয়োজনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও পশুকল্যাণের নানা বাস্তবতা, যা অনেক সময় আমাদের নজরের বাইরে থেকে যায়। তাই কোরবানির হাটকে শুধু উৎসবের অংশ হিসেবে নয়, বরং একটি স্বাস্থ্যসম্মত, সুশৃঙ্খল ও মানবিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্র হিসেবে দেখা জরুরি।

Visit syntagm.co.za for more information.

বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ থেকে ১ দশমিক ২ কোটি পশু কোরবানি করা হয়, যার বড় একটি অংশ এই হাটগুলো থেকে ক্রয় করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক পশুর সমাগম, মানুষের ভিড়, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে হাটগুলোতে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ সংক্রামক রোগ প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। তাই এই বড় আয়োজন জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে যদি পশুর স্বাস্থ্য নিশ্চিত না হয়। বিশেষ করে ঢাকাসহ বড় শহরের অস্থায়ী হাটগুলোতে এই সমস্যা আরও প্রকট।

এ প্রেক্ষাপটে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর সাম্প্রতিক তথ্য পরিস্থিতির একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে। তিনি জানান, এ বছর কোরবানির জন্য দেশে পশুর সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। এর বিপরীতে দেশে প্রাপ্যতা রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু। সে হিসাবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। এই পরিসংখ্যান দেশীয় উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার ইঙ্গিত দেয়, তবে একই সঙ্গে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

মন্ত্রী আরও বলেন, সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। রাজধানী ঢাকায় উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টিসহ মোট ২৭টি হাট নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক হাটের কার্যকর ব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, কোরবানির হাটে পশুর স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক সময় দূরদূরান্ত থেকে পশু এনে হাটে তোলা হয়, কিন্তু সেগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা যথাযথভাবে করা হয় না। ফলে অসুস্থ বা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত পশুও বাজারে চলে আসে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৬০ শতাংশের বেশি সংক্রামক রোগ প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স ও ব্রুসেলোসিসের মতো রোগ এখনো জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই হাটে ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিমের উপস্থিতি এবং পশুর স্বাস্থ্য সনদ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

দ্বিতীয়ত, পশু পরিবহন ও হ্যান্ডেলিংয়ের বিষয়টি কোরবানির হাটে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়। বাস্তবে দেখা যায়, পশুগুলোকে ট্রাকে গাদাগাদি করে আনা হয়, অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি বা বিশ্রাম ছাড়া রাখা হয়। এতে পশুর মধ্যে তীব্র স্ট্রেস তৈরি হয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, এ ধরনের স্ট্রেস শুধু পশুর কষ্টই বাড়ায় না, বরং মাংসের গুণগত মানও কমিয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ট্রেসে পশুর মাংসের গুণগত মান ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তাই পরিবহনে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

অনেক ক্ষেত্রে পশুকে লাঠি দিয়ে আঘাত করা, টেনেহিঁচড়ে ওঠানো বা নামানো হয়, যা সম্পূর্ণ অমানবিক। পশুকে পরিবহনের সময় পর্যাপ্ত জায়গা, পানি ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত গরমে ছায়ার ব্যবস্থা রাখা এবং ওঠানামার জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা (র‍্যাম্প) ব্যবহার করা জরুরি।

তৃতীয়ত, হাটের পরিবেশ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক হাটেই কাদা, পশুর বর্জ্য ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখা যায়, যা রোগজীবাণু বিস্তারের জন্য অনুকূল। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। অপরিকল্পিতভাবে পশুর মলমূত্র ও বর্জ্য জমে থাকলে তা পানি ও মাটির দূষণ ঘটায় এবং আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। তাই হাট এলাকায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জীবাণুনাশক ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

চতুর্থত, হাট ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসন যদি পরিকল্পিতভাবে হাট স্থাপন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য অপসারণ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে, তাহলে অনেক সমস্যাই কমে আসে। নির্ধারিত স্থানে হাট বসানো, রাস্তা দখল না করা এবং আশপাশের পরিবেশ রক্ষা করা—এসব বিষয় কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: আমাদের জন্য শিক্ষণীয় দিক

বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে কোরবানির হাট ও ব্যবস্থাপনায় কিছু ভালো চর্চা লক্ষ করা যায়, যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। সৌদি আরবে কোরবানির সময় পশু ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সুসংগঠিত। সেখানে নির্দিষ্ট জবাইকেন্দ্রে প্রশিক্ষিত কর্মীর মাধ্যমে কোরবানি সম্পন্ন করা হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিচালিত হয়। ফলে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশে কম থাকে।

তুরস্কে কোরবানির পশুর হাট নির্ধারিত ও পরিকল্পিত স্থানে বসানো হয়, যেখানে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা অবকাঠামো থাকে। স্থানীয় সরকার ভেটেরিনারি টিম নিয়োজিত রাখে, যারা পশুর স্বাস্থ্য যাচাই করে এবং অসুস্থ পশু বাজারে প্রবেশ করতে দেয় না।

মালয়েশিয়ায় পশু পরিবহন ও হ্যান্ডেলিংয়ের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম রয়েছে। পশুকে অমানবিকভাবে পরিবহন বা আঘাত করা আইনত দণ্ডনীয়। একই সঙ্গে কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণ ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা দেখায় যে সঠিক পরিকল্পনা, আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে একটি স্বাস্থ্যসম্মত ও মানবিক কোরবানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

এই অভিজ্ঞতাগুলো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—আমাদেরও সমন্বিত উদ্যোগ, শক্তিশালী প্রশাসনিক তদারকি ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া কোরবানির হাটকে আরও উন্নত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। অনেক জায়গায় এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পশু কেনাবেচা শুরু হয়েছে, যা ভিড় কমাতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি পশুর স্বাস্থ্য তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করলে ক্রেতারা আরও সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও কোরবানির হাট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি শুধু বাণিজ্য নয়, বরং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার একটি ক্ষেত্র। তবে এই কার্যক্রম যেন পরিবেশদূষণ বা জনদুর্ভোগের কারণ না হয়, সেদিকে সবার খেয়াল রাখা উচিত। বিক্রেতাদের যেমন ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তেমনি ক্রেতাদেরও সচেতন আচরণ করা জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, কোরবানির হাট আমাদের ধর্মীয় উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এটি জনস্বাস্থ্য ও পশুকল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সঠিক পরিকল্পনা, প্রশাসনিক নজরদারি, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়ে আমরা একটি স্বাস্থ্যসম্মত, পরিবেশবান্ধব ও মানবিক কোরবানির হাট নিশ্চিত করতে পারি। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন আমরা এই ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও পশুর কল্যাণকেও সমান গুরুত্ব দেব।

  • ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। [email protected]

Read full story at source