চিলি: এক দেশ, বহু পৃথিবী ৮

· Prothom Alo

চিলির চারুকলা জাদুঘরে ইতিহাস, শিল্প আর মানবিকতার বহুস্তর গল্প যেন একসঙ্গে উন্মোচিত হয় আমার সামনে। ডেভিড থেকে মেরি, ভাস্কর্য থেকে চিত্রকলা—সবকিছু মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে শিল্প, স্মৃতি ও মানুষের অন্তর্লোক আবিষ্কারের এক মুগ্ধকর যাত্রা।

Visit grenadier.co.za for more information.

চিলির চারুকলা

প্রবেশ করতেই আমার শুভদৃষ্টি হলো ডেভিডের সঙ্গে। ডেভিড শুধু তাঁর মাথাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, অবশিষ্ট শরীর নেই। ডেভিডকে প্রথম নির্মাণ করেছিলেন শিল্পী মাইকেলেঞ্জেলো, সেটি তিনি ১৫০১ সালে শুরু করে চার বছর ধরে গড়েছেন। এখানে আমি যে ডেভিডকে দেখছি, এটি তাঁর মূল ভাস্কর্য নয়। ডেভিডের মাথা এর আগে আমি ইউরোপের কোনো এক জাদুঘরে দেখেছি। ডেভিড একটি জনপ্রিয় ভাস্কর্যের বিষয়।

নানা ধরণের ভাস্কর্য

আমি স্থির দাঁড়িয়ে ডেভিডের সামনে। ওর চোখের দৃষ্টিতে গোলিয়াথের সঙ্গে যুদ্ধের আগে যে উত্তেজনা, তা ফুটে উঠেছে। মুখ টানটান। ঠোঁট ও ভ্রুর ভঙ্গিতে সাহসের সূক্ষ্ম প্রকাশ। মাথা ও ঘাড়ে দৃঢ়তা। বুদ্ধিমান নায়ক ডেভিড। ফ্লোরেন্স শহরের স্বাধীনতার প্রতীক এখানে এই চিলির জাদুঘরে এসেও নির্ভীক।

শুনেছি, এককালে শিক্ষার অংশ হিসেবে বিখ্যাত ভাস্কর্যগুলো, বিশেষ করে রেনেসাঁকালের ভাস্কর্যগুলোর প্লাস্টার কাস্ট বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো। শিল্পীরা বা শিক্ষার্থীরা যাতে এই কাজগুলো অনুসরণ করে অ্যানাটমি ও শরীরের অনুপাত সম্পর্কে জানতে পারে সে কারণে। প্লাস্টার কাস্ট হলো আসল কাজের ছাঁচ থেকে তৈরি প্রতিরূপ। আমি অবাক বিস্ময়ে ভাবছি ফ্লোরেন্সের রেনেসাঁকালের মহানায়ক ডেভিড যেমন আন্দেজ পর্বতমালার কাছে আর আমি কিনা এক দক্ষিণ এশীয় নারী, এসে দাঁড়িয়েছি ওদের কাছে! এ জাদুঘরে ডেভিড যতটা স্থির, আমি ততটাই অস্থির।

আরেকটি ভাস্কর্যে মেরির কোলে যিশু। এটি বিখ্যাত পিয়েতা ধাঁচের ভাস্কর্য। মেরি এখানে ভীষণ শোকাহত। কারণ, যিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। সম্ভবত ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স বাসিলিকায় আমি মূল ভাস্কর্যটি দেখেছি। মেরির মাথা এখানে নত। যিশুর শরীর ভারহীনভাবে ঝুলে আছে। দুপাশ থেকে বেশ কয়েকজন তাঁকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। পুরো কাজটি মার্বেলে তৈরি। খুব আবেগপূর্ণ ভাস্কর্য। পিয়েতা ঘরানার ভাস্কর্যের জন্য বিখ্যাত মাইকেলেঞ্জেলো। আমি মেরির পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। মেরির পাশে আমি একজন সমকালীন নারী। আমাদের দুজনের সময়ের ব্যবধান কয়েক সহস্রের কিন্তু শোকের ভাষা চিরকালীন।  
একটি ছবি তুলতে ইচ্ছে করছে। চারদিকে কাউকে খুঁজছি। একা ভ্রমণ করার সুবিধা আছে যেমন, আছে অনেক অসুবিধাও। একটা অসুবিধা হলো ছবি তুলে দেওয়ার জন্য মানুষ খুঁজতে হয়।  

চিলির সান্তিয়াগোতে অবস্থিত চিলির জাতীয় চারুকলা জাদুঘর (Museo Nacional de Bellas Artes) এটি। দক্ষিণ আমেরিকার প্রাচীনতম জাদুঘর। ১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত। শুনেছি মাঝখানে একবার পুড়ে গিয়েছিল। এই ডিম্বাকৃতির ভবনটি চারুকলা প্রাসাদ নামেও পরিচিত। এ ভবনটি ১৯১০ সালে নির্মিত হয়। সেবার চিলির স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৯১০ সালে এটি তৈরি হয়। এই জায়গাটিকে বলে পার্ক ফরেস্টাল। এর পেছনেই আছে শিল্প জাদুঘর।  

বামে মা মেরি ও যিশুর ভাস্কর্য

রেবেকা মাতে চিলির প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নারী ভাস্কর। তাঁর কয়েকটি ভাস্কর্যে মানবদেহের বাস্তবধর্মী উপস্থাপনা আছে দেখছি এখানে। শরীরের শক্তি, যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। মার্বেলের ভেতরে জমে আছে নীরব আর্তনাদ। আলো-ছায়ায় গড়েছেন শরীরের টান ও পতনের ট্র্যাজেডি।  

পাশেই আছে মা-সন্তানের একটি ভাস্কর্য। এর শিল্পী মারতা কলভিন। মাতৃত্বের শক্তি পুরো কক্ষকে আলোকিত করে রেখেছে। ইতালীয় ও ফরাসি শিল্পীরা বারবার দেব–দেবী, নারী চরিত্র ও পৌরাণিক নানা চরিত্র নিয়ে ভাস্কর্য গড়েছেন। এখানেও তার প্রভাব স্পষ্ট অথবা বলা যায় ইতালি-ফরাসি থেকেই এ শিল্প বিস্তৃত হয়েছে এখানে। মা-শিশু ভাস্কর্যের দুই পাশে দুই নগ্ন পুরুষ মূর্তি। ওরা দাঁড়িয়ে। ওদের হাত উঁচু, টানটান পেশি, গতিশীল ভঙ্গি। মনে হয় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অবয়বে বীরত্ব।

মাঝেরটা মা ও সন্তানের

মাথার ওপর স্বচ্ছ কাচ দিয়ে ছাদ করা হয়েছে এ জাদুঘরের। কক্ষে কৃত্রিম আলোর দরকার পড়ছে না। এই ছাদ নাকি বেলজিয়ামে তৈরি হয়েছে, পরে এখানে আনা হয়েছে।  

বিভিন্ন শিল্পীর পেইন্টিং

দোতলায় উঠে দেখি ঔপনিবেশিক কাল থেকে সমসময় পর্যন্ত চিলির পেইন্টিং কক্ষ থেকে কক্ষে শোভা পাচ্ছে। আছে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও নেদারল্যান্ডসের পুরোনো এবং আধুনিক শিল্পকর্ম। ১৫-১৭ শতকের ইতালীয় ড্রয়িং, আফ্রিকান ভাস্কর্য ও ফটোগ্রাফি আছে।

কক্ষগুলোকে থিম্যাটিক প্রদর্শনী কক্ষ মনে হচ্ছে। এর সবটা ঠিকঠাক বোঝা আমার মতো মানুষের পক্ষে কঠিন। এক কক্ষে দেখছি অনেকগুলো চেয়ার। বসার চেয়ারের মতোই কিন্তু বসার জন্য নয়, প্রদর্শনীর অংশ। চেয়ারগুলো একটি বিন্যাসে সাজানো।
একটি সৈনিকের মতো ব্রোঞ্জমূর্তি হাঁটু গেড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক চেয়ারে। দেয়ালে মানুষের সুবিশাল পেইন্টিং। এ খালি চেয়ার কি ‘মানুষের অনুপস্থিতি’ বা হারিয়ে যাওয়া কাউকে নির্দেশ করছে? এই দখিনের সবকিছুই পরাবাস্তব মনে হয়। এ বাস্তবের অতীত। অথবা এ চেয়ারগুলো কি স্কুল, আদালত, সামরিক কাঠামো বা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দিচ্ছে? চিলির ইতিহাসে সামরিক শাসন তো ছিল।

চেয়ার যখন ভাস্কর্য

খালি চেয়ার রাজনৈতিক নিপীড়ন, ক্ষমতার কাঠামো, নিখোঁজ মানুষ বা দমন-পীড়নের স্মারকও হয়তো হবে। দেয়ালের চিত্রকলায় মানবশক্তি বা বলা যেতে পারে সংগ্রামরত মানুষ দেখতে পাচ্ছি। একটা দেয়ালচিত্রে ভাঙা পাথর থেকে মানুষ বেরিয়ে আসছে—এমন দেখছি বলে মনে হলো। এক দেয়ালে শতরঞ্চির মতো কিছু দেখলাম নাকি কাপড় সেটি? বুঝতে পারলাম না, যা বুঝতে পারলাম, তা হলো দেখতে ঠিকঠাক আমাদের জামদানির নকশা। আমাদের জামদানির নকশা ওখানে কী করে গেল?

চিলির চারুকলা জাদুঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে ডেভিড আর গোলিয়াথের কাহিনিটা মনে পড়ল। ডেভিড তরুণ মেষপালক আর গোলিয়াথ যোদ্ধা। শক্তিশালী গোলিয়াথকে কপালে শুধু একটা গুলতি বা পাথর মেরে পরাজিত করেছিল ডেভিড। চরম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দুর্বলের বিজয়ের কাহিনি এটি। কখনো কখনো এমন হয় বৈকি। খরগোশ কতশতবার দৌড়ে জিতল কিন্তু কচ্ছপ একবার খরগোশকে হারিয়ে ইতিহাস হলো। রেনেসাঁস সময়ে ডেভিডকে সাহস ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে ভাবা হতো।

আমাদের জামদানির মতো ডিজাইন

মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এক ভদ্রমহিলার কাছে জানতে চেয়েছি কাছের মেট্রো স্টেশন কোন দিকে। ওরে সর্বনাশ! মহিলা তাঁর স্বামী, মেয়ে আর বোনকে বগলদাবা করে এগিয়ে এল আমাকে মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে দিতে। আমি যতই বলি আমি একা যেতে পারব। মহিলা নাছোড়বান্দা। বলল, ‘এই রাস্তায় মোবাইল ছিনতাই হয়, তোমাকে একা ছাড়ি কীভাবে?’ প্রায় আধা কিলোমিটারের মতো পথ আমার সঙ্গে এল ওরা চারজন। শেষ পর্যন্ত মানুষই মানবিক হয়! তাকে মানবিক হতেই হয়! মাঝেমধ্যে আমি দৈবে বিশ্বাস করি। আমার মাথা থেকে আমার প্রিয় লেখক প্রবীর ঘোষের ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ দূরে সরে যায়। মনে হয়, কেউ বা কারা পৃথিবীর আনাচ–কানাচে আমার জন্য সব থরে থরে সাজিয়ে রেখেছে। আমার শুধু কষ্ট করে পৌঁছালেই হবে।

ছবি: লেখক

Read full story at source