১২ বছর বয়সে ইউটিউবে 'পাগলামি' দিয়ে শুরু, ভাইরাল ওয়ার্ল্ড কাপ সং-এর 'আইশোস্পিড' এখন ৪৯০ কোটি টাকার মালিক

· Prothom Alo

এবারের ভাইরাল ওয়ার্ল্ড কাপ থিম সং 'চ্যাম্পিয়ন্স' গেয়েছেন ফুটবল-পাগল ইউটিউবার 'আইশোস্পিড'। মাত্র ২১ বছর বয়সে এই কিং অফ কেওস-এর মোট সম্পদ ৪৯০ কোটি টাকা।

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

ড্যারেন জেসন ওয়াটকিন্স জুনিয়র নাম তাঁর। তবে সবার কাছে এই জনপ্রিয় ইউটিউবার 'আইশোস্পিড' নামে পরিচিত। ইউটিউবে ৫ কোটি ৪০ লাখের (৫৪ মিলিয়ন) বেশি সাবস্ক্রাইবার পার করে ইন্টারনেট দুনিয়ায় নিজের অবস্থানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন এই ২১ বছর বয়সী তরুণ।

হাইও-র এক সাধারণ কিশোর একেবারে শুন্য থেকে শুরু করেছেন স্পিড

ওহাইও-র এক সাধারণ কিশোর একেবারে শুন্য থেকে শুরু করে ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সোলো কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে ৫ কোটির মাইলফলক স্পর্শ করার এই গল্পটি ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী ঘটনাগুলোর একটি। ওয়াটকিন্স তার স্বভাবসুলভ উন্মাদনা ও উচ্চমাত্রার পজিটিভ এনার্জিকে সফলভাবে এক মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বিনোদন সাম্রাজ্যে রূপান্তর করেছেন।

পারিবারিক পটভূমিতেই কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের অনুপ্রেরণা

২০০৫ সালের ২১ জানুয়ারি ওহাইও-র সিনসিনাটির একটি সাধারণ এলাকা বন্ড হিলে ওয়াটকিন্স জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছে বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের কঠিন আবহে। মা টিফানি এলিজাবেথ গ্রেভস একজন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে অনেক কষ্ট করে তাদের পাঁচ ভাই-বোনকে বড় করেছেন। ওয়াটকিন্সের পরিবারে ডিজিটাল প্রতিভা এবং ইতিহাসের এক চমৎকার মিশ্রণ রয়েছে। তার বাবা ড্যারেন ওয়াটকিন্স সিনিয়র নিজেও একজন অনলাইন ব্যক্তিত্ব, যাকে ভক্তরা "ড্যাডিস্পিড" নামে চেনেন।

স্পিডের মা-বাবাবাবার সঙ্গে স্পিড

স্পিডের ভাই ডায়ানও অনলাইন কনটেন্ট তৈরি করে। অন্যদিকে, বাবার বংশসূত্রে স্পিড হলেন ডেট্রয়েট ফায়ার ডিপার্টমেন্টের ইতিহাসের প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান ফায়ার চিফ হ্যারল্ড ওয়াটকিন্সের প্রপৌত্র। তার এই নাটকীয় পারিবারিক জীবনের একটি ঝলক দেখা যায় লাইভ স্ট্রিমিং চলাকালীন। একদিন তাঁর বাবা লাইভ ব্রডকাস্টে আচমকা তাঁর এক অদেখা বায়োলজিকাল বোনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যা দেখে স্পিড পুরোপুরি নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন।

শুরুর দিকের সংগ্রাম ও 'কিং অফ কেওস'

আজকের এই মিলিয়ন ডলার উপার্জনের অনেক আগে ওয়াটকিন্সকে তীব্র মানসিক ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। মাত্র বারো বছর বয়স থেকেই বাস্তব জীবনের কঠিন পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে তিনি একজন ফুল-টাইম গেমিং ইউটিউবার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তবে তার অতিরিক্ত চিৎকার ও আগ্রাসী স্ট্রিমিং স্টাইল পরিবারের বাকি সদস্যদের সাথে প্রায়ই ঝামেলার সৃষ্টি করত।২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারির সময় এক বড় টার্নিং পয়েন্ট আসে, যখন তার একটি গেমিং রিঅ্যাকশনের ভিডিও 'ওয়ার্ল্ডস্টারহিপহপ'-এ পোস্ট করা হয়। এর ফলে তৈরি হওয়া নেতিবাচক অনলাইন ট্রোলিংয়ের কারণে বাড়িতে তীব্র অশান্তি শুরু হয়।

ওয়াটকিন্সকে তীব্র মানসিক ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছেস্পিড ও তার মা

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কিশোর ওয়াটকিন্সকে বাড়ি ছেড়ে ডেট্রয়েটে তার বাবার কাছে চলে যেতে হয়। ক্যারিয়ার নিয়ে মায়ের সাথে তীব্র মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও, স্পিডের মনে মায়ের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা রয়েছে; জানা গেছে যে তিনি প্রতি মাসে তার মাকে হাজার হাজার ডলার পাঠান যেন তার মা আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকেন।

খ্যাতির চূড়ায় আকস্মিক উত্থান

হাই স্কুলে ফুটবল খেলার সময় ওয়াটকিন্সের গতি দেখে সবাই তাকে "স্পিড" নামে ডাকত। ২০১৬ সালে এই নামটি নিয়েই তিনি ইউটিউব যাত্রা শুরু করেন। বছরের পর বছর খুব কম ভিউ নিয়েই তিনি এনবিএ ২কে ও ফোর্টনাইট গেমের স্ট্রিম চালিয়ে যান।২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে সবকিছু বদলে যায়।

তাঁকে কিং অফ কেওস নামে ডাকতেন অনেকেই

তাঁর কন্টেন্টের ধরনকে সোজা কথায় পাগলামিই বলা যায়। অনেকেই তাঁকে কিং অফ কেওস নামে ডাকতেন এজন্য। আর এর মাঝেই ক্যামেরার সামনে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করা, টেবিল চাপড়ে চিৎকার করা আর ফুটবল কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর প্রতি তাঁর অন্ধ ভালোবাসা টিকটকে ভাইরাল হতে শুরু করে।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর প্রতি তাঁর অন্ধ ভালোবাসা টিকটকে ভাইরাল হতে শুরু করে

ভক্তরা তার এই পাগলাটে মুহূর্তগুলোর ক্লিপ বানিয়ে শেয়ার করতে থাকলে তিনি রাতারাতি ইন্টারনেট মিম-এ পরিণত হন। এর ফলে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তার চ্যানেলে লাখ লাখ সাবস্ক্রাইবার যুক্ত হয়। ইন্টারনেট যে একদম খাঁটি ও অকৃত্রিম বিনোদন চাচ্ছে, তা বুঝতে পেরে তিনি ঘরের ডেস্ক ছেড়ে বিশ্বজুড়ে "ইন রিয়েল লাইফ" ট্রাভেল ব্রডকাস্ট শুরু করেন। ২০২৬ সালে আফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে তার সাম্প্রতিক সফরগুলো লাখ লাখ মানুষ লাইভে উপভোগ করেছে, যেখানে এই ডিজিটাল আইকনকে এক নজর দেখতে স্থানীয় রাস্তাঘাটে হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল।

ফুটবল কিট, স্ট্রিটওয়্যার এবং লাক্সারি লাইফস্টাইল

স্পিডের ফ্যাশন সেন্স তার জীবনযাত্রার মতোই—যা বিশ্ব ফুটবল সংস্কৃতি এবং হাই-এন্ড স্ট্রিটওয়্যারের এক দারুণ মিশ্রণ। তাঁকে প্রায়ই অফিসিয়াল অ্যাডিডাস ট্র্যাকসুট বা ব্রাজিল ও পর্তুগালের জাতীয় দলের জার্সি পরা অবস্থায় দেখা যায়।

স্পোর্টসোয়্যার পরতে পছন্দ করেন স্পিড

সাধারণ স্ট্রিটওয়্যারের ক্ষেত্রে স্পিড যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় লাক্সারি ব্র্যান্ড ব্রোকেন প্ল্যানেট, ফিয়ার অব গড এসেনশিয়ালস ও সুপ্রিম--এর মতো ব্র্যান্ড পছন্দ করেন। এর পাশাপাশি তিনি কাস্টমাইজড ছেঁড়া স্লিভলেস টি-শার্টের সাথে কাস্টম জুয়েলারি এবং একটি লাক্সারি গ্রিন রোলেক্স ঘড়ি পরতে ভালোবাসেন।বর্তমানে তিনি একটি মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের প্রাসাদে থাকেন এবং গ্লোবাল ট্যুরের জন্য প্রাইভেট জেটে যাতায়াত করেন।

নিজের বিলাসবহুল গাড়িতেও রোনালদো

তবে এত বিলাসবহুল জীবন সত্ত্বেও তার লাইফস্টাইল সবসময়ই সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার মতো। ঘানার কোনো সাংস্কৃতিক জাদুঘরে ঐতিহ্যবাহী ম্যাসাজ নেওয়া, নামিবিয়ার মরুভূমি ঘুরে দেখা বা আধুনিক হোটেলের লবিতে অদ্ভুত কোনো কান্ড ঘটানো—সবখানেই স্পিড একদম খাঁটি এবং স্বতঃস্ফূর্ত।

নামিদামি ব্র্যান্ডের স্পনসরশিপ ও ক্যাম্পেইন

করপোরেট ব্র্যান্ডগুলো খুব দ্রুতই বুঝতে পারে যে স্পিড মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষমতা রাখেন। ফলে সাধারণ ইনফ্লুয়েন্সার প্রমোর বাইরে গিয়ে তিনি এখন বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর সাথে কাজ করছেন। তার প্রধান করপোরেট পোর্টফোলিওগুলোর মধ্যে রয়েছে:

এক্সপিডিয়া: ট্রাভেল জায়ান্ট এক্সপেডিয়ার সাথে মিলে তিনি "এক্সস্পিডিয়া" নামক একটি বিশাল ক্যাম্পেইন করেন, যেখানে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের চারটি দেশে একদিনের একটি লাইভ স্ট্রিমিং ব্লিৎজ স্পনসর করা হয়।

বিটস বাই ড্রে: স্পিড এই ব্র্যান্ডের অফিসিয়াল গ্লোবাল ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন।

ক্যাশ অ্যাপ: জেন-জি প্রজন্মের ওপর তার প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ক্যাশ অ্যাপের সাথে তিনি একটি মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেন।

এক্সপিডিয়ার সঙ্গে অনেক জায়গায় ট্র্যাভেল করেন তিনি

ডিকস স্পোর্টিং গুডস: একটি বিশাল অ্যাথলেটিক রিটেল পার্টনার, যা প্রায়শই তার স্পোর্টস চ্যালেঞ্জ এবং ফিটনেস কনটেন্টগুলো স্পনসর করে।

মেটা: অকলি মেটা টেক-আইওয়্যার প্রজেক্টে তিনি কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং প্যাট্রিক মাহোমসের মতো গ্লোবাল সুপারস্টারদের সাথে কো-হেডলাইনার হিসেবে কাজ করছেন।

এছাড়াও, তিনি তার নিজস্ব ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম স্পিড স্টোর-এর মাধ্যমে সরাসরি আয় করেন, যেখানে তার এক্সক্লুসিভ "স্পিড এফসি" ফুটবল কিট, গ্রাফিক হুডি এবং ক্যাপ বাজারে আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায়।

চ্যাম্পিয়ন্স গানটি কেন সবার এত পছন্দ হলো

ফুটবল সংস্কৃতির সাথে স্পিডের গভীর সংযোগ তাকে একটি সফল মিউজিক ক্যারিয়ার গড়তে সাহায্য করেছে। ২০২২ সালের ওয়ার্ল্ড কাপ গানটি তাকে সংগীত জগতে পরিচিতি দিলেও, তার ফুটবল অ্যান্থেমের ক্রমাগত বিবর্তন এক অন্যরকম ইতিহাস তৈরি করেছে। তাঁর তৈরি করা এবারের চ্যাম্পিয়ন্স গানটি একটি ঐতিহাসিক ফিফা মাইলফলক অর্জন করেছে।

গানটি অফিসিয়ালি ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর অ্যালবামে স্থান পেয়েছে। এই হাই-এন্ড এনার্জেটিক গানটি এখন আর কেবল ইন্টারনেটের মিম নয়, বরং একটি সত্যিকারের বৈশ্বিক স্পোর্টস সাউন্ডট্র্যাকে পরিণত হয়েছে। অ্যাডিডাসের মতো নামিদামি ব্র্যান্ডগুলো তাদের বাণিজ্যিক ক্যাম্পেইনে গানটি ব্যবহার করছে, যা স্পিডকে ইন্টারনেট সাবকালচার এবং মেইনস্ট্রিম স্পোর্টস মার্কেটিংয়ের মাঝে একটি সফল সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সম্মাননা ও বিশাল সম্পদ

স্পিডের অর্জন শুধু ডিজিটাল সাবস্ক্রাইবার সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ২০২২ সালের স্ট্রিমি অ্যাওয়ার্ডসে "ব্রেকআউট স্ট্রিমার অফ দ্য ইয়ার" এবং পরবর্তীতে মূল "স্ট্রিমার অফ দ্য ইয়ার" খেতাব জয় করেন। এর পাশাপাশি তিনি মেইনস্ট্রিম স্পোর্টস এন্টারটেইনমেন্টেও পা রেখেছেন, যেখানে ডব্লিউডব্লিউই-র রয়্যাল রাম্বলের মতো বড় ইভেন্টে তাকে দেখা গেছে।

কিং অফ কেওস প্রমাণ করে দিয়েছেন যে নিজের ভেতরের পাগলামি আর সততা দিয়েই গোটা বিনোদন দুনিয়া জয় করা সম্ভব

এই অভূতপূর্ব খ্যাতি তাকে এনে দিয়েছে বিশাল আর্থিক সাফল্য। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের হিসাব অনুযায়ী, আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে আইশোস্পিডের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার যা ৪৯০ কোটি টাকার সমান প্রায়। প্রতি মাসে ইউটিউব অ্যাডসেন্স থেকে তাঁর আয় প্রায় ৭ লাখ থেকে ৯ লাখ ডলার, যার সাথে যুক্ত হয়েছে ব্র্যান্ড পার্টনারশিপ, নিজস্ব মার্চেন্ডাইজ এবং স্ট্রিমিং রেভিনিউ। মাত্র ২১ বছর বয়সে এই "কিং অফ কেওস" প্রমাণ করে দিয়েছেন যে নিজের ভেতরের পাগলামি আর সততা দিয়েই গোটা বিনোদন দুনিয়া জয় করা সম্ভব।

সূত্র: বিবিসি, ফোর্বস, উইকিপিডিয়া

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

Read full story at source