বাংলাদেশি পরিচয়ে গর্বিত, তবে আমি নিউহামের সবার মেয়র: ফরহাদ হোসেন

· Prothom Alo

যুক্তরাজ্যের লন্ডনের নিউহাম কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরহাদ হোসেন। কেননা, তিনি নিউহামের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র। যুক্তরাজ্যের মূলধারার কোনো বড় রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাহী মেয়র তিনি। গত ৭ মে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয়ভাবে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি বড় ধাক্কা খায়। তবে নিউহামে দলটির মনোনয়নে জয় পান ফরহাদ হোসেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা, নির্বাচনী সাফল্যের কারণ, নিউহামের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর লন্ডন প্রতিনিধি সাইদুল ইসলাম

মেয়র হওয়ার স্বপ্ন কি কখনো দেখেছিলেন? একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে এই যাত্রাকে কীভাবে দেখেন?

Visit moryak.biz for more information.

ফরহাদ হোসেন: নিউহামে বেড়ে ওঠার সময় আমার লক্ষ্য কখনো কাউন্সিলর বা মেয়র হওয়া ছিল না। আমার মূল মনোযোগ ছিল, সব সময় কমিউনিটির সেবা করা। একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে এই যাত্রা দেখায় যে নিউহাম তথা যুক্তরাজ্য মানুষকে কী ধরনের সুযোগ দিতে পারে। কঠোর পরিশ্রম, কমিউনিটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা, জনসেবার প্রতি অঙ্গীকার যে কাউকে তাঁর পটভূমি নির্বিশেষে নেতৃত্বের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। আমি আমার শিকড় (বাংলাদেশি পরিচয়) নিয়ে গর্বিত। যেসব বাসিন্দা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞ।

নিউহাম, তথা যুক্তরাজ্যের মূলধারার বড় রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাহী মেয়র হিসেবে ইতিহাস আপনি গড়েছেন। এই অর্জন আপনার কাছে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?

ফরহাদ হোসেন: এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ও বিনয়ী করে দেওয়া মুহূর্ত। আমি আশা করি, এটি তরুণ ব্রিটিশ-বাংলাদেশিসহ অন্যান্য কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া কমিউনিটিগুলোকে নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করবে। তবে এই অর্জনে গর্বিত হলেও আমার প্রধান লক্ষ্য হলো নিউহামের সব মানুষের মেয়র হওয়া। তাঁদের জীবনে বাস্তব ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।

জাতীয়ভাবে লেবার পার্টি ধাক্কা খেয়েছে। নিউহামেও কাউন্সিল আসন হারিয়েছে। কিন্তু আপনি মেয়র পদে জয়ী হয়েছেন। ভোটাররা কি ফরহাদ হোসেনকে ভোট দিয়েছেন, নাকি লেবার পার্টিকে?

ফরহাদ হোসেন: আমার বিশ্বাস, ভোটাররা ব্যক্তি ও তাঁর প্রতিনিধিত্ব করা মূল্যবোধ—উভয়কেই বিবেচনায় নিয়েছেন। এই ফলাফল দেখায় যে বাসিন্দারা স্থানীয় ইস্যুতে মনোযোগী। তাঁরা অভিজ্ঞ নেতৃত্ব চেয়েছেন। তাঁরা একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে রাজনৈতিক বাগ্‌বিতণ্ডার চেয়ে আবাসন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ সড়ক, উন্নত সেবার মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নিউহামে লেবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। গ্রিন পার্টি ও নিউহাম ইনডিপেনডেন্টস উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে কীভাবে ঐকমত্য তৈরি করবেন?

ফরহাদ হোসেন: বাসিন্দারা আশা করেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একসঙ্গে কাজ করবেন। যেখানে সাধারণ স্বার্থ রয়েছে, সেখানে আমি সব দলের কাউন্সিলর ও স্বতন্ত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে চাই। মতপার্থক্য থাকলেও আবাসন, জননিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, পরিবারকে সহায়তার মতো বিষয়ে আমরা সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে পারব বলে বিশ্বাস করি।

মেয়র হিসেবে প্রথম ১০০ দিনের জন্য আপনার তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার কী?

ফরহাদ হোসেন: প্রথমত, পাড়া-মহল্লাভিত্তিক সেবা ও রাস্তাঘাটের পরিচ্ছন্নতা উন্নত করা। দ্বিতীয়ত, এমন একটি ন্যায্য ও মানবিক পার্কিং নীতি বাস্তবায়ন করা, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে, কিন্তু বাসিন্দাদের অযথা শাস্তি দেবে না। তৃতীয়ত, পুলিশ ও স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে অপরাধ, অসামাজিক আচরণ মোকাবিলার মাধ্যমে কমিউনিটি নিরাপত্তা জোরদার করা। নির্বাচনী প্রচারের সময় মানুষ সবচেয়ে বেশি এসব বিষয়ই তুলে ধরেছেন।

আবাসন, পরিচ্ছন্নতা ও জননিরাপত্তা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

ফরহাদ হোসেন: আমাদের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। আরও সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ ও সরবরাহ করতে হবে। অসাধু বাড়িওয়ালা ও অতিরিক্ত জনাকীর্ণ বাসস্থানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। রাস্তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাড়াতে হবে। অবৈধভাবে ময়লা ফেলার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদার করে অপরাধ ও অসামাজিক আচরণ মোকাবিলা করতে হবে। বাসিন্দারা পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ পরিবেশ ও মানসম্মত আবাসনের অধিকার রাখেন।

নিউহামে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস। তাঁদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

ফরহাদ হোসেন: নিউহামে সাফল্যের জন্য আমি বাংলাদেশি কমিউনিটিকে ধন্যবাদ জানাই। আমাদের কমিউনিটি ব্যবসা গড়ে তুলেছে। পরিবারকে সহায়তা করেছে। নাগরিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমি সবাইকে জনজীবনে আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ, শিক্ষা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমে বিনিয়োগসহ কমিউনিটি নেতৃত্বে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।

টাওয়ার হ্যামলেটসেও লুৎফুর রহমান পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। লন্ডনের পাঁচটি নির্বাহী মেয়রশাসিত বরোর দুটিতে বাংলাদেশি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ফরহাদ হোসেন: আমি মনে করি, এটি ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের অবদানের প্রতিফলন। যে কমিউনিটি একসময় অভিবাসী হিসেবে এখানে এসেছিল, তারা এখন জনজীবনের সর্বোচ্চ স্থানীয় নেতৃত্বের পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটি আমাদের গণতন্ত্রকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করে তুলছে। এটি তরুণ প্রজন্মকে জনসেবায় অংশ নিতে উৎসাহিত করবে।

অতীতে অনেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি রাজনীতিক উচ্চ পর্যায়ে গেলেও দীর্ঘদিন প্রভাব ধরে রাখতে পারেননি কেন? আপনি কীভাবে সেই বাস্তবতা এড়াতে চান?

ফরহাদ হোসেন: রাজনীতি মূলত কাজের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের বিষয়। যখন কোনো রাজনীতিক তাঁর কমিউনিটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, তখন তাঁর প্রভাবও কমতে শুরু করে। আমার লক্ষ্য হবে, মানুষের কথা শোনা, বাস্তব সমস্যার সমাধান করা, দৃশ্যমান ফলাফল দেওয়া। মাটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকলে জনসেবাকে অগ্রাধিকার দিলে জনগণের সমর্থন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

রাজনীতি ও জনসেবায় আসতে আগ্রহী তরুণ ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

ফরহাদ হোসেন:খুব অল্প বয়স থেকেই সম্পৃক্ত হোন। স্বেচ্ছাসেবী হয়ে কাজ করুন। কমিউনিটি সংগঠনে যুক্ত হোন। স্থানীয় ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করুন। জনসেবার প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার গড়ে তুলুন। ব্যর্থতায় নিরুৎসাহিত হবেন না। রাজনীতিতে সব পটভূমির মানুষের প্রয়োজন রয়েছে। নেতৃত্বের শুরু হয় নিজের কমিউনিটির সেবা করার মধ্য দিয়ে।

৫ বা ১০ বছর পর মানুষ ফরহাদ হোসেনকে কী কারণে মনে রাখুক বলে আপনি চান?

ফরহাদ হোসেন: আমি চাই, মানুষ বলুক, আমি নিউহামকে আরও পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও ঐক্যবদ্ধ একটি বরো হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছি। আমি চাই, বাসিন্দারা তাঁদের বরো নিয়ে গর্ব বোধ করুক। ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকুক। রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিউহামের মানুষের জন্য বাস্তব পরিবর্তন এনে দেওয়া।

আপনাকে ধন্যবাদ।

ফরহাদ হোসেন: প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ।

Read full story at source