ব্রাজিল–জাপান ম্যাচে হৃদয়ঘটিত সমস্যায় পড়তে পারেন বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা

· Prothom Alo

‘হিউস্টন, উই হ্যাভ আ প্রবলেম।’

বিখ্যাত এই সংলাপটি অ্যাপোলো ১৩ সিনেমার। ১৯৭০ সালে চন্দ্রাভিযানে নভোচারী জ্যাক সুইগার্ট হিউস্টনের কমান্ড কন্ট্রোল সেন্টারকে এর খুব কাছাকাছি একটা কথা বলেছিলেন। সিনেমার চিত্রনাট্যে সেটাই একটু ছেঁটে ওই রূপ দেওয়ার পর সংলাপটি বিখ্যাত হয়ে যায়।

Visit sportfeeds.autos for more information.

ব্রাজিল–জাপান ম্যাচের ভেন্যু হিউস্টন। শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১১টায়। এই ম্যাচে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের একটু হৃদয়ঘটিত সমস্যায় পড়ার ঝুঁকি আছে।

বাংলাদেশে ব্রাজিলের সমর্থক কম নেই। তবে জাপানের আবেদন সর্বজনীন। একে তো এশিয়ান ভূখণ্ড থেকে বিশ্বকাপে নকআউটে ওঠা একমাত্র (অস্ট্রেলিয়া উঠলেও অন্য ভূখণ্ডের) দল, তার ওপর জাপানের খেলার ধাঁচও অনেকের পছন্দের। কেউ কেউ ব্রাজিলিয়ান সৌরভ খুঁজে পান। সে ক্ষেত্রে এই দেশের ব্রাজিল সমর্থকেরাও হয়তো জাপান ম্যাচ নিয়ে মনে মনে বলছেন, ‘হিউস্টন, উই হ্যাভ আ প্রবলেম!’

তবে সমস্যা যেমন আছে, তার সমাধানও আছে। সেটাও দিয়েছেন এক ব্রাজিলিয়ানই, ‘ব্রাজিল জিতলে ভালো। হারলে অবশ্য কষ্ট পাব না।’

অর্থাৎ এই ম্যাচে যে দলই জিতুক—সেই ব্রাজিলিয়ানের আসলে হৃদয়ঘটিত সমস্যা নেই। কারণ, বুকের এক পাশে তাঁর ব্রাজিল, অন্য পাশে জাপান। তিনি আর্থার আনতুনেস কইম্ব্রা—দুনিয়াব্যাপী পরিচিত জিকো নামে। অন্য নাম ব্রাজিলের ‘সাদা পেলে’। আরেকটি পরিচিতিও আছে। জাপানের ফুটবলে তাঁকে ‘ঈশ্বরতুল্য’ বলেন কেউ কেউ।

ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি জিকো

সাফল্য এবং ঐতিহ্যে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ও জাপানের মধ্যে তুলনা চলে না। যেন ফুটবল–নদীতে আলাদা দুটি পাড়, আর জিকো হচ্ছেন সেই দুটি পাড়ের মাঝে সেতুবন্ধ। ব্রাজিলে যেমন প্রচুর জাপানির বসবাস, ঠিক তার উল্টোটা জাপানেও প্রচুর ব্রাজিলিয়ান আছে। ফুটবল তাদের গেঁথেছে একসূত্রে।

ফ্ল্যামেঙ্গো ছাড়ার পর ১৯৮৯ সালে ফুটবল থেকে কিছুদিন দূরে ছিলেন জিকো। তখন ব্রাজিলের ক্রীড়ামন্ত্রীও হন। সেই সময় জাপানের ইস্পাত তৈরির প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো মেটাল থেকে জিকো ডাক পান। তাদের দল কাশিমা অ্যান্টলার্সের হয়ে খেলতে হবে জাপানের ঘরোয়া ফুটবলে। তখন জাপানের ফুটবল হাঁটি হাঁটি পা পা করছে। পেশাদার লিগ কাঠামো ছিল না। ১৯৯১ সালের মে মাসে জিকো সেখানে যাওয়ার দুই বছর পর তাঁর দিকনির্দেশনায় জে–লিগ যাত্রা শুরু করে, পেশাদার কাঠামো পায় জাপানের ঘরোয়া ফুটবল। জিকো তার প্রাণপুরুষ।

জাপানের বিপক্ষে কতক্ষণ খেলবেন নেইমার, যা জানিয়েছেন ব্রাজিল কোচ

জাপানের শহর কাশিমায় সেই প্রাণপুরুষের দুটি ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য আছে। জাপানিরাও আজ সেই ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয়ঘটিত সমস্যায় ভুগবেন। কারণ, জাপানের ফুটবলকে দুটি ভাগে ভাগ করা সময় শুধু একটি কথায়—জিকোর আগে ও পরে।

সে জন্য হয়তো এ ম্যাচে বারুদ–ঠাসা লড়াইয়ের সঙ্গে আছে প্রীতি সম্মিলনীর আবহ। জাপানের কোচ হাজিমো মোরিয়াসু যেমন বলেছেন, ‘ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম সেরা দল, আমরা তাদের সম্মান করি। তবে ম্যাচে কী ঘটবে, তা আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। আমাদেরও জেতার সমান সুযোগ থাকবে।’

অনুশীলনে জাপানের ফুটবল দল

একসময় সুযোগ ছিল না। ১৪ বারের মুখোমুখিতে ব্রাজিলের ১১ জয়, ২ ড্র এবং সর্বশেষ হার গত বছর অক্টোবরে। সেই প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিল ২–০ গোলে এগিয়ে গিয়েও হেরেছিল ৩–২ গোলে। জিকোর প্রসঙ্গ আবারও আসে। বিশ্বকাপের আগে একবারই দেখা হয়েছে দুই দলের। সেটা ২০০৬ আসরে—জিকো তখন জাপানের কোচ, তাঁর সামনে জাপানকে ৪–১ গোলে হারিয়েছিলেন রোনালদিনিও, রোনালদোরা।

জিকোর সঙ্গে জে–লিগে খেলা মোরিয়াসু সেই জাপানকে পাল্টে ফেলেছেন গত আট বছরে। ইতালিয়ান লিগে আনচেলত্তির সঙ্গেও খেলেছেন জিকো। দুজনকেই তাঁর ভালো করে জানা আছে। হিউস্টনে শেষ ষোলোর ম্যাচটি নিয়ে পূর্বাভাসও দিয়ে রাখলেন ব্রাজিল কিংবদন্তি, ‘দুই দলই আক্রমণাত্মক খেলবে। ব্রাজিলের অবশ্যই জাপানের গতি এবং ফুটবলারদের মুভমেন্ট নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ ওরা মাঠে একমুহূর্তের জন্যও থামে না।’

জাপানের বিপক্ষে ম্যাচকে কেন ‘ফাইনাল’ বললেন ব্রাজিল কোচ

জাপানের খেলোয়াড়েরা খুব পরিশ্রমী ও মাঝমাঠ থেকে আক্রমণভাগে সবাই বারবার পজিশন পাল্টায়। দলীয় মুভমেন্টের সময় তাদের খেলায় ব্রাজিলের সোনালি দিনের ছাপ ফুটে ওঠে, যদিও সৃষ্টিশীল কোনো মিডফিল্ডার দলটিতে নেই। তবে ‘আন্ডারডগ’ হিসেবে খেলার সুবিধা নিতে চান জাপানের স্ট্রাইকার তাকুমি মিনোমিনো, ‘যদি নিজেদের আন্ডারডগ ভেবে মাঠে নামি, তবে নকআউটে যেকোনো কিছু ঘটিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য আছে।’

জিকোর মতে, জাপানের সেই সামর্থ্য থাকলেও সম্ভাবনা কম। কারণ, গ্রুপ পর্বে শেষ দুই ম্যাচে ব্রাজিল ব্রাজিলের মতো ফিরেছে। আনচেলত্তিও পছন্দের একাদশ ও সমন্বয় খুঁজে পেয়েছেন স্কটল্যান্ড ম্যাচে। জাপানের বিপক্ষেও আনচেলত্তি একই একাদশ খেলাতে পারেন বলে মনে করেন জিকো। যদিও ব্রাজিলের কোচ হিসেবে আনচেলত্তি কখনোই একই একাদশ দ্বিতীয়বার খেলাননি। স্কটল্যান্ড ম্যাচের একাদশ নিয়েই বেজক্যাম্পে আনচেলত্তি নিবিড় অনুশীলন করেছেন বলে জানিয়েছে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম।

জাপানে নিজের ভাস্কর্যের পাশে জিকো

অর্থাৎ একই একাদশ খেলালে এ ম্যাচেও হয়তো নেইমারকে নামতে হবে পরে। স্কটল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে জাতীয় দলে ফিরে শেষ ২০–২৫ মিনিটে তিন–চারটি সুযোগ তৈরি করেন নেইমার। আনচেলত্তি নিশ্চয়ই জানেন, জাপান নেইমারের পছন্দের দল। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে জাপানের বিপক্ষে তাঁর গোল (৯) সবচেয়ে বেশি। ভিনিসিয়ুস ও মাতেউস কুনিয়াও গোলের মধ্যে থাকায় এ ম্যাচে মূল লড়াইটা ব্রাজিলের আক্রমণভাগ বনাম জাপানের রক্ষণের।

১৯৯৬ আটলান্টা অলিম্পিকের ফুটবল ইভেন্টে ব্রাজিলকে ১–০ গোলে হারিয়েছিল জাপান। ঠিকই পড়েছেন। জাপানের ফুটবলে সেই জয় ‘মায়ামি নো কিসেকি’ বা ‘মায়ামির অলৌকিক ঘটনা’ নামে পরিচিত। হিউস্টনেও নিশ্চয়ই তেমন কিছুরই আশায় জাপান। কিন্তু ব্রাজিল তা হতে দিলে তো!

Read full story at source