জগৎ ও মহাজগতের সংলাপ

· Prothom Alo

গ্যালারিতে ঢুকেই বিশালাকার ‘নিমজ্জন’ চিত্রটি দর্শককে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। দূর থেকে এটি যেন পাহাড়ি ভূদৃশ্য কিংবা মেঘের স্তরবিন্যাস; আবার কাছে গেলে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মানবদেহের অবয়ব। এই দ্বৈত পাঠই চিত্রশিল্পী মাসুদুর রহমানের শিল্পভাষার বৈশিষ্ট্য। দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, দেহ ও প্রকৃতি, মানুষ ও মহাশূন্য—সবকিছুকে তিনি একই চিত্রপটে মিলিয়ে দেন।

প্রদর্শনীর শিরোনামগুলোই শিল্পীর ভাবনার বিস্তারকে ধারণ করে—‘স্মৃতির নোঙর’, ‘স্মৃতির প্রত্নতত্ত্ব’, ‘বিস্মৃত চেতনার অবশেষ’, ‘রূপান্তর’, ‘অন্তঃস্রোতের মানচিত্র’, ‘অন্তরের ঊর্মিমালা’, ‘অগ্নিগর্ভে পদ্ম’, ‘ভালোবাসার নদী’, ‘অতল অভিব্যক্তি’, ‘অন্তরিক্ষের অশ্রুধারা’, ‘রক্তিম বৃষ্টি’, ‘রক্তস্নাত আর্তনাদ’ কিংবা ‘হৃদয়ে বাজে মুক্তির গান’। এসব নাম কেবল চিত্রের পরিচয় নয়; বরং দর্শকের অনুভূতির জন্য একেকটি প্রবেশদ্বার। স্মৃতি, প্রেম, দ্রোহ, যন্ত্রণা, পুনর্জন্ম, বিস্মৃতি এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক বিস্তৃত মানবিক অভিজ্ঞতার পরিসর তৈরি করে।

Visit xsportfeed.quest for more information.

'অন্তরে অন্তরীক্ষে', মাসুদুর রহমান

মাসুদুর রহমানের চিত্রভাষার একটি স্বাতন্ত্র্য হলো তাঁর নির্মাণকৌশল। তেলরং ও চারকোলের মিশ্রণে ছবি আঁকতে তিনি তুলি ব্যবহার না করে হাতের তালু, আঙুল ও নখ দিয়ে রঙের স্তর নির্মাণ করেন। এই স্পর্শনির্ভর প্রক্রিয়ায় ক্যানভাসে তৈরি হয় একধরনের জৈব টেক্সচার, যা কখনো মেঘের স্তর, কখনো পাথরের ক্ষয়, কখনো মানবচর্মের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। এই টেক্সচারই তাঁর ছবির প্রাণ।

'অসীমের বীজক্ষেতে প্রেমিক যুগল', মাসুদুর ..

কাছ থেকে দেখলে রঙের ঘনত্ব ও রেখার ছন্দ, দূর থেকে দেখলে মানবমুখ, দেহ কিংবা বিমূর্ত ভূদৃশ্য—দুই অভিজ্ঞতাই একসঙ্গে কাজ করে।

মাসুদুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। চারকোলে নির্মিত ‘শূন্যতার পরিব্রাজক’ এবং ‘অসীমের বীজক্ষেতে প্রেমিক যুগল’সহ কয়েকটি কাজে প্রাতিষ্ঠানিক প্রাচ্যকলার শিক্ষার ছাপ রেখার প্রবাহে স্পষ্ট।

'জন্ম-মৃত্যু পেরিয়ে আগমন', মাসুদুর রহমান
তাঁর অবয়বগুলো কখনো পরস্পরের আশ্রয়, কখনো স্মৃতির ধারক, কখনো আবার মহাশূন্যে ভেসে থাকা জীবনের প্রতীক।

কোথাও কোথাও রেখার ছন্দে অজন্তার গুহাচিত্র কিংবা প্রাচীন ভাস্কর্য–ঐতিহ্যের স্মৃতি জেগে ওঠে। মানবদেহ এখানে কেবল শারীরিক উপস্থিতি নয়; বরং অনুভূতি, সম্পর্ক ও মহাজাগতিক ঐক্যের প্রতীক। এই মহাজাগতিক দর্শনও তাঁর প্রাচ্যনির্ভর শিল্পচেতনার অন্তঃস্রোত হয়ে ওঠে।

মাসুদুর রহমানের ক্যানভাসে বারবার ফিরে আসে নারী-পুরুষের শরীর ও অস্তিত্বের ভাষা। তাঁর অবয়বগুলো কখনো পরস্পরের আশ্রয়, কখনো স্মৃতির ধারক, কখনো আবার মহাশূন্যে ভেসে থাকা জীবনের প্রতীক।

'দেহের দোঁহা', মাসুদুর রহমান
বিশেষ করে বর্ষা-অনুষঙ্গী ‘অঝোর ধারা’, ‘স্মৃতির মেঘদল’, ‘মেঘমল্লার’ কিংবা ‘অন্তরিক্ষের অশ্রুধারা’ ছবিগুলোয় জল, মেঘ ও দেহ যেন একই চক্রে আবর্তিত হয়েছে।

এ কারণেই তাঁর কাজে দেহ, প্রকৃতি ও মহাজাগতিকতার মধ্যে একটি ধারাবাহিক সংলাপ গড়ে ওঠে।

রঙের ব্যবহারেও শিল্পী একটি স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণ করেছেন। গাঢ় নীল, ধূসর, মাটিরং, রক্তিম আভা কিংবা সোনালি আলোর ক্ষীণ উপস্থিতি একদিকে গভীর আবেগ তৈরি করে, অন্যদিকে রহস্যময় অন্তরিক্ষের অনুভূতি জাগায়। বিশেষ করে বর্ষা-অনুষঙ্গী ‘অঝোর ধারা’, ‘স্মৃতির মেঘদল’, ‘মেঘমল্লার’ কিংবা ‘অন্তরিক্ষের অশ্রুধারা’ ছবিগুলোয় জল, মেঘ ও দেহ যেন একই চক্রে আবর্তিত হয়েছে।

'নিমজ্জন', মাসুদুর রহমান
এই দর্শন তাঁকে অস্তিত্ব, সময় এবং মানবমনের অন্তর্গত রূপান্তরকে নতুনভাবে অন্বেষণের প্রেরণা জোগায়।

মাসুদুর রহমানের শিল্পভাবনার অন্তর্নিহিত ভিত্তি গড়ে উঠেছে শিবের মহাজাগতিক (কসমিক) দর্শনের সঙ্গে এক গভীর সংলাপের মধ্য দিয়ে। তাঁর কাছে শিবের তাণ্ডব কোনো পৌরাণিক অনুষঙ্গ মাত্র নয়; বরং সৃষ্টি, স্থিতি, সংহার ও পুনর্জন্মের অন্তহীন মহাজাগতিক চক্রের এক চিরন্তন রূপক। এই দর্শন তাঁকে অস্তিত্ব, সময় এবং মানবমনের অন্তর্গত রূপান্তরকে নতুনভাবে অন্বেষণের প্রেরণা জোগায়।

'মুখ ও মহাশূন্য', মাসুদুর রহমান

একই সঙ্গে নদীর প্রতি তাঁর নিবিড় অনুরাগ শিল্পীসত্তাকে দিয়েছে আরেকটি মৌলিক ভিত্তি। নদীর বিশালতা, অবিরাম প্রবাহ, গভীরতা এবং আত্মসমর্পণের সৌন্দর্য তাঁর কাছে প্রায় আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। তাই তাঁর ক্যানভাসে নদী কেবল প্রকৃতির দৃশ্য হয়ে ওঠে না; বরং আত্মা ও শরীর, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, স্থিরতা ও প্রবাহের মধ্যবর্তী এক সজীব সেতুবন্ধে রূপ নেয়।

'শূন্যতায় স্নান', মাসুদুর রহমান
বাংলাদেশে টেক্সচারভিত্তিক বিমূর্ত চিত্রচর্চা নতুন নয়। কিন্তু মাসুদুর রহমানের বিশেষত্ব হলো, তাঁর টেক্সচার কখনোই নিছক অলংকারে সীমাবদ্ধ থাকে না।

শিবের মহাজাগতিক চেতনা এবং নদীর অনন্ত প্রবহমানতা মিলেমিশে তাঁর চিত্রভাষায় এমন এক অন্তর্লয় নির্মাণ করে, যা উচ্চাঙ্গসংগীতের আলাপের মতো ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় এবং দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশে টেক্সচারভিত্তিক বিমূর্ত চিত্রচর্চা নতুন নয়। কিন্তু মাসুদুর রহমানের বিশেষত্ব হলো, তাঁর টেক্সচার কখনোই নিছক অলংকারে সীমাবদ্ধ থাকে না।

'শূন্যতার পরিব্রাজক', মাসুদুর রহমান
‘অন্তরে অন্তরিক্ষে’ শেষ পর্যন্ত মানুষের ক্ষুদ্র জীবন থেকে অনন্ত মহাবিশ্বের দিকে তাকানোর এক শিল্পযাত্রা। এখানে জাগতিক বাস্তবতা ও মহাজাগতিক অনুভূতি পরস্পরের বিপরীত নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক।

প্রতিটি রঙের স্তরের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসে মানুষের শরীর, মুখ কিংবা অস্তিত্বের কোনো ইঙ্গিত। ফলে বিমূর্ততা ও অবয়ব—দুইয়ের মধ্যবর্তী এক পরিসরে দাঁড়িয়ে তাঁর শিল্পভাষা নিজস্ব পরিচয় লাভ করেছে।

‘অন্তরে অন্তরিক্ষে’ শেষ পর্যন্ত মানুষের ক্ষুদ্র জীবন থেকে অনন্ত মহাবিশ্বের দিকে তাকানোর এক শিল্পযাত্রা। এখানে জাগতিক বাস্তবতা ও মহাজাগতিক অনুভূতি পরস্পরের বিপরীত নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক।

'স্মৃতির মেঘদল', মাসুদুর রহমান

সেই অর্থে এই প্রদর্শনীকে বলা যায় জাগতিক ও মহাজাগতিকের মধ্যে এক সৃজনশীল সেতুবন্ধের শিল্পভাষা।

রাজধানীর সফিউদ্দিন শিল্পালয়ে আয়োজিত ‘অন্তরে অন্তরীক্ষে’ শিরোনামের এই প্রদর্শনী শিল্পগুরু সফিউদ্দিন আহমেদের ১০৪তম জন্মবার্ষিকীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। তবে এই শ্রদ্ধা নিছক আনুষ্ঠানিক নয়; বরং একজন শিল্পীর আত্ম–অনুসন্ধানী যাত্রার মধ্য দিয়ে আরেক শিল্পগুরুকে স্মরণ। গত ২৬ জুন শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি ৫ জুলাই পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে।

Read full story at source