নগ্নতার আবরণে ঢাকা এক সন্ত-কবি

· Prothom Alo

আক্কা মহাদেবী দ্বাদশ শতকের কর্ণাটকের এক কিংবদন্তিময় কবি-সাধিকা। তিনি দক্ষিণ ভারতীয় ভক্তি আন্দোলনের এক মহিরুহ। তিনি দেহাতীত প্রেম, মরমি বিদ্রোহ ও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার এক বিরল মিশ্রণ তৈরি করেছিলেন। প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি এক সাহসী আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানী, দার্শনিক ও সাহিত্যিক হিসেবে মর্যাদা লাভ করেন। তাঁর জীবন, দর্শন ও কবিতা আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি বীরশৈব বা লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও বিপ্লবী নারী সন্ত।

আক্কা মহাদেবীর জীবন মূলত মৌখিক ইতিহাস ও জনশ্রুতির ওপর নির্ভরশীল। তিনি আনুমানিক ১১২০-১১৩০ সালে কর্ণাটকের শিবা-শিমোগা জেলার উদুতাদি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত শৈব ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা নির্মলশেট্টি, মাতা সুমতি। শৈশব থেকেই ভগবান শিবের প্রতি তাঁর গভীর ভক্তির জন্ম হয়। শিবমন্দিরে তিনি একান্ত সময় কাটাতেন। ‘চেন্নামল্লিকার্জুনা’ (জুঁই ফুলের মতো উজ্জ্বল প্রভু) নামক শিবকে প্রেমিক, স্বামী, প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তাঁর উপাসনায় ব্যাপৃত থাকেন।

Visit betsport.cv for more information.

আক্কা মহাদেবী যে সময়ে বেড়ে ওঠেন, সেটি ছিল বীরশৈব বা লিঙ্গায়ত আন্দোলনের উত্থানের কাল। এ আন্দোলন ছিল বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে এক সংস্কারমূলক ও সামাজিক সমতার আন্দোলন। বাসবন্না ছিলেন এ আন্দোলনের প্রধান নেতা।

স্থানীয় জৈন রাজা কৌশিকের সঙ্গে জোর করে আক্কা মহাদেবীর বিয়ে দেওয়া হয়। তিনি বিয়েটা মেনে নিলেও স্বামী-সম্ভোগ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখেন। অবশেষে রাজাকে বলেন, ‘আমার স্বামী তো চেন্নামল্লিকার্জুনা, তুমি কে?’ তারপর সব বস্ত্র ত্যাগ করে নগ্ন হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান এবং সন্ন্যাসিনীর জীবন বেছে নেন। এ নগ্নতা ছিল জাগতিক মোহ ও সামাজিক লজ্জা-শরম থেকে সম্পূর্ণ মুক্তির একটি শক্তিশালী প্রতীক। তিনি লম্বা চুল দিয়ে শরীর আবৃত করে কর্ণাটকের পথে পথে ঘুরেছেন। এতে অনেক নিন্দা তাঁকে সইতে হয়েছে। আবার অনেকে সম্মান-ভক্তিও করতেন।

আক্কা মহাদেবী কর্ণাটকের কল্যাণে অবস্থিত বাসবন্নার প্রতিষ্ঠিত ‘অনুভব মণ্ডপ’ নামের আধ্যাত্মিক আলোচনাকেন্দ্রে গমন করেন। এটি ছিল লিঙ্গায়েত সাধু ও দার্শনিকদের একটি সমাবেশস্থল। সেখানে বাসবন্না ও অল্লম প্রভুর মতো ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আক্কা উপস্থিত হন। অল্লম প্রভু প্রমুখ সাধক তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘নগ্ন হয়ে এসেছ কেন?’ আক্কা উত্তর দেন, ‘যখন আমি দেখলাম, আমার স্বামী চেন্নামল্লিকার্জুনা ছাড়া আর কেউ আমার নয়, তখন লজ্জা কাকে বলে, ভুলে গেছি।’ শুরুতে তাঁর নগ্নতা নিয়ে সংশয় থাকলেও, এক গভীর দার্শনিক বিতর্কের পর অল্লম প্রভু তাঁকে স্বীকৃতি দেন এবং উপস্থিত সব সাধু তাঁকে ‘আক্কা’ তথা বড় বোন উপাধিতে ভূষিত করেন। সেখানে তিনি অন্যান্য সাধক ও দার্শনিকের সঙ্গে আধ্যাত্মিক আলোচনায় অংশ নেন এবং তাঁর বচন কবিতাগুলো রচনা করেন।

জীবনের শেষ পর্যায়ে, আক্কা মহাদেবী শ্রীশৈলম পর্বতের কাছে কদলীর গভীর জঙ্গলে গিয়ে সাধনায় নিবিষ্ট হন। কিংবদন্তি অনুসারে, তিনি সেখানে চেন্নামল্লিকার্জুনার সঙ্গে আধ্যাত্মিক একত্ব বা ঐক্য লাভ করেন। আনুমানিক ১১৬০ সালে তাঁর দেহাবসান হয়।

ধ্যানমগ্ন আক্কা মহাদেবীর প্রতিকৃতি
আক্কা মহাদেবীর সাধনা তাঁকে কন্নড় সাহিত্যের প্রথম প্রধান মহিলা কবি ও রহস্যবাদী তথা মরমি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মীরাবাইয়ের মতো পরবর্তী ভক্ত কবিরাও অনুরূপ পথে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আজও তিনি সাহস, আধ্যাত্মিক দৃঢ়তা ও নারীর স্বাধীনতার এক শক্তিশালী প্রতীক।

আক্কা মহাদেবীর সাধনা শুধু আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান ছিল না, বরং দেহ, মন ও জীবনব্যবহারের মাধ্যমে ঈশ্বরের সঙ্গে প্রেমের এক জীবন্ত ও বৈপ্লবিক প্রকাশ। চেন্নামল্লিকার্জুনাকে (শিব) তাঁর একমাত্র প্রেমিক ও স্বামী রূপে ভজন করতেন, যা ‘মধুর ভাব’ নামে পরিচিত।

আক্কা মহাদেবী যে রাজকীয় বস্ত্র ও অলংকার ত্যাগ করে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে যান এবং তাঁর দীর্ঘ কেশই ছিল একমাত্র আবরণ; এ নগ্নতা ছিল জাগতিক মোহ, সামাজিক লজ্জা ও পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্ব থেকে মুক্তির শক্তিশালী প্রতীক। তাঁর এ পথ ছিল প্রচলিত সামাজিক ও ধার্মিক কাঠামোর প্রতি এক চ্যালেঞ্জ। তিনি ভিক্ষার অন্নে জীবন ধারণ করতেন এবং ভাঙা মন্দিরে রাত কাটাতেন। এভাবে তিনি ইন্দ্রিয়তৃপ্তি ও বৈষয়িক বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতেন।

আক্কা মহাদেবী প্রায়ই নির্জন পাহাড়, বন; বিশেষত শ্রীশৈলম পর্বত, প্রকৃতির ভেতর সাধনায় মগ্ন হতেন। প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান তাঁর কাছে ঈশ্বরের সঙ্গে খেলার প্রতীক ছিল। তিনি প্রকৃতিকে ঈশ্বরের সাক্ষাৎ প্রকাশ হিসেবে দেখতেন। তাঁর কবিতায় পাখি, বন, পর্বত ও নদীর সুরেলা উপস্থিতি রয়েছে। প্রকৃতির মধ্যেই তিনি তাঁর প্রভুকে খুঁজে পেতেন।

আক্কা মহাদেবীর সাধনার কেন্দ্রে ছিল ঈশ্বরের প্রতি একাগ্র, ব্যাকুল প্রেম ও বিরহ। প্রেমকেই তিনি মুক্তির পথ মেনেছেন। এ প্রেম এত তীব্র যে দেহ-মন-সমাজ-সংসার সব অর্থহীন হয়ে যায়।

এ প্রেমই আক্কা মহাদেবীকে সব বাধা অতিক্রম করার শক্তি জুগিয়েছিল। জাগতিক বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি ছিল তাঁর অন্বিষ্ট।

আক্কা মহাদেবীর সাধনা শুধু ব্যক্তিগত মুক্তির জন্য ছিল না। বলা যায়, এটি ছিল একটি সামাজিক ও দার্শনিক বিবৃতি। তাঁর নগ্নতা ও স্বাধীন ভ্রমণ তৎকালীন নারীদের জন্য নির্ধারিত রীতিনীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ ছিল। নারী হিসেবে তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণ, গুরুপরম্পরায় অংশগ্রহণ এবং তাঁর সাহসী কবিতা পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছিল। তিনি দেখিয়েছেন যে নারীও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে স্বনির্ধারিত পথে হাঁটা ব্যক্তি হতে পারে।

আক্কা মহাদেবীর সাধনা তাঁকে কন্নড় সাহিত্যের প্রথম প্রধান মহিলা কবি ও রহস্যবাদী তথা মরমি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মীরাবাইয়ের মতো পরবর্তী ভক্ত কবিরাও অনুরূপ পথে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আজও তিনি সাহস, আধ্যাত্মিক দৃঢ়তা ও নারীর স্বাধীনতার এক শক্তিশালী প্রতীক।

আক্কা মহাদেবীর চিন্তা ও কাজ তৎকালীন সমাজের জন্য ছিল অত্যন্ত বিপ্লবী। তিনি বর্ণপ্রথা, বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ও পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর তীব্র সমালোচনা করতেন। তাঁর মতে, ঈশ্বরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের জন্য কোনো পুরোহিত বা মন্দিরের প্রয়োজন নেই। বেদ-পুরাণ-শাস্ত্রের পরিবর্তে নিজের অনুভবকেই প্রামাণ্য মেনেছেন আক্কা মহাদেবী।

নারী হয়েও আক্কা মহাদেবী স্বাধীনভাবে দেশ ভ্রমণ করেছেন, জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে অংশ নিয়েছেন এবং তাঁর আধ্যাত্মিক মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি নারীর দৈহিক ও মানসিক স্বাধীনতার পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠ ছিলেন।

লিঙ্গায়েত বা বীরশৈব আন্দোলনের এক কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন আক্কা মহাদেবী। এ আন্দোলনে সামাজিক সমতা ও যুক্তির ওপর জোর দেওয়া হতো। তাঁর দার্শনিক অবদান, সাহিত্যিক সৃজনশীলতা, বৈপ্লবিক জীবনাচরণ ও ভক্তি এ আন্দোলনের মূল আদর্শগুলোকে গভীরভাবে রূপ ও শক্তি দিয়েছিল।

আক্কা মহাদেবী কন্নড় ভাষায় ‘বচন’ কবিতার মাধ্যমে লিঙ্গায়েতের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক বাণী জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেন। তিনি কন্নড় সাহিত্যে নারী রচিত ‘বচন’ ধারার প্রথম ও সবচেয়ে প্রভাবশালী কবি ছিলেন। বচন হলো সহজ, অলংকারহীন কন্নড় ভাষায় রচিত গদ্যকবিতা যা আধ্যাত্মিক, দার্শনিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখা হতো। তাঁর প্রতিটি কবিতা ‘চেন্নামল্লিকার্জুনা’ স্বাক্ষর দিয়ে শেষ হতো, যা ছিল ব্যক্তিগত ভক্তির কেন্দ্রবিন্দু।

আক্কা মহাদেবী শুধু একটি নাম নয়, একটি জীবন্ত আদর্শ, একটি অপরাজেয় স্বাধীনতার প্রতীক। চেন্নামল্লিকার্জুনার প্রেমে মগ্ন সেই নগ্ন সাধিকা আজও আমাদের ডেকে বলেন, ‘লজ্জা ফেলে দাও, প্রেমে ডুব দাও, তবেই সত্য লাভ হবে।’

আক্কা মহাদেবী তাঁর কবিতায় দৈনন্দিন জীবন ও প্রকৃতি থেকে সহজবোধ্য ও শক্তিশালী উপমা নিতেন। অনেক সময় তিনি খুবই সরাসরি ও সাহসী যৌনরূপকও ব্যবহার করেছেন আধ্যাত্মিক মিলনের অনুভূতি প্রকাশে। এ স্পষ্টতা তাঁর কবিতাকে শক্তিশালী ও অভূতপূর্ব করেছে।

আক্কা মহাদেবীর কবিতায় রয়েছে ঈশ্বরের প্রতি ব্যাকুলতা, সামাজিক কৃত্রিমতার বিরুদ্ধাচরণ, বৈরাগ্য ও সাদাসিধে জীবনের আদর্শ, নারীর ইচ্ছা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রকাশ ইত্যাদি বিষয়। তাঁর কবিতা তাঁর আধ্যাত্মিক যাত্রা, সাহসী জীবনবোধ ও নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রত্যক্ষ অভিব্যক্তি। প্রায় ৪৩০টি ‘বচন’ নিয়ে গঠিত তাঁর সাহিত্যকর্ম কন্নড় সাহিত্যে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে।

কন্নড় সাহিত্যে নারীর কণ্ঠস্বরকে এক অবিস্মরণীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছেন আক্কা মহাদেবী। তাঁর বচনগুলো কন্নড় সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এগুলো ইংরেজিসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

আক্কা মহাদেবীর কবিতা কেবল ধর্মীয় ভক্তির নিদর্শন নয়; তা একই সঙ্গে সামাজিক বিদ্রোহ, নারীর আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ ও প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেমের দলিল। তাঁর শব্দ আজও পাঠককে নাড়া দেয় এবং মনে করিয়ে দেয় ব্যক্তির আত্মিক মুক্তির অনন্ত সংগ্রামের কথা।

আক্কা মহাদেবীর উত্তরাধিকার শুধু কর্ণাটক বা ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সারা বিশ্বের জন্য একটি অনুপ্রেরণা যে কীভাবে কোনো ব্যক্তি তাঁর অন্তরের সত্যের পথে অবিচল থেকে সমাজের রীতিনীতি ও কাঠামোকে প্রশ্ন করতে পারেন। তিনি দেখিয়েছেন যে আধ্যাত্মিকতা শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়, এটা ব্যক্তিগত সাহসেরও নাম।

আক্কা মহাদেবী শুধু একটি নাম নয়, একটি জীবন্ত আদর্শ, একটি অপরাজেয় স্বাধীনতার প্রতীক।

চেন্নামল্লিকার্জুনার প্রেমে মগ্ন সেই নগ্ন সাধিকা আজও আমাদের ডেকে বলেন, ‘লজ্জা ফেলে দাও, প্রেমে ডুব দাও, তবেই সত্য লাভ হবে।’

আমি গৃহ ত্যাগ করতে চেয়েছিলাম।পরে বুঝলামযে গৃহকে ছাড়তে হবে,সেটা আসলে নিজের অহং।

আ ক্কা  ম হা দে বী র  ক বি তা
১.
আমি তোমাকে ভালোবেসেছি
তাই আমার সব লজ্জা গেল ঝরে।
যেমন বৃষ্টির জলে পদ্ম ফুটে যায়,
তেমনি তোমার নামে আমার সব আবরণ খসে গেল।
হায় চেন্নামল্লিকার্জুনা,
তুমি না বুঝলে আমি কী করে বোঝাই!

২.
ভাইয়েরা, তোমরা যাকে সংসার বলো
তা তো আমার কাছে ছাইয়ের স্তূপ।
যে চেন্নামল্লিকার্জুনার প্রেম পেয়েছে
সে আর কারও দাসী নয়।

৩.
নদী যেমন সমুদ্রে মিশে নিজেকে হারায়,
তেমনি আমি তোমাতে মিশে যেতে চাই।
তুমি না নিলে আমাকে
আমি কোথায় যাব, হায় চেন্নামল্লিকার্জুনা!

৪.
অন্য পুরুষ দেখলে আমার চোখ জ্বলে,
তাদের কথা শুনলে কানে বিষ ঢোকে।
যেদিন থেকে চেন্নামল্লিকার্জুনাকে দেখেছি
সেদিন থেকে এই জগৎ আমার কাছে মৃত।

৫.
আমার দেহ জল, মন বাতাস—
এ দুটোই বদলায়।
বদলহীন থাকো শুধু তুমি,
চেন্নামল্লিকার্জুনা।

৬.
মানুষ আমাকে দেখে বলে,
‘কোথায় তোমার লজ্জা?’
আমি শুধু হাসি।
যার সামনে আমি দাঁড়াই,
তার চোখে দেহ নামে কোন পর্দা থাকে?

৭.
পথে পথে অনেক রাজা ডাকছে,
সুবর্ণ প্রাসাদের স্বপ্ন দেখায়।
কিন্তু যাকে আমি চাই,
সে আমাকে নিজের আলোয় ভরিয়ে দেয়।
এই পৃথিবীর কোনো রত্নে সে আলো নেই।

৮.
এই মনকে কে বাঁধবে?
শিকল ছিঁড়ে সে শুধু তারই কাছে যায়
যার নাম শুনলেই রক্ত উথলে ওঠে।

৯.
যে প্রেম আমাকে পোড়ায়,
আমি তারই কাছে মাথা নত করি।
যে প্রেমে দগ্ধতা নেই,
সে প্রেম শুধু সাজানো কথা।

১০.
তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করো,
ঈশ্বর কোথায়?
আমি বলি,
তুমি যত দূর যাও না কেন,
তোমার হৃদয়ের গভীর দরজায়
সে বসে আছে।

১১.
আমি গৃহ ত্যাগ করতে চেয়েছিলাম।
পরে বুঝলাম
যে গৃহকে ছাড়তে হবে,
সেটা আসলে নিজের অহং।

১২.
দেহকে নিয়ে তুমি এত ব্যস্ত কেন?
আজ আছে, কাল নেই।
যার প্রেমে আমি ডুবে আছি,
তার চোখে দেহ স্রেফ ছায়া।

১৩.
যাদের কাছে সত্য চাইতে গেছি
তারা আমাকে নিয়ম শিখিয়েছে।
আর যে আমাকে গ্রহণ করেছে,
সে আমাকে নিজের হতে শিখিয়েছে।

১৪.
প্রেমিক চাইলে
ফুলের পথ নয়,
কাঁটার পথ দেবে।
কিন্তু সেই কাঁটার মধ্যেই
এক অদৃশ্য সুবাস—
যা শুধু প্রেমিকই চিনতে পারে।

১৫.
নামজপ, তীর্থযাত্রা, উপবাস—
এসব দরকার হয়
যখন হৃদয় বন্ধ থাকে।
হৃদয় খুলে গেলে
এক নামই যথেষ্ট।

১৬.
আমি ভিক্ষা চাই না,
শরণ চাই না।
আমি শুধু চাই
তুমি আমায় পুড়িয়ে দাও
নিজের আলোয়।

১৭.
আমি যে পথে হাঁটছি,
সে পথ আমার নয়।
এটা সেই প্রেমের পথ
যে আমার পায়ের ছাপ মুছে দিয়ে
নিজের ছাপ বসিয়ে দেয়।

১৮.
লোকেরা বলল,
‘তুমি পথ হারাবে।’
আমি বললাম,
আমি তো অনেক আগেই
নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি।
এবার শুধু তাকে পাওয়ার পালা।

১৯.
যে দেহকে সাজিয়ে রাখো,
সে দেহই তোমায় ফেলে যাবে।
কেন তবে সাজাও না
নিজের অন্তর?

২০.
তুমি আমাকে খোঁজো দেহে।
আমি তোমায় খুঁজি নিশ্বাসে।
তুমি আমাকে খোঁজো কথায়।
আমি তোমায় খুঁজি নিস্তব্ধতায়।

২১.
যা কিছু পেয়েছি,
সব ওকে দিয়ে দিয়েছি।
যা কিছু হারিয়েছি,
সব তারই জন্য।
এখন আমি ফাঁকা।
আর সেই ফাঁকার মধ্যেই
সে ভরে ওঠে।

২২.
তুমি তাকে দূর ভাবো,
আমি তাকে কাছে পাই।
কারণ, দূরত্বটা
চোখের; হৃদয়ের নয়।

২৩.
আমি কতবার ভাঙলাম নিজেকে
তার যোগ্য হওয়ার জন্য!
শেষে বুঝলাম,
ভাঙা নয়, মুছে যেতে হয়।

২৪.
যখন জগতের সব দরজা বন্ধ,
একটাই দরজা খোলা থাকে—
তার নাম।

২৫.
সে যদি ডাক দেয়,
আমি সব ছেড়ে ছুটে যাই।
কে কী বলল,
কোন নিয়ম ভাঙলাম,
এসব আর মনে থাকে না।

ভিক্ষুকের মতো দাঁড়াই তোমার দরজায়।কিন্তু কী চাই?নিজেকেই।কারণ, তোমার হাতে না দিলেআমি আমাকে পাই না।

২৬.
আমি তাকে প্রেমিক ডাকি।
তুমি তাকে ঈশ্বর ডাকো।
আমি বলি,
নাম বদলালে কি সত্তা বদলায়?

২৭.
তুমি ধর্ম খোঁজো শাস্ত্রে,
আমি খুঁজি নিজের মর্মে।
যা মর্মে নেই,
শাস্ত্র তাকে বাঁচাতে পারে না।

২৮.
যে আলোতে দগ্ধ হই,
সে আলোতেই রক্ষা পাই।
দহন আর আশ্রয়
একই উৎস থেকে আসে।

২৯.
ছায়ার মতো চলে আমার দেহ,
কিন্তু যার প্রেম আমাকে গ্রাস করেছে,
সে স্থির, অনড়, চিরন্তন।

৩০.
বাইরের লজ্জা ত্যাগ করেছি।
অন্তরের লজ্জা ত্যাগ করিনি।
কারণ, তাকে না পেলে
নিজের চোখেই লজ্জা লাগে।

৩১.
দিন-রাত নেশায় থাকি;
কিন্তু সে নেশা মদের নয়।
তার নাম একবার উচ্চারণ করলেই
আমি নিজের স্মৃতি ভুলে যাই।

৩২.
তুমি আমাকে বেঁধে রাখতে চাইলে।
আমি হাসলাম।
যার কাছে আমি বাঁধা,
তার শিকল চোখে দেখা যায় না।

৩৩.
দেহের কথা বলে আমাকে ভয় দেখিয়ো না।
আমি তো বহু আগেই
দেহকে নিজের বাড়ি ভাবা ছেড়ে দিয়েছি।

৩৪.
শেষে যখন আমার সব নাম-ধাম মুছে যাবে,
থেকে যাবে শুধু একটি নাম—
চেন্নামল্লিকার্জুনা।
আর ওই নামেই
আমি বাঁচব, মিলিয়ে যাব।

৩৫.
যেখানে যাই,
তোমার নামই প্রথম শ্বাস হয়।
তাই আমার পথে অন্ধকার টিকে থাকে না।

৩৬.
আমি তো তোমারই।
কিন্তু তুমি যখন আমায় একটু ভুলে থাকো,
বিশ্বটা যেন মুছে যায়।

৩৭.
সবাই আমাকে বলে,
‘নিজেকে সামলে চলো।’
আমি বলি,
যে আমাকে ধরে রেখেছে,
তার হাত ছাড়া আর কিছুই আমাকে সামলায় না।

৩৮.
তোমার প্রেমের আগুন
দেহের দর্প ভেঙে দিলে,
আমি বুঝলাম,
দেহের বাইরে আরও এক পরিচয় আছে।

৩৯.
দিনে হাজার কাজ,
হাজার চিন্তা—
কিন্তু রাতে কানে শুধু তোমার নাম।
সেই নামই ঘুম পাড়ায়।

৪০.
যে প্রেমে ভয় আছে,
সে প্রেম পূর্ণ নয়।
তোমার কাছে আসতে
আমি ‘ভয়’ নামক বস্ত্রটাই ফেলে দিয়েছি।

৪১.
আমাকে রোহিত, শ্যাম, রূপের কথা বলে।
আমি শুধু দেখি,
যার রূপে সূর্যও স্নান করে,
আমি তার প্রেমে ডুবে আছি।

৪২.
ভিক্ষুকের মতো দাঁড়াই তোমার দরজায়।
কিন্তু কী চাই?
নিজেকেই।
কারণ, তোমার হাতে না দিলে
আমি আমাকে পাই না।

৪৩.
লজ্জা দেহে থাকে,
আত্মায় নয়।
যে আত্মার আলিঙ্গনে দাঁড়াই,
সেখানে আমি পবিত্র।

৪৪.
জগৎ আমাকে আঘাত দেয়,
কথা ছোড়ে।
কিন্তু তুমি একবার আমার অন্তরে নড়লে,
সব ক্ষত জ্বলে ওঠে আর সেরে যায়।

৪৫.
রূপ নিয়ে দম্ভ?
আজ রূপ আছে, কাল নেই।
তোমার আলোয় আমি শিখেছি—
রূপ নয়, সত্যই টিকে থাকে।

৪৬.
তোমাকে ছাড়া সবাই আমাকে আকর্ষণ করে,
কিন্তু কোথাও টানে না।
তোমার নীরব ডাকেই
আমি উজাড় হয়ে যাই।

৪৭.
তুমি আমার ভেতর যা খুঁজে পাও,
সেটাই আমার আসল।
মানুষের চোখ শুধু দেহ খুঁজে বেড়ায়।

৪৮.
হাজার নিয়ম, হাজার বাধা—
আমি সব ভেঙেছি।
কারণ, যার নামে আমার নিশ্বাস,
তার চেয়ে বড় নিয়ম আর কিছু নেই।

৪৯.
কোনো আয়নায় নিজেকে দেখে শান্তি পাই না।
শান্তি পাই—
তোমার চোখে প্রতিফলিত হয়ে।

৫০.
তোমার নামেই আমি পাগল।
আর সে পাগলামি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে,
যখন সব জ্ঞান আমাকে ক্লান্ত করেছিল।

সে আমার ভেতরে প্রবেশ করলকোনো শব্দ ছাড়াই।দরজা ভাঙেনি,চাবিও লাগেনি।কারণ, এই দেহের চেয়েমনটাই আগে খুলে গিয়েছিল।

৫১.
তুমি বলো, ‘আকাশের দিকে তাকাও।’
আমি তাকাই।
আর দেখি, তুমি আকাশের ছদ্মবেশে আমার দিকে তাকাও।

৫২.
মন যত দূরে যায়,
শরীর তত ব্যস্ত হয়।
কিন্তু হৃদয় শুধু তোমার দিকে স্থির থাকে।

৫৩.
যে আগুনে তুমি আমায় রেখেছ,
সে আগুনেই আমি নিজেকে চিনি।
আগুন ছাড়া মনের ময়লা গলে না।

৫৪.
আমি তার কাছে এতটাই আপন
যে আমার চাওয়া বলার আগেই
সে আমাকে পুড়িয়ে দেয় আনন্দে।

৫৫.
লোকেরা বলে,
আমি দেহ ভুলে যাই।
আমি হাসি।
দেহকে ভুললেই তো তার নাম মনে থাকে।

৫৬.
তুমি আমাকে বলো,
আত্মা কোথায়?
আমি বলি,
যেখানে তোমার স্পর্শ লাগে,
সেখানে।

৫৭
আমার মন তোমারই বাড়ি।
আমি শুধু অতিথি।
আর অতিথি কখনো স্থায়ী হয় না।

৫৮.
কোথাও যাই না,
কাউকে দেখি না।
তোমার নামেই এত ভিড়
আমার ভেতরে জমে থাকে।

৫৯.
তুমি আমাকে ডোবালে,
ডুবন্ত আমি তল পেলাম।
ভেসে থাকতে থাকতে কখনো
আমি এমন শান্তি পাইনি।

৬০.
যে আমাকে দেহে দেখল,
সে কিছুই দেখল না।
যে আমাকে মনেও দেখল,
সে অর্ধেক দেখল।
যে আমাকে তোমার চোখে দেখল,
সে সম্পূর্ণ দেখল।

৬১.
এই পথ কত কঠিন—
লোকে বলে।
আমি বলি,
যার প্রেম পাথরও গলিয়ে দেয়,
তার পথ কঠিন হয় কীভাবে?

৬২.
আমি একা হই না।
যে নাম আমি জপি,
সে আমার নিঃসঙ্গতাকে
নিজের সঙ্গ বানিয়ে নেয়।

৬৩.
যারা দেহ দেখে ভয় পায়,
তারা প্রেম জানে না।
আর যারা প্রেম জানে,
তারা জানে,
শেষ মিলন দেহে নয়,
নামহীন আগুনে।

৬৪.
যখন সে আমাকে ছুঁয়ে যায়,
আমার রক্ত কাঁপে।
এ কোনো দেহের স্পর্শ নয়,
এ এমন এক আগুন—
যেখানে স্পর্শ আর দহন এক হয়ে যায়।

৬৫.
আমি ধীরে ধীরে খুলে যাই তার সামনে—
বস্ত্র নয়,
স্তর।
স্তরের পর স্তর খুলে গেলে
শেষে আর আমি থাকি না,
থাকে শুধু সে।

৬৬.
লোকে যাকে কাম বলে,
আমি তাকে ডাকি প্রার্থনা।
কারণ, এই আকুলতা
আমায় নিচে টানে না,
আমায় তার গভীরে নিয়ে যায়।

৬৭.
সে আমার ভেতরে প্রবেশ করল
কোনো শব্দ ছাড়াই।
দরজা ভাঙেনি,
চাবিও লাগেনি।
কারণ, এই দেহের চেয়ে
মনটাই আগে খুলে গিয়েছিল।

৬৮.
সে তার নাম আমার মধ্যে রেখে গেল।
সেই নাম বড় হতে থাকল,
শ্বাসে, রক্তে, স্বপ্নে।
একদিন আমি বুঝলাম—
আমি আর বাহক নই,
আমি নিজেই সেই জন্ম।

৬৯
তার সঙ্গে মিলনের পরে
আমি শূন্য হয়ে যাই।
কিন্তু এই শূন্যতা অভাব নয়,
এ এমন পূর্ণতা
যেখানে আর কিছু চাইবার জায়গা নেই।

৭০.
তার সামনে আমি নগ্ন।
কিন্তু এই নগ্নতা দেহের নয়।
যেখানে সব গোপন বাসনা
নিজের নাম হারায়,
সেখানে লজ্জা থাকে কীভাবে?

৭১.
আমি শ্বাস নিই—
সে ঢুকে পড়ে।
আমি শ্বাস ছাড়ি—
সে রয়ে যায়।
এ কেমন মিলন,
যেখানে বিচ্ছেদ বলে কিছু নেই।

৭২.
আমি নারী বলে
সে আমায় নেয়নি।
আমি আমায় ছেড়ে দিয়েছিলাম বলেই
সে আমায় গ্রহণ করল।
এই গ্রহণেই আমি সম্পূর্ণ।

৭৩.
শেষে আমি যা রেখে যাব,
তা কোনো গান নয়,
কোনো স্মৃতি নয়।
শুধু এই সত্য:
আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম
নিজেকে ভালোবাসার চেয়েও বেশি।

Read full story at source