সাগরে-পাহাড়ে টাওয়ার ছাড়াই যোগাযোগ মুঠোফোনে, কীভাবে কাজ করে ডিটুসি
· Prothom Alo

সাধারণ ফোর-জি স্মার্টফোন ব্যবহারে এ সেবা পাওয়া যাবে।
Visit tr-sport.click for more information.
দেশে মুঠোফোন ইন্টারনেটের গ্রাহক প্রায় ১২ কোটি।
পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম জনপদের অনেক মানুষের কাছে মুঠোফোনে কথা বলা এখনো সহজ নয়। বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরাও স্থলভাগ থেকে বেশি দূরে গেলেই মুঠোফোনের সিগন্যাল হারিয়ে ফেলেন। এই সমস্যা কমিয়ে আনতে নতুন এক সেবার পরীক্ষামূলক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডাইরেক্ট টু সেল (ডিটুসি) নামের প্রযুক্তিতে এখন টাওয়ার ছাড়াই সরাসরি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে খুদে বার্তা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। পরে ধাপে ধাপে ভয়েস কল এবং সীমিত গতির ইন্টারনেট সেবাও এতে যুক্ত হবে।
গত মে মাসে মোবাইল অপারেটর বাংলালিংককে পরীক্ষামূলকভাবে ডিটুসি চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের সঙ্গে মিলে দুর্গম বেশ কয়েকটি এলাকায় এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। বিটিআরসি ভাষ্য, এখন পর্যন্ত ফলাফল ইতিবাচক।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির সুন্দরবনের গভীরে, পাহাড়ে বা সমুদ্রের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে চলে গেলেও খুদে বার্তা পাঠিয়ে দুই দিক থেকেই যোগাযোগ রাখা সম্ভব হচ্ছে। স্টারলিংকের পরবর্তী প্রজন্মের স্যাটেলাইট কক্ষপথে পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় হলে ভবিষ্যতে ভয়েস কলের সুযোগও আসতে পারে।যেভাবে কাজ করে ডিটুসি
ডিটুসি প্রযুক্তিতে মুঠোফোনের সংকেত কাছাকাছি কোনো টাওয়ারে না গিয়ে সরাসরি স্টারলিংকের স্যাটেলাইটে পৌঁছে যায়। স্যাটেলাইট সেই সংকেত গ্রাউন্ড স্টেশনে পাঠায়। এরপর সেটি সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে কল, বার্তা বা ডেটা আদান-প্রদানের কাজ সম্পন্ন করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই সেবা পেতে আলাদা স্যাটেলাইট ফোন বা বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। সাধারণ ফোর-জি স্মার্টফোন ব্যবহার করেই সেবা পাওয়া যাবে। মোবাইল টাওয়ারের কভারেজের বাইরে চলে গেলে ফোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযোগ করার চেষ্টা করবে।
বিটিআরসির তথ্য বলছে, দেশের চারটি অপারেটরের মোট মুঠোফোন গ্রাহক ১৯ কোটির কাছাকাছি। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন প্রায় ১২ কোটি গ্রাহক। অপারেটরগুলোর নিজস্ব টাওয়ার রয়েছে ২১ হাজার ৩৬৯টি। আর সাত হাজারের বেশি টাওয়ার ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে দেশের সব অঞ্চলে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে টাওয়ারের সংখ্যা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। আবার অর্থনৈতিকভাবে খুব একটা লাভজনক না হওয়ায় দুর্গম এলাকায় টাওয়ার বসাতে মোবাইল অপারেটরগুলো সেভাবে আগ্রহী নয়। ফলে সাগরে বা পার্বত্য এলাকায় নেটওয়ার্ক পাওয়া কঠিন।
সম্প্রতি রাঙামাটির বাঘাইছড়ি এলাকার শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহেরের একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে হাজিরা খাতার ছবি পাঠাতে তাঁকে গাছের ডালে উঠতে হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে ডিটুসি প্রযুক্তি।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবনের গভীরে, পাহাড়ে বা সমুদ্রের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে চলে গেলেও খুদে বার্তা পাঠিয়ে দুই দিক থেকেই যোগাযোগ রাখা সম্ভব হচ্ছে। স্টারলিংকের পরবর্তী প্রজন্মের স্যাটেলাইট কক্ষপথে পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় হলে ভবিষ্যতে ভয়েস কলের সুযোগও আসতে পারে।
মার্কিন সাময়িকী লাইট রিডিং–এর এক প্রতিবেদন বলছে, সম্প্রতি গ্লোব টেলিকম যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনটিসির অনুমোদনের পর স্টারলিংকের সহযোগিতায় বাণিজ্যিকভাবে ডিটুসি চালু করেছে।
উন্নত দেশগুলোতে কী অবস্থা
বিশ্বজুড়ে ডিটুসি প্রযুক্তি এগিয়ে গেছে ভিন্ন ভিন্ন গতিতে। এশিয়ায় সবচেয়ে বড় অগ্রগতি ঘটেছে ফিলিপাইনে।
মার্কিন সাময়িকী লাইট রিডিং–এর এক প্রতিবেদন বলছে, সম্প্রতি গ্লোব টেলিকম যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনটিসির অনুমোদনের পর স্টারলিংকের সহযোগিতায় বাণিজ্যিকভাবে ডিটুসি চালু করেছে।
লাইট রিডিং জানায়, সম্প্রতি ফিলিপাইনের মিন্দানাওয়ে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের পর দুর্গত এলাকায় জরুরি যোগাযোগ সচল রাখতে এই সেবা ব্যবহারের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে গ্লোব টেলিকম।
বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের চলতি বছরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল ২০২৬ সালে ডিটুসি প্রযুক্তির সবচেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল বাজার হয়ে উঠবে।
বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান স্টারলিংকের সঙ্গে এই উদ্যোগের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ফলাফল ইতিবাচক। বাণিজ্যিকভাবে চালু হলে প্রথম পর্যায়ে এসএমএস (খুদে বার্তা) ও ওটিটি মেসেজিং সেবা পাওয়া যাবে। পরবর্তী সময়ে ভয়েস ও ডেটা সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।‘নির্ভরযোগ্য বিকল্প হতে পারে’
বাংলালিংক এ বছরের শুরুতে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ১৯২০-১৯২৫ ও ২১১০-২১১৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ সাময়িকভাবে স্টারলিংকের নেটওয়ার্কে ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। মে মাসে বিটিআরসি পরীক্ষামূলকভাবে সেবা চালুর অনুমোদন দেয়।
বাংলালিংকের অপারেটরটির পর্যবেক্ষণ হলো, স্যাটেলাইট টু মোবাইল প্রযুক্তি বাংলাদেশের দুর্গম অঞ্চল, যেমন পাহাড়ি এলাকা, চর, উপকূলীয় দ্বীপ এবং সমুদ্র অঞ্চলে সংযোগ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এটি জরুরি যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য বিকল্প হতে পারে।
বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, স্টারলিংকের সঙ্গে এই উদ্যোগের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ফলাফল ইতিবাচক। বাণিজ্যিকভাবে চালু হলে প্রথম পর্যায়ে এসএমএস (খুদে বার্তা) ও ওটিটি মেসেজিং সেবা পাওয়া যাবে। পরবর্তী সময়ে ভয়েস ও ডেটা সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারীমোবাইল সেবার জন্য নির্ধারিত আইএমটি ব্যান্ডের তরঙ্গ স্যাটেলাইটভিত্তিক সেবায় ব্যবহার করা হবে কি না, তা নিয়ে আইটিইউতে এখনো আলোচনা চলছে। আইটিইউর দিকনির্দেশনা এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক অনুমোদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।বিটিআরসি বাংলালিংককে যে অনুমোদন দিয়েছে, তা শুধু পরীক্ষামূলক। এটিকে কোনোভাবেই ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক অনুমোদনের নিশ্চয়তা হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।
জাতিসংঘের টেলিযোগাযোগভিত্তিক সংস্থা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) নীতিমালা অনুযায়ী, মুঠোফোন সেবার জন্য বরাদ্দকৃত তরঙ্গ (আইএমটি ব্যান্ড) এখনো স্যাটেলাইট সেবায় ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয়। ২০২৭ সালের ওয়ার্ল্ড রেডিও কনফারেন্সে (ডব্লিউআরসি) এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
জানতে চাইলে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, মোবাইল সেবার জন্য নির্ধারিত আইএমটি ব্যান্ডের তরঙ্গ স্যাটেলাইটভিত্তিক সেবায় ব্যবহার করা হবে কি না, তা নিয়ে আইটিইউতে এখনো আলোচনা চলছে। আইটিইউর দিকনির্দেশনা এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক অনুমোদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।