আমরা মানুষের আকাঙ্ক্ষার মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করেছি

· Prothom Alo

জুলাই গণ–আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় যখন যোগাযোগ সীমিত, তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ৯ দফা ঘোষণা করে আলোচনায় আসেন অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল কাদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই শিক্ষার্থীর সেই ঘোষণা আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়, যা পরে রূপ পায় গণ–অভ্যুত্থানে। আন্দোলনের বিভিন্ন দিক ও পরবর্তী ভাবনা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন প্রথম আলোর প্রতিবেদক আসিফ হাওলাদার

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আপনি যোগ দিয়েছিলেন কেন?

Visit extonnews.click for more information.

আবদুল কাদের: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমার স্বপ্ন ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করব। সে উদ্দেশ্যে ছোট–বড় সব ধরনের কাজই করার চেষ্টা করেছি। কোনো শিক্ষার্থী গেস্টরুমে নির্যাতনের শিকার হলে গভীর রাতেও আন্দোলনে নেমেছি। বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের স্মরণসভাকে কেন্দ্র করে আমাদের জেলে নেওয়া হলো। শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকে আমাকে বোঝাতেন, ‘তোমার বাবা দারোয়ানের কাজ করেন। তিনি অসুস্থ। তুমি পরিবারের বড় ছেলে। তোমাকে তো পরিবারের হাল ধরতে হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ছাত্রলীগ আমাকে হল থেকে বের করে দিয়েছিল। আমি যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতাম। আমার পাঁচটা টিউশন ছিল। সেগুলো করেও সাংগঠনিক কাজের অংশ হিসেবে প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থাকতাম। দেশে স্বৈরাচারী সরকার আর আমি যুবক হয়ে মুখ বন্ধ করে সেটা নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছি; শেষ বয়সে এটা মানতে পারব না, এ তাড়না থেকে মনে হয়েছিল যে কিছু একটা করতে হবে। কোটা সংস্কার আন্দোলনেও ছিলাম। শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারি বাহিনীর নিপীড়ন–নির্যাতনের একপর্যায়ে যখন আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের কোনো নেতা ছিলেন না, তখন আমি সবার সঙ্গে আলাপ–আলোচনা করে আন্দোলনকে বেগবান করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।

দেশে স্বৈরাচারী সরকার আর আমি যুবক হয়ে মুখ বন্ধ করে সেটা নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছি; শেষ বয়সে এটা মানতে পারব না, এ তাড়না থেকে মনে হয়েছিল যে কিছু একটা করতে হবে।

সামনের সারির নেতারা যখন আত্মগোপনে বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বন্দী, দেশজুড়ে আতঙ্ক, তখন ঝুঁকি নিয়ে ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেছিলেন। এত সাহস কোথায় পেলেন?

জুলাই আন্দোলন

আবদুল কাদের: ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ডামি নির্বাচনের প্রতিবাদে ৬ জানুয়ারি রাজু ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। আমাদের গুম করে ফেলতে পারে জানার পরও দাঁড়িয়েছিলাম। কারণ, আমরা অন্যায়–অবিচার থেকে মুক্তি পেতে চাইতাম। আমাদের ভাবনা ছিল, জীবন যায় যাক, তবু স্বৈরাচারের পতনে ভূমিকা রাখব। সেটাই ছিল মূল প্রেরণা।

৯ দফা প্রস্তুত হয়েছিল কীভাবে?

ডিবি হেফাজতে থাকা আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এভাবে দেখা যায়

আবদুল কাদের: সে সময় আমার যোগাযোগ ছিল মূলত নাহিদ ইসলাম (বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ) ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার সঙ্গে। কিন্তু ১৮ জুলাই দুপুরের পর থেকে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। ১৭ থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত অবস্থাটা ছিল এ রকম—অফলাইনে টুকটাক ফোন যায়, ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ২০ জুলাই পর্যন্ত আমি যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনে ছিলাম।

১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানাসংলগ্ন জামে মসজিদে জুমার নামাজ পড়ি। নামাজের পর মসজিদ থেকে মিছিল বের হলে পুলিশের গুলিতে সাতজন মারা যায়। মানুষের ছোটাছুটি আর কান্নার মধ্যে আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। পাশে শনির আখড়া এলাকার একটা হাসপাতালের ফটকে ছাত্রলীগের ছেলেরা দাঁড়িয়ে ছিল। তারা কাউকে ঢুকতে দিচ্ছিল না। মানুষকে কোপাচ্ছিল। পার্শ্ববর্তী রায়েরবাগ এলাকায়ও ছিল একই চিত্র। এক কিশোর ফোনের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিল। নামাজের আগে তারা কয়েক বন্ধু একটা গ্রুপ ছবি তুলেছে। পরে সবাই মিছিলে যোগ দেয়। সেখানে এক বন্ধু মারা গেছে। সে বলল, ‘আমি আর আন্দোলন ছেড়ে যাব না, প্রয়োজনে আমিও মারা যাব।’ এমন অবস্থার মধ্যে আমি নাহিদ ভাই ও আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলাম। বেলা সাড়ে তিনটার পর ছাত্রশিবিরের নেতা এস এম ফরহাদ (বর্তমানে ডাকসুর জিএস) আমাকে ফোনে পরিস্থিতি জানালেন। বললেন, কাউকে ফোনে পাচ্ছেন না। আমিও একই অবস্থার কথা বললাম। তিনি বললেন, সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও হাসিব আল ইসলাম নাকি সরকারের সঙ্গে বসে সমঝোতা করতে চাইছেন।

এর আগে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ডিজিএফআই নাহিদ ভাইকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে বলে, ‘তোমরা সংবাদ সম্মেলন করে বলো যে আমরা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।’ হাসনাত–সারজিস সে প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। নাহিদ ভাই বলেন, ‘বাকের, কাদের, আসিফদের সঙ্গে আলোচনা না করে আমি কিছু করতে পারব না। এ রকম সংবাদ সম্মেলন ডাকলে মানুষ আমাকে গাদ্দার বলবে।’ নাহিদ ভাই তাদের বলেন, বাসায় গিয়ে একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেবেন। তখন ডিজিএফআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হলো, ‘ঠিক আছে, তোমরা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দাও। কিন্তু সেখানে উল্লেখ করতে হবে, আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।’ এত দিন আমরা বসার জন্য প্রস্তুত ছিলাম, তারা চায়নি। এবার তারা চাইল।

সেদিন রাত ১১টার আগে–পরে আমরা ভার্চ্যুয়ালি একটা বৈঠক করি। ডিজিএফআইকে নাহিদ ভাই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার কথা বলেছেন। সেটার জন্য দাবি–দাওয়া নিয়ে আলোচনা হলো। বৈঠকে তৎকালীন গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির নেতাদের সঙ্গে সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমও যুক্ত হন। নাহিদ ভাই ওই বৈঠকে বলেন, ‘পাঁচজন মানুষের মৃত্যুর বিনিময়ে কি আমরা শুধু কোটা সংস্কারের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকব, নাকি আরও কিছু দাবি–দাওয়া দেব?’ এর মধ্যে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামালসহ আওয়ামী সরকারের মন্ত্রীদের বিচার, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় উপাচার্য–প্রক্টরের পদত্যাগ—এসব সাধারণ দাবি সেখানে আসে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হলো, উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরকার দায়ী, সরকারকেই সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। রাত সাড়ে ১২টায় হাসনাত আবদুল্লাহ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটা তাঁর ফেসবুক থেকে পোস্ট করেন, সাংবাদিকদেরও পাঠান। পাঠানোর সময় তিনি একটা বাক্য নিজে থেকে যোগ করেন।

আমরা রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ১৭ জুলাই সকালে শিবিরের নেতা ফরহাদ ভাই আমাকে ফোন করে বলেন, ‘তোমরা শহীদদের রক্তের সঙ্গে গাদ্দারি করছ।’ এমন আচরণের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টেলিভিশনে স্ক্রল দিচ্ছে, শিক্ষার্থীরা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত, তারা পড়ার টেবিলে ফিরতে চায়। কিন্তু এ কথা আমরা কোথাও লিখিনি।’ হাসনাত ভাইকে ফোন করা হলে তিনি বললেন, ‘এটা তোমাদের দেখিয়েই দিয়েছি।’ সর্বশেষ সংস্করণটি দেখাতে বললে তিনি বলেন, তাঁর ভুল হয়েছে, তিনি দুঃখিত। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘খোদার কসম, এ রকম ভুল আর করব না।’

১৬ জুলাই রাতে যেসব দাবি ঠিক হয়েছিল, সেগুলো তখনো আমাদের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়নি। শিবির নেতা ফরহাদের সঙ্গে সেগুলো নিয়ে কথা হলো। এক ঘণ্টা পর আমাদের দাবিগুলোসহ আরও কিছু দাবি নিয়ে তিনি একটা খসড়া করলেন। সেখানে প্রথম দফা ছিল, সরকারকে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করতে হবে। আমি বললাম, আমার জায়গা থেকে এখন এটা দেওয়া সম্ভব নয়, সরকারের পদত্যাগের দাবি শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। কারণ, তখনো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আমাদের কোনো আলোচনা হয়নি। আমি ফরহাদ ভাইকে বললাম, এখন নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার কথা বলতে পারেন, পদত্যাগের দাবি দিতে পারব না; ক্ষমা চাইলেই তো শেখ হাসিনার কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকবে না। দ্বিতীয় দফা ঠিক হলো, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামালসহ মন্ত্রীদের বিচার এবং উপাচার্য–প্রক্টরদের পদত্যাগ। সাত নম্বর দফায় ‘ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে’। এ দাবি নিয়ে ফরহাদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার ২০–৩০ মিনিট বাগ্​বিতণ্ডা হয়। তিনি বললেন, ‘ছাত্ররাজনীতি যদি নিষিদ্ধ না করা হয়, তাহলে কোনোভাবে আন্দোলন ব্যর্থ হলে ছাত্রলীগ আমাদের মেরে ফেলবে।’ আমি বললাম, ছাত্ররাজনীতি না থাকলে আজকের আন্দোলনটা হতো না। পরে আমি বললাম, লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা বলা যেতে পারে। তাহলে যারাই নিপীড়ন করবে, তাদেরই নিষিদ্ধ করা যাবে। তিনি মেনে নিলেন। এভাবেই ৯ দফা প্রস্তুত হলো।

এর আগে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ডিজিএফআই নাহিদ ভাইকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে বলে, ‘তোমরা সংবাদ সম্মেলন করে বলো যে আমরা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।’ হাসনাত–সারজিস সে প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। নাহিদ ভাই বলেন, ‘বাকের, কাদের, আসিফদের সঙ্গে আলোচনা না করে আমি কিছু করতে পারব না।

সে সময় আপনার মধ্যে কোন চিন্তা কাজ করেছিল?

আবদুল কাদের: আন্দোলন তো আর আমার ওপর নির্ভরশীল ছিল না। মানুষের যা আকাঙ্ক্ষা ছিল, আমরা তার মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করেছিমাত্র।

দুই বছর পর এই জুলাইয়ে দাঁড়িয়ে ৯ দফা দাবি ঘোষণা করার কথা মনে পড়লে কেমন অনুভব করেন?

কোটা সংস্কার আন্দোলন দিয়ে শুরু হয়

আবদুল কাদের: মানুষ জীবন দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিল একটা পরিবর্তন ঘটানোর। তারা মাঠে নেমেছে, আবার মাঠ থেকে উঠে গেছে। তাদের আশা–আকাঙ্ক্ষা, চিন্তাভাবনার বাস্তবায়ন হয়নি। হাসিনার আমলে মানুষের কোনো মূল্য ছিল না। এখনো একই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। এটা খুবই হতাশাজনক। গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার কখনো আমাদের ডাকেনি। তাদের কাছে আমাদের মতামতের কোনো মূল্য ছিল না, রাস্তায় নামা লাখ লাখ মানুষের মতামতের মূল্য তো দূরের ব্যাপার।

৫ আগস্ট রাতে নাহিদ, আসিফ, মাহফুজরা নাবিলা ইদ্রিসের (সাবেক গুম কমিশনের সদস্য) বাসায় উপদেষ্টাদের তালিকা ঠিক করে ফেললেন। জনগণ কী চায়, তারা ছাত্রদের শাসনক্ষমতায় চায় কি না, সেটা ভাবা হয়নি। লিয়াজোঁ কমিটিতে কারা থাকবেন, তা কীভাবে ঠিক হলো, আমরা জানি না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন জায়গায় মব হলো, ট্যাগিংয়ের সংস্কৃতি আবার ফিরে এল। এসব ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র দায়িত্বশীলতা দেখা গেল না।

মানুষকে ব্যবহার করে ক্ষমতার পরিবর্তন হলো। কিন্তু মানুষের আকাঙ্ক্ষা, চাহিদা, মতামত বা অংশীদারত্বের কোনো জায়গা ছিল না। নীতিনির্ধারণে জনগণের অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে হাসিনার আমলে যে অবস্থা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও একই রকম ছিল। বিএনপির আমলেও একই চিত্র।

৭ আগস্ট সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধানসহ যে বৈঠক হয়, সেখানে দেশের মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। সেখানে শহীদদের রক্তের ওপর দিয়ে ভাগাভাগি হলো উপদেষ্টা পরিষদে বিএনপির কয়জন আসবে, জামায়াতের কয়জন থাকবে, ছাত্রদের পক্ষ থেকে কয়জন থাকবে। জনগণ, শিক্ষার্থী, বুদ্ধিজীবী, বিশেষজ্ঞ—কারও মতামত ছাড়াই উপদেষ্টা পরিষদ হলো। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, ত্রাণ ও দুর্যোগ উপদেষ্টা ছিলেন শারীরিকভাবে অসুস্থ। তাঁরা কীভাবে মন্ত্রণালয় চালাবেন? তাঁদের নিয়তই ছিল ক্ষমতা। শেখ হাসিনার আমলে প্রতিটি সেক্টরে যেভাবে ধস নেমেছিল, সেখান থেকে দেশকে আরও খাদের কিনারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। টিকায় অব্যবস্থাপনা হলো। কোনো সেক্টরে দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। তাঁরা নিজেদের এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন যে সংস্কারের কথা বললে মানুষ গালি দেয়। এর ফল আমাদের দীর্ঘদিন টানতে হবে।

৭ আগস্টের সেই বৈঠকে আমাদের নেওয়া হয়নি। তাঁদের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করেও আমি সেখানে প্রবেশাধিকার পাইনি। আন্দোলনের সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর আর কাউকে ডাকা হয়নি। সবাইকে সম্ভব না হলেও বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের ডাকা যেত।

স্ত্রীকে হারানো মানুষ এসে তাঁর স্বর্ণালংকার আমাদের দিয়ে গেছেন। কিন্তু সেই মানুষের আস্থা ধরে রাখা যায়নি। এখন সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ডাকলেও তো মানুষ আসবে না। এখন অন্য কেউ স্বৈরাচারী হলেও মানুষ কারও ওপর আস্থা রাখবে না। দীর্ঘ সময়ের জন্য একটি সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে।

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে এক দফার ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে এসেছিল?

‘এক দফা’র প্ল্যাকার্ড হাতে আন্দোলনকারীদের সমাবেশ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা, ৩ আগস্ট ২০২৪

আবদুল কাদের: ১ আগস্ট ছয় সমন্বয়ক ডিবি কার্যালয় থেকে মুক্ত হলেন। সেদিন দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে আসিফ ভাই আমাকে ফোন করে বললেন, ‘তুই সাবধানে থাকিস, তোকে পেলে মেরে ফেলবে।’ ১টা ১৩ মিনিটে তিনি আমাকে মেসেজ দিয়ে বলেন, ‘আমরা সিনিয়ররা বের হয়েছি; আমাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কর্মসূচি দিয়ো না।’ তাঁরা কিছুদিন ডিবি কার্যালয়ে ছিলেন, বাইরের অবস্থা সম্পর্কে সেভাবে জানেন না, তাই আমি সাংবাদিকদের একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ২ আগস্ট দোয়া–মোনাজাত, প্রার্থনা ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করি। আসিফ ভাই সঙ্গে সঙ্গেই আপত্তি জানান। বড় আপত্তি আসে সন্ধ্যা নাগাদ। সন্ধ্যার পর থেকে অনেক সাংবাদিক আমাকে ফোন করে বলছিলেন, সারজিস আলম হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে আমার কর্মসূচিটি ডিলিট করে দিয়ে লিখেছেন, ‘এটা কাদেরের ব্যক্তিগত কর্মসূচি; কাদের উচ্চপর্যায়ের কোনো সমন্বয়ক নন; আমরা আলাপ–আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাব।’ পরে দেখতে পাই, সেই গ্রুপ থেকে আমাকে বের করে দিয়েছেন সারজিস। আমি ওই গ্রুপে আর কোনো বার্তা দিতে পারছিলাম না।

সে সময় নাহিদ ভাই আর আসিফ ভাইকে ফোনে পাচ্ছিলাম না। পরে সেই গ্রুপের অ্যাডমিন সমন্বয়ক আবদুল্লাহ সালেহীন অয়নকে দিয়ে সারজিসের মেসেজটা ডিলিট করাই। অয়ন আমাকে আবার গ্রুপে যুক্ত করে। সারজিসের ডিলিট করা কর্মসূচির বার্তা আমি আবার গ্রুপে দিলাম। সারজিসকেও গ্রুপ থেকে রিমুভ করে দিলাম। আসিফ ভাই আমাকে বললেন, ‘তোমাকে তো নিষেধ করছিলাম, কর্মসূচি দেওয়ার আগে আলোচনা করা উচিত ছিল।’ আমি বললাম, ভাই, আমি তো ভুল কিছু করিনি। ওই সময় নাহিদ ভাই ও আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে হাসনাত ভাই ও সারজিস ভাই খুবই ঝামেলা করছিলেন। হাসনাত–সারজিস বলছিলেন, ‘তোমরা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছ, বিএনপি–জামায়াতের পায়ে আন্দোলন করছ, কাদেরকে থামাও।’ একপর্যায়ে আমি সাদিক ভাইকে (ডাকসুর বর্তমান ভিপি সাদিক কায়েম) ফোন করে বললাম, সারজিস তো এমন করছেন, তাঁদের থামান। সাদিক কী করেছিলেন জানি না, একপর্যায়ে সারজিস চুপ হয়ে যান।

সে রাতে সিদ্ধান্ত হলো, যে ঝামেলা হয়েছে, তা নিয়ে ২ আগস্ট জুমার নামাজের পর বৈঠকে বসব। হাসনাত–সারজিসকে কোনোভাবেই বোঝানো যাচ্ছিল না। তাঁরা আর আন্দোলন করতে চাইছিলেন না। তাঁদের সঙ্গে হাসিব আল ইসলামও ছিলেন। জুমার পর অনলাইনে আমাদের বৈঠক হয়। সেখানে তৎকালীন ছাত্রশক্তির নেতা–কর্মীরা ছিলেন। ওই বৈঠকে হাসিব বলেন, তিনি আন্দোলন চালিয়ে যেতে চান না। তাঁর ঝুঁকি লাগছে। মানুষ মারা যাচ্ছে, এ দায় আমাদের। একপর্যায়ে আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, আন্দোলন কে করল না–করল, সেটা ব্যাপার নয়; কেউ যেন স্যাবোটাজ না করে। এ কথা বলার কারণ, সে সময় কর্মসূচি ঘোষণার কারণে হাসিব আমাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে কয়েকটা পোস্ট দিয়েছিল।

এ বৈঠক চলাকালে বেলা তিনটা–সাড়ে তিনটার দিকে আনু মুহাম্মদ স্যারের নেতৃত্বে প্রেসক্লাব থেকে দ্রোহযাত্রা বের হচ্ছে। সেখানে কী বলা হচ্ছে, সেই আপডেট আমি সিনিয়রদের জানাচ্ছিলাম। তখন মানুষ মানসিকভাবে এক দফায় পৌঁছে গেছে। আমি সিনিয়রদের জানালাম, দ্রোহযাত্রা থেকে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদরা সরকারের পদত্যাগের দাবি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাচ্ছেন। ফলে মানুষ আর আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে না, আমাদের এক দফার দিকে যাওয়া উচিত। এর জবাবে বৈঠকে মাহফুজ আলম (সাবেক উপদেষ্টা) আমাকে বললেন, ‘আমরা এখন এক দফার দিকে যাব না, তোমরা ৯ দফা প্রত্যাহার করে ৪ দফায় নিয়ে আসো।’ ওই চার দফা ছিল: ক্যাম্পাস খুলতে হবে, জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা দিতে হবে, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দিতে হবে। তাঁদের চিন্তা ছিল, ক্যাম্পাস খোলার পর সুসংগঠিত হয়ে আবার আন্দোলনে যাবেন।

আসিফ ভাই অসহযোগ আন্দোলনের কথা বললেন। আমি এক দফা নিয়ে ভাবার কথা বললাম। কারণ, পরিস্থিতি নাজুক, আন্দোলন আমাদের হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে।

২ আগস্ট আমাদের ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে আন্দরকিল্লায় বিশাল মিছিল হয়। তবে ঢাকায় কর্মসূচি হয় ছোট পরিসরে। কারণ, ঢাকার কোন অংশে কে থাকবে, সেটা সমন্বয় করা যায়নি। এর আগে কর্মসূচিগুলোয় এলাকা ভাগ করে দেওয়া হতো; এই অংশে ছাত্রদল থাকবে, ওই অংশে শিবির। ২২–২৩ জুলাই থেকে প্রতিদিনই এ সমন্বয় করা হয়েছে।

সন্ধ্যার পর থেকে অনেক সাংবাদিক আমাকে ফোন করে বলছিলেন, সারজিস আলম হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে আমার কর্মসূচিটি ডিলিট করে দিয়ে লিখেছেন, ‘এটা কাদেরের ব্যক্তিগত কর্মসূচি; কাদের উচ্চপর্যায়ের কোনো সমন্বয়ক নন; আমরা আলাপ–আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাব।’ পরে দেখতে পাই, সেই গ্রুপ থেকে আমাকে বের করে দিয়েছেন সারজিস। আমি ওই গ্রুপে আর কোনো বার্তা দিতে পারছিলাম না।

দুই বছর পরে কী মনে হচ্ছে? এই আন্দোলন জাতিকে কী দিল?

আবদুল কাদের: এতক্ষণ হতাশার কথা বললাম, তবে আমি আশাবাদী। আমরা যে পরিবর্তন ঘটাতে পারি, জুলাইয়ের মাধ্যমে সে সম্ভাবনার দরজা উন্মোচিত হয়েছে। আগে ভোটাধিকার ছিল না, এখন আমাদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণের কাছে আমরা দায়বদ্ধ—এ ভাবনা প্রধানমন্ত্রীসহ জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। মানুষের মনোভাবেও পরিবর্তন এসেছে। মানুষ আশা পেয়েছে যে তারা চাইলে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারে। জনগণের মধ্যে যে সচেতনতা জেগেছে, সেটাকে অব্যাহত রাখতে হবে।

আমি পরিবারের বড় সন্তান, আমার দুই ছোট ভাই আছে। কিন্তু কখনো পরিবারের দিকে তাকানো হয়নি। আমার বাবা পেশায় দারোয়ান। মা খুব অসুস্থ। কিছুদিন আগে নানু মারা যাওয়ার পর উপলব্ধি হয়েছে, এখন পরিবারকে সময় দেব। আমি রাজনৈতিক মানুষ। রাজনীতি অবশ্যই করব। আপাতত বিরতি নিয়েছি।

জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির অধিকাংশ ছাত্রনেতা নতুন একটি দল গঠন করে তাতে যোগ দিয়েছেন। আপনি যোগ দেননি। কী কারণে?

আবদুল কাদের: এখনই এমপি বা মন্ত্রী হতে হবে, তেমন কোনো চিন্তা আমার নেই। জুলাইয়ের আগে যা বলতাম, তা করতাম। এখনকার রাজনীতিতে দায়বদ্ধতার ব্যাপারটা খুবই খেলো হয়ে গেছে। মুখে যা বলছি, কেউ সেটা কাজে করছি না। সে জন্য আমি কোনো কিছুতে জড়াইনি। আমাকে এনসিপিতে যোগ দিতে বলা হয়েছিল। জানতে চাইলাম, আমার দায়িত্ব কী হবে। তাঁরা আমাকে আমার আসন গোছাতে বললেন। আসন গোছানোর রাজনীতি আমি করতে চাইনি। এনসিপির সমস্যা হচ্ছে, সেখানে দায় নিতে হবে, কিন্তু কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। মূলধারার ও বিভিন্ন বামপন্থী দলও আমাকে ডেকেছে। কিন্তু রাজনীতিতে এখন কোনো আশা দেখছি না। তাই আপাতত কোথাও যোগ দিচ্ছি না। আমি পরিবারের বড় সন্তান, আমার দুই ছোট ভাই আছে। কিন্তু কখনো পরিবারের দিকে তাকানো হয়নি। আমার বাবা পেশায় দারোয়ান। মা খুব অসুস্থ। কিছুদিন আগে নানু মারা যাওয়ার পর উপলব্ধি হয়েছে, এখন পরিবারকে সময় দেব। আমি রাজনৈতিক মানুষ। রাজনীতি অবশ্যই করব। আপাতত বিরতি নিয়েছি।

Read full story at source