ফোবিয়া: ভয়ের সীমা কোথায়

· Prothom Alo

লিফটের দরজা খুলতেই একজন মানুষ হঠাৎ পিছিয়ে গেলেন। বন্ধ জায়গায় ঢুকতে হবে, এই চিন্তাতেই তাঁর বুক ধড়ফড় করছে। আবার আরেকজন একটি ছোট্ট মাকড়সা দেখে এতই ভয় পেলেন যে চিৎকার করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমাদের কাছে এসব ঘটনা হয়তো অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। কিন্তু যাদের জীবনে এমনটা ঘটে, তাদের জন্য এই ভয় একেবারেই বাস্তব। তারা ইচ্ছে করলেই ভয় কাটিয়ে উঠতে পারেন না। এই অস্বাভাবিক ও তীব্র ভয়কেই বলা হয় ফোবিয়া।

ভয় মানুষের খুবই স্বাভাবিক একটি অনুভূতি। বিপদ এলে ভয়ই আমাদের সতর্ক করে, সাবধান করে, কখনো কখনো জীবনও বাঁচায়। কিন্তু কোনো প্রকৃত বিপদ না থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো নির্দিষ্ট জিনিস, প্রাণী, স্থান বা পরিস্থিতিকে ঘিরে এমন এক তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়, যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করে, তখন সেটি আর সাধারণ ভয় থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে ফোবিয়া। মজার ব্যাপার হলো, ফোবিয়ায় আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষই জানেন যে তাঁদের ভয়টি অযৌক্তিক। তবুও সেই ভয়কে তাঁরা থামাতে পারেন না।

Visit palladian.co.za for more information.

ফোবিয়া শব্দটিরও একটি চমৎকার ইতিহাস রয়েছে। এটি এসেছে গ্রিক শব্দ ফোবোস (Phobos) থেকে। গ্রিক পুরাণে ফোবোস ছিলেন ভয় ও আতঙ্কের প্রতীক। হাজার বছর আগে মানুষের কল্পনার সেই চরিত্রের নামই আজ মনোবিজ্ঞানে একটি স্বীকৃত মানসিক অবস্থার পরিচয় বহন করছে।

ফোবিয়া কী, কেন ফোবিয়া হয়
মজার বিষয় হলো, লম্বা শব্দের ভয়কে বলা হয় হিপোপোটোমনস্ট্রোসেসকুইপেডালিওফোবিয়া। বিদ্রূপের বিষয়, যে মানুষ লম্বা শব্দকে ভয় পান, তাঁর জন্য এই ফোবিয়ার নামটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শুনে অবাক লাগতে পারে, পৃথিবীতে ৫০০টিরও বেশি ধরনের ফোবিয়ার কথা নথিভুক্ত হয়েছে। কিছু ফোবিয়া আমাদের পরিচিত। যেমন উচ্চতাভীতি, অন্ধকারের ভয়, সাপ বা মাকড়সার ভয়, বন্ধ ঘরে থাকার ভয় কিংবা বিমানে ভ্রমণের ভয়। তবে কিছু ফোবিয়া এতই অদ্ভুত যে প্রথমবার শুনলে বিশ্বাস করাই কঠিন। যেমন, মোবাইল ফোন কাছে না থাকলে অনেকের ভীষণ অস্থির লাগে। এই অবস্থার নাম নোমোফোবিয়া। আবার কেউ কেউ নাভি দেখতেও ভয় পান। আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, লম্বা শব্দের ভয়কে বলা হয় হিপোপোটোমনস্ট্রোসেসকুইপেডালিওফোবিয়া। বিদ্রূপের বিষয়, যে মানুষ লম্বা শব্দকে ভয় পান, তাঁর জন্য এই ফোবিয়ার নামটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তাহলে এমন ভয় তৈরি হয় কেন? এর একক কোনো উত্তর নেই। অনেক সময় শৈশবের কোনো ভীতিকর অভিজ্ঞতা মানুষের মনে এত গভীর ছাপ ফেলে যে বহু বছর পরেও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সেই আতঙ্ক ফিরে আসে।

মোবাইল ফোন কাছে না থাকলে অনেকের ভীষণ অস্থির লাগে। এই অবস্থার নাম নোমোফোবিয়া

কখনো পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে একই ধরনের ভয় দেখা যায়। আবার দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ কিংবা মস্তিষ্কের কিছু জৈবিক বৈশিষ্ট্যও ফোবিয়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

ফোবিয়া শুধু মনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, শরীরও তার প্রতিক্রিয়া দেখায়। হঠাৎ হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে, শ্বাস দ্রুত চলতে শুরু করে, হাত পা কাঁপে, ঘামতে থাকে, মাথা ঝিমঝিম করে। অনেকের ক্ষেত্রে এতটাই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায় যে তাঁরা প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সেই ভয়ের কারণটি এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। কিন্তু সমস্যা হলো, যত বেশি এড়িয়ে চলা হয়, ভয় ততই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

বেশিরভাগ মানুষ মাকড়সা দেখলে ভয় পায় কেন
কিছু ফোবিয়া এতই অদ্ভুত যে প্রথমবার শুনলে বিশ্বাস করাই কঠিন। যেমন, মোবাইল ফোন কাছে না থাকলে অনেকের ভীষণ অস্থির লাগে। এই অবস্থার নাম নোমোফোবিয়া।

গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চতার ভয় পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ ফোবিয়াগুলোর একটি। আবার ছোটবেলায় অন্ধকার বা বজ্রপাতকে ভয় পাওয়া খুবই স্বাভাবিক। বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভয় কমে যায়। কিন্তু ফোবিয়া ভিন্ন বিষয়। এটি অনেক সময় বছরের পর বছর থেকে যায় এবং চিকিৎসা ছাড়া সহজে দূর হয় না। এমনকি বিশ্বের বহু বিখ্যাত মানুষও বিভিন্ন ধরনের ফোবিয়ায় ভুগেছেন। তাই ফোবিয়া দুর্বলতার নয়, বরং একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার নাম।

সৌভাগ্যের বিষয় হলো, এখন ফোবিয়ার কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। মনোবিজ্ঞানে কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT) এবং এক্সপোজার থেরাপি সবচেয়ে সফল পদ্ধতিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এসব চিকিৎসায় ধীরে ধীরে মানুষকে নিরাপদ পরিবেশে নিজের ভয়ের মুখোমুখি হতে শেখানো হয়।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফোবিয়া নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর একটি থেরাপি হলো কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপিআধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফোবিয়া নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর আরেকটি থেরাপি হলো এক্সপোজার থেরাপি

প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধও ব্যবহার করা হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও পরিবারের সহযোগিতা পেলে অধিকাংশ মানুষই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।

ভয় আমাদের সবার জীবনেই আছে। কেউ ব্যর্থতাকে ভয় পাই, কেউ অন্ধকারকে, কেউ আবার নতুন কিছু শুরু করতে। কিন্তু যখন সেই ভয় আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সেটিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। ফোবিয়া লজ্জার নয়, লুকিয়ে রাখারও নয়। বরং এটি বোঝা, মেনে নেওয়া এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়াই সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত। কারণ ভয়কে অস্বীকার করে নয়, তাকে বুঝেই জয় করা যায়।

মাইগ্রেন: মাথাব্যথার সীমা ছাড়িয়ে মস্তিষ্কের এক ভয়ংকর স্নায়বিক ঝড়

Read full story at source