লিটন-নাহিদের এই অবস্থা কেন
· Prothom Alo

অস্ট্রেলিয়া বরাবরই কাঙ্ক্ষিত এক টেস্ট গন্তব্য। একজন ফাস্ট বোলার সব সময়ই চাইবেন অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে নিজের গতি–বাউন্স–মুভমেন্টের সর্বোচ্চ প্রদর্শনী দেখাতে। একজন ব্যাটসম্যানেরও প্রত্যাশা থাকে, যদি ওই কন্ডিশনে নিজের ব্যাটিং সামর্থ্যের সর্বোচ্চ জানান দেওয়া যায়! মোটকথা, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে থাকা টেস্ট ক্রিকেটের সুঘ্রাণ নেওয়াটা ক্রিকেটার মাত্রেরই চাওয়া।
বহু বছর পর, নির্দিষ্ট করে বললে সময়টা ২৩ বছর, বাংলাদেশ দল অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে দুই টেস্টের সিরিজ খেলার জন্য। মাঝে বাংলাদেশে ক্রিকেটারদের একটা প্রজন্মই চলে গেছে, যারা কখনো অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলেনি। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মাহমুদউল্লাহর মতো ক্রিকেটারদের কখনো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলা হয়নি—বিস্ময়কর না! টেস্ট ক্রিকেটটা এখনো চালিয়ে যাওয়ায় ওই প্রজন্মের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে অবশ্য মুশফিকুর রহিমের সামনে এবার সুযোগটা থাকছে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
কিন্তু চোটের কারণে বহুল প্রতীক্ষিত এই সিরিজেই আবার বাংলাদেশ পাচ্ছে না দলের সেরা পেস বোলার নাহিদ রানাকে। ব্যাটিংয়ে প্রত্যাশাটা যাঁর কাছে সব সময় বেশি থাকে, সেই লিটন দাসেরও খেলা হবে না ডারউইনের প্রথম টেস্টে। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে এই টেস্টে খেলা হবে না পেসার শরীফুল ইসলামেরও। পুরোপুরি চোটমুক্ত হলে ম্যাকাইয়ের দ্বিতীয় টেস্টের বিবেচনায় থাকবেন এই দুজন।
তিনজনের পথেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চোট। লিটন আর নাহিদের চোট তো বিতর্কেরও সৃষ্টি করেছে। গতকাল ঘোষিত প্রথম টেস্টের দল নিয়ে করা সংবাদ সম্মেলনে আজ এ নিয়ে প্রশ্নের মুখেও পড়েছেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। লিটন, নাহিদের চোট ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগের আঙুল উঠেছে বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগের দিকেও।
লিটন, নাহিদের কার কী চোট
জিম্বাবুয়ে সফরের শেষ টি–টুয়েন্টিতে সাইড স্ট্রেইনে (পাঁজরের বাঁ পাশে) পড়েন পেসার নাহিদ। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে কোনো টেস্টেই খেলা হবে না তাঁর। পুরোপুরি খেলার মতো অবস্থায় আসতে নাহিদের দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগবে বলে জানিয়েছে বিসিবি।
গত ১৪ জুন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোম সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডেতে ব্যাটিংয়ের সময় বাঁ পায়ের মাংসপেশিতে (কাফ মাসল) চোট পান লিটন। বর্তমানে সিঙ্গাপুরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে তাঁর পিআরপি (প্লাটিলেট-রিচ প্লাজমা থেরাপি, রোগীর নিজের রক্তের প্লাজমা ব্যবহার করে করা চিকিৎসা) চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষে ১৩ আগস্ট লিটনের ফিটনেস টেস্ট হওয়ার কথা।
দুজনের চোট নিয়ে বিতর্ক
জিম্বাবুয়ে সফরের একমাত্র টেস্টে খেলেননি নাহিদ। ওয়ানডে সিরিজে দুটি ম্যাচ খেলেছেন, টি–টুয়েন্টিও খেলেছেন প্রথম দুটি। নাহিদকে নিয়ে প্রশ্ন—ওয়ানডেতে নাহয় র্যাঙ্কিংয়ের একটা বিষয় থাকে, টি–টুয়েন্টিতে তো তা নেই। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ সামনে রেখে তাহলে কি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি–টুয়েন্টি সিরিজে তাঁকে বিশ্রাম দেওয়া যেত না!
লিটনের চোট নিয়ে বলা হচ্ছে, তাঁর চোটের ভুল মূল্যায়ন করেছে বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগ। যে কারণে জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়েও তিনি কোনো ম্যাচ খেলতে পারেননি। পায়ে সমস্যা থাকার পরও কেন লিটনকে জিম্বাবুয়ে পাঠানো হলো, কেন বিশ্রামে রাখা হলো না—উঠছে এসব প্রশ্নও। মাংসপেশির চোট সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়। অথচ চোট পাওয়ার দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও লিটন এখনো খেলার মতো অবস্থায় নেই। অনিশ্চিত তাঁর অস্ট্রেলিয়ায় খেলাও। লিটনের ‘ভুল চিকিৎসা’কেই দায়ী করা হচ্ছে এর জন্য।
আসলেই কি ভুল সিদ্ধান্তের শিকার নাহিদ
নাহিদের ক্ষেত্রে অভিযোগটা সরাসরিই উড়িয়ে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল। তিনি জানান, নাহিদকে ‘ওয়ার্কলোড’ ম্যানেজ করেই খেলানো হচ্ছে। যে কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোম সিরিজে তাঁকে সব ম্যাচ খেলানো হয়নি, বিশ্রামে ছিলেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট আর একটি ওয়ানডেতেও।
নাহিদের ‘ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টে’র ব্যাখ্যায় বিস্তারিতই বলেছেন প্রধান নির্বাচক, ‘ফাস্ট বোলারদের আমরা রেড, গ্রিন ও ইয়েলো তিনটা জোনে রাখি। কেউ বেশি বল করে ওভারলোডেড হয়ে গেলে রেড জোনে চলে যায়, আবার কম বোলিং করলেও কিন্তু রেড জোনে চলে যায়। তার মানে একজন বোলারকে যথেষ্ট পরিমাণ বোলিং করতে হবে। নাহিদকেও টেস্ট ম্যাচ খেলার আগে যথেষ্ট পরিমাণ বল করতে হতো। তার মানে তাকে কিছু একটা খেলতেই হতো।’
টেস্ট অধিনায়ক নাজমুলের সঙ্গে নাহিদ রানাপ্রসঙ্গত, জিপিএস ট্র্যাকারের কথাও বলেছেন প্রধান নির্বাচক, আধুনিক ক্রিকেটে যে ডিভাইসের সুবাদে একজন ক্রিকেটার কয়টি ম্যাচ খেলতে বা কতক্ষণ অনুশীলন করতে পারবেন, সে ব্যাপারেও ধারণা পাওয়া যায়। ‘এখন তো জিপিএস ট্র্যাকারও থাকে, কাজেই এখন সবকিছুই ট্র্যাক করা যায় কে কোন ম্যাচ খেলবে, কে কয়টা ম্যাচ খেলবে, কোন সিরিজে কোনটা খেলতে পারবে—এভাবে সবারটাই ট্র্যাক করা হয়’—বলেছেন হাবিবুল।
নাহিদের ব্যাপারে হাবিবুল এরপর যেটা বলেছেন, সেটাই আসলে উপসংহার—একজন ফাস্ট বোলার ফাস্ট বোলিং করবে আর চোটে পড়বে না; এটা কঠিন। ফাস্ট বোলারকে চোটমুক্ত রাখার সব চেষ্টার পরও অঘটন ঘটতে পারে এবং সেটাই স্বাভাবিক, সেটাই ঘটেছে নাহিদের ক্ষেত্রে।
লিটনের ক্ষেত্রে যা হয়েছে
হাবিবুল এ–ও মনে করেন না, লিটনের চোটের অবস্থা মূল্যায়নে বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগের কোনো দায় আছে। কারণ, এসব ক্ষেত্রে বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগ ক্রিকেটারদের চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয় স্ক্যান আর বিভিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে। ক্রিকেটারদের সেসব পরীক্ষা–নিরীক্ষা করানো হয় দেশ–বিদেশের সেরা হাসপাতালগুলোতে।
লিটনের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে চোট পেলেও পরে আবার ব্যাটিংয়ে নেমে লিটন ৫৮ রানে অপরাজিত ছিলেন। তেমন সমস্যা বোধ না করায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চট্টগ্রামের টি–টুয়েন্টি সিরিজের দলেও তাঁকে রাখা হয়েছিল; খেলার কথা ছিল দ্বিতীয় টি–টুয়েন্টিতে। কিন্তু তখন ব্যথা অনুভব করলে ১৭ জুন চট্টগ্রামেই লিটনের পায়ের স্ক্যান করানো হয়, যাতে তাঁর মাংসপেশিতে গ্রেড ওয়ান টিয়ার ধরা পড়ে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের হাসিমুখএরপর ঢাকায় এসে তিনি পুনর্বাসন–প্রক্রিয়া শুরু করেন। একপর্যায়ে চোট পাওয়া জায়গার পাশে আরেক জায়গায় ব্যথা অনুভব করার কথা জানান লিটন। তখন ২৭ জুন ঢাকায় আবারও তাঁর স্ক্যান করানো হয়। স্ক্যান রিপোর্টে দেখা যায়, লিটনের চট্টগ্রামে পাওয়া চোট কিছুটা ভালো হয়ে এসেছে। তবে তিনি নতুন যে জায়গায় ব্যথার কথা বলেছেন, স্ক্যানে সে জায়গায় কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি।
সূত্র জানিয়েছে, এ অবস্থায় দলের ফিজিও–ট্রেনারের সঙ্গে কথা বলে লিটনের ব্যাপারে ‘ক্যালকুলেটিভ রিস্ক’ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় টিম ম্যানেজমেন্ট। তারা ধরে নেয়, টেস্ট না খেলতে পারলেও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে লিটন পুরোপুরি সমস্যামুক্ত হবেন। সে আশাতেই তাঁকে জিম্বাবুয়ে সফরে নেওয়া।
কিন্তু জিম্বাবুয়েতেও লিটন ব্যথার কথা বলায় শেষ পর্যন্ত তাঁকে কোনো ম্যাচেই খেলানো হয়নি। চীনে ব্যক্তিগত সফর করে আসার পর চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে পাঠায় বিসিবি। ২৩ জুলাই সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে করানো স্ক্যানেও ঢাকায় লিটন নতুন যে জায়গায় ব্যথার কথা বলেছেন, সেখানে সমস্যা পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রামে পাওয়া চোটের অবস্থা ঢাকার মতোই আসে রিপোর্টে। ‘টিয়ার’ পাওয়া যায়নি, তবে মাংসপেশি কিছুটা আঘাতপ্রাপ্ত।
কেন এখনো সুস্থ হলেন না লিটন
লিটনের যে চোট, এসব সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়। অথচ দেড় মাস হতে চলল, তিনি এখনো ফিট নন! বিসিবির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি একজন খেলোয়াড়ের ফিটনেস, খাদ্যাভ্যাস, ঘুম; অর্থাৎ ব্যক্তিগত জীবনযাপনেরও একটা ভূমিকা থাকে। লিটন এসব ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম করেছেন, সেটি অবশ্য বলা যাবে না।
তাহলে ২৭ জুন ঢাকায় করানো স্ক্যান রিপোর্ট আর সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের স্ক্যান রিপোর্ট একই রকম এল কেন? কেন এ সময়েও যথেষ্ট উন্নতি হলো না লিটনের অবস্থার? সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, জিম্বাবুয়েতে ফিটনেস টেস্ট দিতে গিয়েও লিটনের চোটের জায়গায় নতুন করে চাপ লেগে থাকতে পারে। তবে এটিও যে নিশ্চিত কোনো কারণ, সেটিও নয়।