দুবাইয়ের চাকরি ছেড়ে যে সিদ্ধান্ত বদলে দিল সালমানের জীবন

· Prothom Alo

মালয়ালম সুপারস্টার মাম্মুট্টির ছেলে—এ পরিচয় নিয়েই চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেছিলেন দুলকার সালমান। তবে এক দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি প্রমাণ করেছেন, নিজের জায়গা তৈরি করতে বংশপরিচয়ের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন হয়নি। বরং ভিন্নধর্মী গল্প, বাস্তবধর্মী চরিত্র এবং ভাষার সীমা অতিক্রম করে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুমাত্রিক অভিনেতা।

মালয়ালম, তামিল, তেলেগু থেকে হিন্দি—প্রতিটি ভাষার সিনেমাতেই রেখেছেন অভিনয়ের স্বাক্ষর। রোমান্স, থ্রিলার, জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র কিংবা গ্যাংস্টার ড্রামা—প্রতিটি ঘরানায় নিজেকে নতুনভাবে তুলে ধরেছেন দুলকার সালমান।
বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় এবং বাছাই করে চিত্রনাট্য নির্বাচন করার জন্য পরিচিত দুলকার সালমানের আজ (২৮ জুলাই) জন্মদিন। ৪৪ বছরে পা রাখা দুলকার সম্পর্কে জেনে আসা যাক:

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

আইটি পেশাজীবী থেকে তারকাখ্যাতি
দুলকার সালমান অভিনয়ে আসার আগে দুবাইয়ে একজন আইটি পেশাজীবী হিসেবে কাজ করতেন। পরে সেই চাকরি ছেড়ে অভিনয়ে পা রাখেন। সময়ের সঙ্গে মালয়ালমের পাশাপাশি তামিল, তেলেগু ও হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি মলিউডের অন্যতম সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া তারকায় পরিণত হয়েছেন।

সাফল্যের রহস্য
দুলকার সালমানের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর চরিত্র নির্বাচন। জনপ্রিয়তার নিরাপদ পথে হাঁটার বদলে তিনি বারবার বেছে নিয়েছেন চ্যালেঞ্জিং গল্প ও ভিন্নধর্মী চরিত্র। ভাষা, ঘরানা কিংবা পর্দার ইমেজ—কোনো সীমাবদ্ধতাই তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। সে কারণেই তিনি আজ শুধু মালয়ালম নয়, পুরো ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও বহুমাত্রিক অভিনেতাদের একজন।

সম্পদের পরিমাণ
দুলকারের বিচক্ষণতা শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ নয়; বহুমুখী উদ্যোক্তা হিসেবেও তিনি হয়েছেন সফল। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুলকার সালমানের মোট সম্পদের পরিমাণ ৫৭ কোটি রুপির বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিটি সিনেমার জন্য তিনি ৮ থেকে ১০ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নেন। একাধিক চলচ্চিত্র মুক্তি ও ওটিটি চুক্তির কারণে তাঁর বার্ষিক আয় ১০ কোটি রুপি বা এর বেশি বলে ধারণা করা হয়। এ ছাড়া ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় রয়েছে তাঁর।

দুলকার সালমান। অভিনেতার ইনস্টাগ্রাম থেকে

সফল প্রযোজক
দুলকার সালমানের রয়েছে নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ওয়েফেয়ারার ফিল্মস। এর ব্যানারে তিনি ‘ভারানে আভশ্যমুন্ড’, ‘কুরুপ’, ‘স্যালুট’, ‘পুঝু’, ‘কিং অব কথা’ এবং ২০২৫ সালের ব্লকবাস্টার ‘লোকাহ: চ্যাপটার ওয়ান–চন্দ্রা’সহ অনেক সিনেমা প্রযোজনা করেছেন।

দুলকারের সবচেয়ে সফল প্রযোজিত ছবি ‘লোকাহ’ প্রায় ৩০ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত হয়েছিল এবং বিশ্বব্যাপী ৩০৩ কোটির বেশি রুপি আয় করেছে।

রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ
রিয়েল এস্টেটেও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন দুলকার। কোচিতে বাবার সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বে তাঁর রয়েছে একটি বিলাসবহুল পরিবেশবান্ধব ভিলা, যার আনুমানিক মূল্য ১০০ কোটি রুপি। এ ছাড়া দুবাইয়ে তাঁর একটি প্রিমিয়াম পেন্টহাউস রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১৪ কোটি রুপি।

বিলাসবহুল গাড়ির সংগ্রহ
দুলকার সালমান বিলাসবহুল গাড়ির প্রতি বিশেষ অনুরাগী। তাঁর গ্যারেজে রয়েছে পোরশে ৯১১ ক্যারেরা এস, অডি কিউ৭, মার্সিডিজ-বেঞ্জ এসএলএস এএমজি, রেঞ্জ রোভার ভোগ, বিএমডব্লিউ এম৩ কনভার্টিবল, ফেরারি ৪৫৮ স্পাইডার ইত্যাদি।
শুধু গাড়িই নয়, দুলকারের সংগ্রহে রয়েছে বিলাসবহুল মোটরসাইকেলও। তাঁর মালিকানাধীন বাইকের মধ্যে রয়েছে ট্রায়াম্ফ বোনেভিল ও বিএমডব্লিউ আর১২০০জিএস অ্যাডভেঞ্চার।

দুলকার সালমান। অভিনেতার ইনস্টাগ্রাম থেকে

বিতর্ক
সম্প্রতি দুলকার সালমানের বিরুদ্ধে ভুটান সীমান্ত দিয়ে ভারতে আনা বিলাসবহুল গাড়ির কথিত চোরাচালান চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগের তদন্ত অব্যাহত রেখেছে কাস্টমস প্রিভেন্টিভ বিভাগ। এ তদন্ত বৃহত্তর এক অভিযানের অংশ, যার লক্ষ্য কর ফাঁকি ও অবৈধভাবে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির অভিযোগ খতিয়ে দেখা। যদিও দুলকার বরাবরই দাবি করে আসছেন, তিনি সব গাড়িই বৈধ উপায়ে কিনেছেন; তবু মামলার তদন্ত এখনো চলছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

পুরস্কার
সালমান পাঁচটি ‘ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস সাউথ’, একটি ‘কেরালা স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড’, একটি ‘কেরালা ফিল্ম ক্রিটিকস অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড’, একটি ‘গাদ্দার তেলেঙ্গানা স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড’সহ অনেক সম্মানজনক পুরস্কার অর্জন করেছেন।

দুলকারের ১২ সেরা
এ বছরের মার্চের দিকে ফিল্মফেয়ার দুলকার সালমানের অভিনয়জীবনের সেরা ১২টি সিনেমার তালিকা তুলে ধরেছে। চলুন দেখে আসি:

‘উস্তাদ হোটেল’
২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির পরিচালক আনোয়ার রশিদ। রন্ধনশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখা তরুণ ফাইজি ও তার দাদার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এগিয়েছে ছবির গল্প। পারিবারিক মূল্যবোধ, মানবিকতা ও খাদ্যসংস্কৃতির সুন্দর মেলবন্ধন এই সিনেমাকে বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সংযত ও আন্তরিক অভিনয়ে দুলকার প্রথমবারের মতো দর্শক-সমালোচকদের নজর কাড়েন।

দুলকার সালমান। অভিনেতার ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘ব্যাঙ্গালোর ডেজ’
২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমার পরিচালক অঞ্জলি মেনন। তিন চাচাতো ভাইবোনের জীবন, স্বপ্ন ও সম্পর্কের গল্প নিয়ে নির্মিত এ সিনেমা দক্ষিণ ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় সিনেমায় পরিণত হয়। অতীতের ক্ষত বয়ে বেড়ানো অর্জুন চরিত্রে দুলকারের অভিনয় ছবির অন্যতম আকর্ষণ।

‘চার্লি’
২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন মার্টিন প্রাক্কাট। রহস্যময়, স্বাধীনচেতা এক মানুষের জীবনকে ঘিরে তৈরি এ সিনেমায় দুলকারের অভিনয় তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বলে বিবেচিত হয়। ছবিটি তাঁকে কেরালা রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার এনে দেয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ চরিত্র বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সাহসী অভিনেতা হিসেবে তাঁর অবস্থান আরও দৃঢ় করে।

‘ওকে কানমণি’
২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির পরিচালক বিখ্যাত নির্মাতা মণি রত্নম। আধুনিক সম্পর্ক ও লিভ–ইন সংস্কৃতি নিয়ে নির্মিত এই তামিল রোমান্টিক ড্রামায় দুলকার ও নিত্যা মেননের রসায়ন দর্শকদের মুগ্ধ করে।

‘কাম্মাট্টিপাডাম’
২০১৬ সালের এই সিনেমার পরিচালক রাজীব রবি। নগরায়ণ, ভূমি দখল ও জাতিগত বৈষম্যের কঠিন বাস্তবতা নিয়ে নির্মিত এই সিনেমায় কৃষ্ণান চরিত্রে অভিনয় করেন দুলকার। মূলধারার বিনোদনের বাইরে গিয়ে তাঁর অভিনয়দক্ষতার আরেকটি দিক উন্মোচিত হয় এ সিনেমায়।

‘সীতা রামম’ সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবি

‘কারওয়া’
২০১৮ সালের সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন আকর্ষ খুরানা। বলিউডে দুলকারের অভিষেক ঘটে এই রোড-ড্রামার মাধ্যমে। ইরফান খানের সঙ্গে তাঁর রসায়ন এবং সংযত অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়। জীবন, মৃত্যু ও আত্মোপলব্ধির গল্পে ভরপুর ছবিটি আজও দর্শকদের কাছে প্রিয়।

‘মহানটি’
২০১৮ সালের এ সিনেমার পরিচালক নাগ অশ্বিন। দক্ষিণ ভারতের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সাবিত্রীর জীবনীভিত্তিক এ ছবিতে জেমিনি গণেশন চরিত্রে অভিনয় করেন দুলকার। বাস্তব চরিত্রকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরার জন্য তিনি ব্যাপক প্রশংসা পান। ছবিটি একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও জিতে নেয়।

‘কুরুপ’
২০২১ সালের সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন শ্রীনাথ রাজেন্দ্রন। বাস্তব জীবনের পলাতক অপরাধী সুকুমার কুরুপকে ঘিরে নির্মিত এই অপরাধভিত্তিক থ্রিলারে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাও করেন দুলকার। আকর্ষণীয় অথচ রহস্যময় চরিত্রে তাঁর অভিনয়ই ছবির মূল শক্তি।

‘সীতা রামম’
২০২২ সালে মুক্তি পায় সিনেমাটি। এর পরিচালক হানু রঘুবাপুতি। ষাটের দশকের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই প্রেমের গল্পে সেনা কর্মকর্তা রামের চরিত্রে অভিনয় করেন দুলকার। ম্রুণাল ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর রসায়ন, মনোমুগ্ধকর দৃশ্যায়ন ও আবেগঘন কাহিনি ছবিটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় প্রেমের সিনেমায় পরিণত করেছে।

দুলকার সালমান-পৃথ্বিরাজের বাড়িতে অভিযান

‘লাকি ভাস্কর’
২০২৪ সালের সিনেমাটির পরিচালক ভেঙ্কি অতলুরি। একজন সাধারণ ব্যাংক কর্মীর দ্রুত সফল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কীভাবে তাঁকে জটিল পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়, সে গল্প নিয়ে নির্মিত এই তেলেগু ছবি। সামাজিক বাস্তবতা, থ্রিলার ও ব্ল্যাক কমেডির মিশেলে নির্মিত সিনেমাটিতে দুলকারের অভিনয় আবারও প্রশংসিত হয়েছে।

‘চুপ: রিভেঞ্জ অব দ্য আর্টিস্ট’
২০২২ সালের সিনেমাটির পরিচালক আর বাল্কি। চলচ্চিত্র সমালোচনাকে কেন্দ্র করে তৈরি ব্যতিক্রমধর্মী এই মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারে ড্যানি চরিত্রে দেখা যায় দুলকারকে। নীরব অথচ অস্বস্তিকর উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি চরিত্রটিকে স্মরণীয় করে তুলেছেন।

‘কিং অব কথা’
২০২৩ সালে মুক্তি পায় সিনেমাটি। এর পরিচালক অভিলাষ জোশি। গ্যাংস্টার ড্রামা ঘরানার এ ছবিতে কথা রাজুর চরিত্রে অভিনয় করেন দুলকার। কারিগরি দিক, অ্যাকশন ও ভিজ্যুয়ালের জন্য ছবিটি প্রশংসিত হলেও চিত্রনাট্য নিয়ে সমালোচনা ছিল। তবু এটি দুলকারের বাণিজ্যিক ধারার উল্লেখযোগ্য কাজ।

Read full story at source